কভিড-১৯ থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য প্রায় ৫০টি ভ্যাকসিন দ্রুতগতিতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ ট্রায়ালগুলো গঠন করা হয়েছে ভ্যাকসিনের সুরক্ষা ও কার্যকারিতার দিক মাথায় রেখে। তবে গত সপ্তাহে ল্যানসেটে প্রকাশিত হওয়া একটি পর্যালোচনা ভ্যাকসিন প্রার্থীরা সত্যি কার্যকার কিনা তা নির্ধারণে রূপরেখা তুলে ধরে।
এ পর্যালোচনায় যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কার্যকারিতার অনেকগুলো সংজ্ঞা রয়েছে। মারাত্মক উপসর্গ বিকাশের আশঙ্কা হ্রাসের বিষয়টি এখানে একটি। আবার মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস হওয়া এখানে আরেকটি বিষয়। বর্তমানে চলমান ট্রায়ালগুলো প্রধানত ডিজাইন করা হয়েছে এর গ্রহীতাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য। কিন্তু একটি ভ্যাকসিন মারাত্মক অসুস্থতা কিংবা মৃত্যু ঠেকাতে পারে কিনা সেটি জানা এখনো অনেক দূরের পথ। এ ধরনের সুবিধার কোনো প্রমাণ এখনো ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকরা প্রদান করেননি।
এ বিষয়েই সম্প্রতি দ্য সায়েন্টিস্ট কথা বলেছে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সুজান হডসনের সঙ্গে। তিনি অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের কাজেও যুক্ত। সাক্ষাত্কারের চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলো—
সবার দৃষ্টি এখন ভ্যাকসিনের চলমান ট্রায়ালের দিকে। কী ধরনের প্রমাণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো দেখায় কিংবা দেখায় না?
সুজান হডসন: কভিড ভ্যাকসিন অনেকগুলো উপায়ে কাজ করতে পারে। যেমন প্রথমত এটি আপনাকে সংক্রমিত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে। এটা আপনাকে মারাত্মক উপসর্গ বিকাশের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। এটি সংক্রমণকে অন্য লোকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার আশঙ্কা কমাতে পারে। কিংবা সম্মিলিতভাবে এ তিনটিই করে দেখাতে পারে। আশা করা হচ্ছে, তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আমরা এমন তথ্য পাব যা আমাদের জানাবে, একটি ভ্যাকসিন সত্যিকার অর্থে এই তিনটির কোনোটিই করে দেখাতে পারে কিনা।
এ মুহূর্তে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংক্রমণের হার উচ্চ হওয়ায়, ভ্যাকিসন আবিষ্কারকরা আত্মবিশ্বাসী যে কভিড ভ্যাকসিন সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবে কিনা সে বিষয়ে আমরা জানতে পারব। কিন্তু কভিড-১৯-এ সংক্রমণের কারণে মৃত্যু এবং মারাত্মক অসুস্থতা তুলনামূলকভাবে কম। তাই এটা অসম্ভব যে আমাদের চলমান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো পরিসংখ্যানগতভাবে এ উত্তর দেয়ার জন্য চালিত হবে যে ‘এ ভ্যাকসিনগুলো মারাত্মক রোগ রোধ করতে পারে কিনা?’
এ পার্থক্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অনেক মানুষ আমাদের জিজ্ঞেস করে, এ ভ্যাকসিন আসলে কাজ করে কিনা? এটা খুবই সাধারণ একটি প্রশ্ন বলে মনে হলেও বিষয়টা কিন্তু খুবই জটিল। উত্তর দেয়ার ক্ষেত্রে এখানে অনেকগুলো সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়: আমরা যখন বলি ভ্যাকসিন ‘কাজ করছে’,
সেটা দিয়ে আসলে আমরা কী বোঝাই? এটা কি বোঝায় যে ভ্যাকসিন সংক্রমণ এবং রোগকে আটকাতে পারে, নাকি বোঝায় যে এটি সংক্রমণ রোধ করতে পারে? আমি মনে করি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিন সেটি যা মারাত্মক রোগ ও মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে পারে। মূলত এ দুটি কারণে হাসপাতালগুলোতে রোগীর বোঝা বাড়ছে এবং প্রাণহানি ঘটছে। অবশ্য তার মানে এই নয় যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করবে না। ভ্যাকসিন সংক্রমণ রোধ করতে পারে কিনা সেটি জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খুব সম্ভবত ক্লিনিক্যাল ডাটার ওপর ভিত্তি করে জনগণের বড় একটি অংশের ওপর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে। আর তখনই আমরা জানতে পারব যে ভ্যাকসিন মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করতে পারে কিনা।
অনুমোদনের পরও এ ভ্যাকসিনগুলো পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন আছে কিনা এবং কেন?
এরই মধ্যে ভ্যাকসিন পর্যবেক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রটোকল এবং অবকাঠামো রয়েছে। কভিড ভ্যাকসিনও বিদ্যমান সেই সব ভ্যাকসিনের চেয়ে ভিন্ন হবে না। কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও সুরক্ষা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তাই যদি হাজারো মানুষের মধ্যে কেবল একজনেরও তুলনামূলকভাবে দুর্লভ কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তবে সেই তথ্য পাওয়া আমাদের জন্য সম্ভব হবে।
লাইসেন্স কর্তৃপক্ষগুলোও ভালোভাবে লক্ষ রাখবে, ভ্যাকসিন কভিড-১৯-এর তীব্রতা বাড়াতে কোনো ভূমিকা রাখছে কিনা তা দেখার জন্য। একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি যিনি ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন এবং পরে কভিডের বিপরীতে ইমিউন প্রতিক্রিয়া বিকশিত করেছেন। এরপর যখন তিনি সম্প্রদায়ের ভেতর কভিডের মুখোমুখি হন, তখন ভ্যাকসিন প্ররোচিত ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণে আসলে রোগটি আরো খারাপ হয়ে গেছে। যে কারণে এটি উদ্বেগের তা হলো, প্রাণীদেহে ভ্যাকসিনের কিছু গবেষণা, যা করা হয়েছিল অন্য করোনাভাইরাসগুলোর জন্য (যেমন মার্স ও সার্স) তাতে এমন ঘটনা দেখা গেছে। সৌভাগ্যবশত, কভিড ভ্যাকসিনের প্রাণিজ গবেষণাগুলো এখন পর্যন্ত তেমন কিছু দেখায়নি। এমনকি আমার জানা মতে, এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রস্তাব নেই, যেখানে কভিড ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এমনটি মানুষের মধ্যে দেখা গেছে। কিন্তু অবশ্যই এটি একটি কারণ, যে জন্য কভিড ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর এর সুরক্ষার বিষয়টি তীব্রভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
কোন বিষয়টি ভ্যাকসিন কার্যকর কিনা সেটি নির্ধারণকে অনেক চ্যালেঞ্জিং করে তোলে?
প্রথমত, যখন আপনি সিদ্ধান্ত
নেবেন যে কোনো ভ্যাকসিন উপযুক্তভাবে কাজ করছে কিনা, তখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার সংজ্ঞাটি কী হবে। যেমনটা আমি আগেই বলছিলাম, একটি ভ্যাকসিন সংক্রমণের হার হ্রাস করতে পারে, স্থানান্তরের হার হ্রাস কিংবা রোগের তীব্রতা হ্রাস করতে পারে। তাই এ ফলাফলগুলোর জন্য আপনাকে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং বুঝতে হবে কীভাবে আপনি এ ফলাফলগুলো পরিমাপ করবেন। এ ফলাফলের অনেকগুলো নির্ভর করছে ল্যাব গবেষণার ওপর। উদহারণস্বরূপ, রিয়েল টাইম কিউ-পিসিআর পরীক্ষা। যেটি অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি টেস্ট করে এবং কভিডের টেস্ট নিশ্চিত করে। আমি নিশ্চিত যে এ পরীক্ষার অসম্পূর্ণতার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। আবার কিছু মানুষ পরামর্শ দেয় যে সম্ভবত অ্যান্টিবডি স্তরের ব্যবহার একটি উপায় হতে পারে কেউ সংক্রমিত কিনা তা বলার জন্য। কিন্তু অনেকগুলো গবেষণা বলছে, সবার মধ্যে অ্যান্টিবডি স্তর বিকশিত হয় না। হলেও তা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয় না।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো যা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়োগ দেয়, সেখানে অর্ধেককে কভিড ভ্যাকসিন দেয়া হয় এবং অর্ধেককে দেয়া হয় প্লাসেবো। এরপর কমিউনিটির ভেতর তাদের অনুসরণ করা হয় এবং ভ্যাকসিন ও প্লাসেবোর সংক্রমণ হার তুলনা করা হয়। যদি ভ্যাকসিন কাজ করে তবে পরিসংখ্যানের দিক থেকে প্লাসেবো গ্রুপের অনেক বেশি মানুষ সংক্রমিত হবে।
দ্য সায়েন্টিস্ট থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত





