জানুয়ারির ১১ তারিখ চীনা একটি দল অনলাইনে নভেল করোনাভাইরাসের আরএনএ জিনোম সিকোয়েন্স সম্পর্কে জানায়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মডার্নার বিজ্ঞানীরা পুরো জিনোম সিনথেসাইজড করে। উল্লেখযোগ্যভাবে ৬০ দিন পর কোম্পানিটি ইনস্টিটিউট অব হেলথের ভ্যাকসিন রিসার্চ সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরএন ভ্যাকসিনের প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করে।

কভিড-১৯ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করার পর বিজ্ঞানীরাও অবিশ্বাস্য গতিতে এ ভাইরাসকে বোঝার চেষ্টা করতে থাকেন—কীভাবে এটি রোগের কারণ হচ্ছে, কীভাবে এটি ছড়াচ্ছে, কেন কিছু কিছু লোক উপসর্গহীন যেখানে অনেকে মারা যাচ্ছে, এর ওষুধ কী হবে এবং কীভাবে দ্রুত এর একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করা যায়। কভিড-১৯ আমাদের সামনে একুশ শতকে বিজ্ঞানের যে অভাবনীয় উন্নতি ও আন্তর্জাতিক যে সহযোগিতা তাকে সামনে নিয়ে আসে। আমি কানাডার কভিড-১৯ টাস্কফোর্সের একজন সদস্য। আমি আশাবাদী যে ২০২০ সালের শেষ দিকে কিংবা ২০২১ সালের শুরুতে একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন আমাদের হাতে থাকবে। কিন্তু যেটা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা তা হলো, সব মানুষ সমানভাবে এটি পাবে না।

সতেরো শতকের শেষ দিকে এডওয়ার্ড জেনেরের গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমে শুরু হয় ভ্যাকসিনোলজির ইতিহাস। সেটি ছিল মানুষ ও জীবাণুর মাঝে লড়াইয়ের প্রথম টার্নিং পয়েন্ট। যা আধুনিক বিজ্ঞানের মহৎ এক বিজয়ও বটে।  ভ্যাকসিন রোগ প্রতিরোধ করে, সস্তা, সহজে বিতরণ করা যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করে। এটি কেবল যিনি ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন তারই উপকার করে না, বরং ভাইরাস ছড়ানো রোধ করে অন্যদেরও বাঁচিয়ে দেয়।

বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসিসহ অনেক বিজ্ঞানী ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন উপলব্ধ হবে। এই সময়সীমা বিস্তৃতভাবে আশাবাদী হওয়ার মতোই ছিল। এখন এসে ফাউসিসহ অনেক বিজ্ঞানী যারা ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছেন তাদের দাবি, এ বছরের শেষদিকে বা ২০২১ সালের শুরুর দিকে কোন ভ্যাকসিন কার্যকর তা জানা যাবে এবং আগামী বছরের শেষ দিকে যেকোনো একটি ভ্যাকসিন উপলব্ধ হবে। অবিশ্বাস্য গতিতে এই এগিয়ে যাওয়াটা ভ্যাকসিনের সুরক্ষার দিক উপেক্ষা করে অর্জিত হয়নি। এটা হয়েছে মূলত বিভিন্ন দেশ, একাডেমি ও শিল্পগুলোর মধ্যকার নজিরবিহীন যোগাযোগের মাধ্যমে। 

একটি আদর্শ ভ্যাকসিন তিনটি কাজ করে: ব্যক্তিকে সংক্রমিত হওয়া থেকে রক্ষা করে, যারা কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হয়েছে তাদের জীবনের ঝুঁকিকে দূর করবে এবং অন্যদের মাঝে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধ করবে। অবশ্য একটি ভ্যাকসিনের সফল হওয়ার জন্য তিনটি দিকেই শতভাগ কার্যকর হওয়ার দরকার নেই।

মডার্নার একটিসহ বিশ্বব্যাপী এখন একশর বেশি ভ্যাকসিন প্রার্থী বিকাশমান আছে। যেখানে ৩৬টি মানুষের শরীরে ট্রায়ালও শুরু করেছে। আমার আশাবাদ অবশ্য কেবল সংখ্যার ওপর নির্ভর করছে না। নয়টি ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত মানুষের শরীরে তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরু করেছে। তারা এখন অনুমোদন পাওয়ার জন্য শেষ ধাপে আছে। ব্যাপার হচ্ছে, ভ্যাকসিনের বিকাশে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক ফলাফলটুকু বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। পাশাপাশি এই ভ্যাকসিনগুলোর পেছনে যে বিজ্ঞান রয়েছে তার জন্যও আমি আশাবাদী। সার্স-কোভ-২ নভেল করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে যে প্রোটিন বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন প্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা করছেন সেটি প্রোটিন স্ট্রাকচারের গবেষণার যে অগ্রগতি তার ফল।

তবে একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন যত দ্রুত সম্ভব হাতে থাকতে হবে, যা অনুমোদিত হবে রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে কেবল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ওপর ভিত্তি করে। এর বাইরে যেকোনো কিছু ভ্যাকসিনের ওপর থেকে মানুষের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেবে কিংবা কম কার্যকর ভ্যাকসিন অনুমোদন পেয়ে গেলে তা মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এ রকম কিছু হলে তা হতে পারে জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের ট্র্যাজেডি।

ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এর অনুমোদন মূলত প্রথম দুটি ধাপ। এরপর বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ডোজের প্রয়োজন হবে এবং সেটি উৎপাদন ও বিতরণের জন্য প্রয়োজন হবে কোটি কোটি ডলার। এরপর ভ্যাকসিনের ন্যায়সংগত প্রাপ্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। এটি ধনী দেশগুলো দ্বারা কেবল উদারতা দেখানোর ব্যাপার নয়। যদি কোনো একটি জায়গায় ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়, তবে সেটি যেন পৃথিবীর সব জায়গায় উপলব্ধ হয়। বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীরা যেমন সহযোগিতামূলক আচরণ দেখিয়েছেন, দেশগুলোকেও তা করে দেখাতে হবে।

দ্য আটলান্টিক থেকে সংক্ষেপে অনূদিত