পুরো বিশ্বই করোনা মহামারীতে ধুঁকছে। মানুষের জীবনের পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও করোনা প্রভাব ফেলা শুরু করেছে। চলতি সংকট সামলানো এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এটি বিপণনকারীদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
এই চ্যালেঞ্জিং ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এটি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিপণনকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
আমরা এরই মধ্যে সমাজে আচরণগত রূপান্তর দেখতে পাচ্ছি, মানুষ ঘরে বেশি সময় কাটাচ্ছে এবং ঘন ঘন ইন্টারনেট ঘাঁটছে। যেহেতু গ্রাহকরা ঘরে থাকছে, সেহেতু আপাতভাবে এই সময়ে ব্র্যান্ডের উন্নয়নে ডিজিটাল বিপণন সর্বোত্তম প্রতিষেধক হতে পারে। কাজেই বিষয়টি আমলে নিয়ে কোম্পানিগুলো কভিড-১৯ মহামারী থেকে বিপণন পরিকল্পনা বা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য তৈরি হতে পারে।
কিছু নেতিবাচক ফলাফলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল বিপণন অন্যতম ভালো কৌশল হতে পারে এবং সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে। তুলনামূলক কম ব্যয়ে তারা এটি সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে।
গতি-দ্রুততা এবং ভালো নৈপুণ্যের কারণে ব্যবসায়িক পরিসরে ডিজিটাল বিপণন একটি উন্নততর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যেহেতু মানুষ ঘরবন্দি হয়ে আছে এখন, সেহেতু অনলাইনের যেকোনো ফ্রন্টে মানুষ অধিকতর ডিজিটাল কনটেন্ট পরিভোগ করছে, যা এর আগে কখনো হয়নি। অবশ্য এই সংকট পরিস্থিতিতে বিপণন কার্যক্রম প্রস্তুতে আমরা কিছু পদক্ষেপ অনুসরণ করতে পারি।
চৌকস হোন
নিজেদের কাজকর্মে আমাদের অধিক চৌকস হতে হবে এবং সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা ও বিদ্যমান গ্রাহকদের ধরে রাখায় প্রস্তুত হতে হবে। এটি একটি অভিনব সময়, যখন ক্ষুদ্র ক্যারিশমা ব্যবসার জন্য বিপুল সাফল্য বয়ে নিয়ে আসতে পারে। সত্যিই এটি আতঙ্কিত হওয়ার সময় নয়। শান্ত থাকুন এবং পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্মুখভাগে ব্যবসাকে উপস্থাপনের এটিই যথার্থ সময়। অনেক বড় কোম্পানি চৌকস বিপণন ব্যবহার করছে, ইতিবাচকতা প্রচার করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বিনিময় করছে।
সামাজিক হোন
গ্রাহক ধরে রাখার জন্য তাদের সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গ্রাহক তৈরির চেয়ে বিদ্যমান গ্রাহক ধরে রাখা সবসময়ই খুব খরচের, ব্যয়সাশ্রয়ী। এখন মানুষ আগের চেয়ে বেশি অনলাইনে সময় পার করছে। ছাত্র থেকে বয়স্ক সবাই ঠিক এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত্ত! সামাজিক প্লাটফর্মগুলোতে অধিক নাগাল বৃদ্ধি, সম্পৃক্তি ও সময় কাটানো বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কিত তত্পরতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো রকম বিরতি দেয়া ঠিক হবে না। বরং ব্র্যান্ডগুলোকে সেখানেই উপস্থাপন করতে হবে, যেখানে এরই মধ্যে অভীষ্ট গ্রাহকগোষ্ঠী তালাশ করছে (ব্রাউজ)। একই সঙ্গে গ্রাহকদের সঙ্গে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক সমমর্মিতা ও সহানুভূতি নিয়ে সংযুক্ত হতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করা কার্যকর হতে পারে।
দৃশ্যমান হোন
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘চোখের আড়াল তো মনের আড়াল’। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিজেদের অনলাইন দৃশ্যমানতা নিশ্চিত এবং অধিক গ্রাহক আকর্ষণে নিজেদের পণ্য ও সেবা তুলে ধরার এটাই বড় সুযোগ। বিদ্যমান গ্রাহক ও সম্ভাব্য গ্রাহকদের ওপর অধিক মনোযোগ দেয়া জরুরি।
ব্র্যান্ড সচেতনতা তৈরি এবং অধিক দৃশ্যমানতা পাওয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। যার অর্থ হলো ভবিষ্যৎ বিক্রয় ধরতে নিজেদের ওয়েবসাইটে দর্শকের উপস্থিতি বাড়ানো। এবং সম্ভাব্য গ্রাহক প্রাপ্তির সর্বোত্তম সময় তখনই আসবে, যখন সুনির্দিষ্ট কোনো কোম্পানি কী পণ্য-সেবা বিক্রি করছে তা তারা সন্ধান করবে, নিশ্চিত হবে জীবনে অপরিহার্য প্রায় পণ্য তারা সেখান থেকে পেতে পারে। কাজেই এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কৌশল সাজানো ও বিপণন খাপ খাইয়ে নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
একাগ্র হোন
ভোক্তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হতে এবং তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হতে ব্র্যান্ডগুলোয় পুনরায় মনোযোগ দিন। রূপান্তরের হার সর্বোচ্চকরণে নিম্ন ব্যয়ের, উচ্চ প্রভাবের ডিজিটাল বিপণন কৌশলে বেশি নজর দিতে হবে। ইউজার জার্নিতে ছোট প্রান্তীয় পরিবর্তনও গ্রাহককে অধিক ওয়েবসাইট সন্ধানীতে পরিণত করবে। সামাজিক প্রমাণ সহভাগ-বিনিময় করুন এবং ব্যবসা সম্পর্কে ইতিবাচক গল্প তুলে ধরুন। গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা অনেক বড় ব্যাপার, কাজেই একটি দ্রুতগতিসম্পন্ন ও কাস্টমাইজড ইনফরমেশনবান্ধব ওয়েবসাইট নিশ্চিতে বিনিয়োগ করুন। ভোক্তারা মনে হয় ওই সব ব্র্যান্ডকে মনে রাখে, যারা সংকটে দায়িত্বশীল আচরণ করে।
কৌশলী হোন
ডিজিটাল বিপণন পরিসরে সর্বরোগহর কোনো পদ্ধতি নেই। পরিকল্পনার সময় কৌশলী হোন, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করুন। এই ঝড়ঝাপটা শেষ হলে এবং ব্যবসা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে দেরি করা ছাড়া গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করুন এবং সময়োপযোগী থাকার উদ্যোগ নিন।
বুদ্ধিমান হোন
মেশিন লার্নিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ যেসব পদক্ষেপ ব্যবসাকে অধিক প্রতিযোগিতাসক্ষম হওয়ার সুবিধা দেবে, সেসবের ব্যাপারে বাস্তববাদী হোন এবং সঠিক সময়ে সঠিক সময় গ্রাহকের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করুন। এআই, বিআই (বিজনেস ইন্টেলিজেন্স) প্রভৃতি বিষয়ের সুবিধা নিন। এতে খরচ যেমন কমবে, বিপণনে উচ্চতর কারিগারি উদ্ভাবন নিশ্চিত করবে।
মিতব্যয়ী ও পরিমিতিবোধসম্পন্ন হোন
যথাযথ পরিমাপের মানে হলো বিপণন খরচের সঠিক ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা। সাফল্য মানদণ্ডের বিপরীতে ব্র্যান্ডগুলোকে অধিক মিতব্যয়ী হতে হবে। বিক্রয়, হিটের সংখ্যা, জিজ্ঞাসা, লিডের সংখ্যা বা রেফারেল প্রভৃতি পরিমাপ করতে হবে। গুগল অ্যানালাইটিকস কর্তৃক প্রধান প্রধান নৈপুণ্য সূচক (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) নিশ্চিত করা এবং সামাজিক মাধ্যমসম্পর্কিত আরওআই মূল্যায়নের এখনই সময়। প্রবাদে যেমনটা বলা হয়, ‘আপনি যদি পরিমাপ করতে না পারেন, তাহলে আপনি সামলাতে পারবেন না। আর আপনি যদি সামলাতে না পারেন তাহলে আপনার অর্থ জলে-নর্দমায় যাবে।’
যখন বাজেট সীমাবদ্ধ থাকে, তখন মিডিয়ার ব্যবহার ও বিজ্ঞাপনের জন্য কতটা ব্যয় করতে যাচ্ছি, সে সম্পর্কে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সৃজনশীল হোন
কথায় আছে, প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জননী। যেকোনো সংকটে আমাদের ক্ষিপ্র ও সৃজনশীল হতে হবে। সফলতা পরিমাপ করুন এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন। বিপণন বাজেট ছোট ও সীমাবদ্ধ হলে কোথায় কোথায় খরচ করতে হবে সে সম্পর্কে জানতে হবে। নিরীক্ষা যা-ই করি না কেন আমাদের ক্ষিপ্র, সাশ্রয়ী ও সেবা প্রদানে সহজ হতে হবে। বিপণন নেতাদের একজন বিনিয়োগকারীর মতো হতে হয় এবং বিভিন্ন ডিজিটাল চ্যানেল ব্যবহারে সৃজনশীল ও অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হয়।
গুগল হোন
অভীষ্ট দর্শক-গ্রাহকদের কাছে ব্র্যান্ডকে প্রাসঙ্গিক রাখতে গুগলে বিজ্ঞাপন দেয়াও সাহায্য করে। গুগল অ্যাডভার্টাইজিংয়ের মাধ্যমে টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে এটি উপস্থাপন করা ভালো। প্রতিটি ক্লিকে অর্থপ্রদান হবে কার্যকর ব্যয়সাশ্রয়ী লিড জেনারেশন। চলতি সংকটে অনলাইন সংবাদমাধ্যম জনপ্রিয় হচ্ছে, এ ধরনের প্লাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেয়ার এখনই সুবর্ণ সময়।
সত্যবাদী হোন
ই-কমার্স বিপণনকারীদের জন্য স্বচ্ছ মেসেজিং উন্নয়নে সত্যিকার অর্থে নজর দেয়ার এটাই প্রকৃত সুযোগ। অধিকাংশ অনলাইন কমার্স শেষ পর্যন্ত অনলাইন গ্রোসারিতে রূপান্তরিত হয়।
গ্রাহকদের মনে আমরা যদি জায়গা করে নিতে চাই তাহলে অর্থনৈতিক অধোগতির সময় আমাদের সক্রিয় হতে হবে। তার মানে হলো নতুন বার্তা দেয়া, জারি রাখা এবং ব্যবসা এখনো চলমান আছে সেই কথাটি গ্রাহকদের মনে করিয়ে দেয়া অব্যাহত রাখতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তিটির কাছে যথার্থ বার্তা পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা অপচয় কমাতে পারে।
করোনাভাইরাস সম্পর্কে যথার্থ তথ্যপ্রদানকারী ব্র্যান্ডগুলো এবং অপারেশনে সেগুলোর প্রভাব বিদ্যমান সংযোগ গভীরতর করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করতে পারে। আনুগত্য পুনঃসংজ্ঞায়িত করে ইতিবাচক অভিপ্রায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
ওয়েববান্ধব হোন
ওয়েববান্ধব হতে এসইও সাহায্য করতে পারে। একটি কৌশলগত এসইও কৌশলের মাধ্যমে ওয়েবসাইটকে অনলাইনে সহজলভ্য করা দ্বারা ব্যবসাকে চলমান রাখার সর্বোত্তম সুযোগ কাজে লাগানোর উপায় সন্ধান করুন।
মন্দার সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিযোগীরা সম্ভবত একটি বোধগম্য কাজই করবে। আর তা হলো নিজেদের এসইও বাজেট কাঁটছাঁট করা বা বাদ দেয়া। এমনটি হলে কয়েক সপ্তাহের জন্য তারা হয়তো তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে এবং তারপর আপনাতেই ওয়েবসাইট পড়া শুরু করবে। তবে মনে রাখতে হবে প্রতিবারই যখন একটি সাইটের অবস্থানের পতন ঘটে, তখন অন্যটি এগিয়ে যায়। কাজেই এসইও বাজেট কমানো বন্ধ করুন। এটি চূড়ান্তভাবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অধিক ব্যয়সাশ্রয়ী উপায়ে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছতে সাহায্য করবে।
সামনে এগিয়ে যান
চূড়ান্তভাবে এই করোনাভাইরাস মহামারীতে ডিজিটাল বিপণন প্রচেষ্টায় মনোযোগ দেয়া প্রতিযোগীদের সামনে এগিয়ে থাকতে এবং অনলাইন উপস্থিতি বাড়ানোয় সাহায্য করবে। পুনঃকল্পনা করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বিপণনকারীরা পরবর্তী নতুন স্বাভাবিকে এগিয়ে যেতে পারে, এমনকি বিজ্ঞাপনে অর্থ বিনিয়োগের জন্য তৈরি না থাকলেও এখনো অর্গানিক বিপণন কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিকাশের সুযোগ থাকতে পারে। এসব কৌশল কেবল আজকের জন্য নয়, ব্যবসায় সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সুফলও রয়েছে।
যখনই অর্থনীতি নিম্নমুখী হতে পারে মনে করছেন তখনই প্রতিযোগীরা সাধারণত হাইবারনেশন মোডে চলে যাচ্ছেন। আসলে ওপরে উল্লিখিত পরামর্শ মেনে এটিই পুনঃচিন্তন, পুনঃঅভিযোজন, পুনঃসংজ্ঞায়ন এবং বিপণন প্রচেষ্টা হালনাগাদ করে এগিয়ে যাওয়ার সময়। বিপণনকারীরা যদি নতুন নতুন অ্যাপ্রোচ অবলম্বনে ইচ্ছুক হয়, তাহলে নিছকই চাহিদা-জোগানের অর্থনীতির কারণে ব্যবসা এখনো বিকাশ লাভ করতে পারে। কর্মতত্পর হোন এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিপণন থেকে দূরে সরে যাবেন না।
একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল বিপণন মডেল নিয়ে প্রস্তুত থাকুন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিপণন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন এবং নতুন বাস্তবতা মোকাবেলায় সর্বাত্মকভাবে নিজেকে নিয়োজিত করুন।
আফতাব মাহমুদ খুরশিদ: বিজনেস মার্কেটার





