সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হাই-প্রোফাইল গবেষণাপত্র থেকে অনেক ভুল তথ্য গত চার মাসে বেশ দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ করে কভিড-১৯-এর প্রথম সংক্রমণের সংবাদ সামনে আসার পর বিধিসম্মত বৈজ্ঞানিক গবেষণাও আশ্চর্যজনক গতিতে পরিচালিত হতে দেখা যায়। সাধারণ পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে দেখা হয় শ্লথগতির, পিয়ার রিভিউ করা এবং একটি অনুমানের বিকাশ এবং পরীক্ষার গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী। আর সবশেষে ফলাফলগুলো বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সংশোধন কিংবা অস্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকে। তবে আমরা এখন নজিরবিহীন এক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি এবং বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে এসে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
করোনাভাইরাসের এই মহামারীকালে এ সম্পর্কে অনেকগুলো যুগান্তকারী গবেষণা হয় শেষ হয়েছে কিংবা বিকাশের পর্যায়ে আছে। এছাড়া হাজারো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে যেখানে অন্তর্ভুক্ত আছে: ১. ভাইরাসের জিনগত কোড এবং কীভাবে কোষকে সংক্রমিত করছে তা। ২. মানুষের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্তের সঠিক গবেষণার বিকাশ। ৩. অ্যান্টিবডির টাইটার স্তরগুলো পরিমাপের জন্য সঠিক গবেষণা সম্পন্ন করা, যা কিনা কোনো ব্যক্তিকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে। ৪. চিকিৎসা এবং নিরাময়ের পরীক্ষা। ৫. ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করা।
অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুততম সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বায়োটেক কোম্পানিগুলোতে গবেষণায় প্রথম তিনটি ধাপে বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য সফলতা পেয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে অন্য দুটি ধাপেও দুর্দান্ত অর্জন দেখিয়েছেন, যা কিনা মহামারীর নিরাময় ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথে চালিত হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক ভুল তথ্যের সমান্তরাল বিস্তার সত্ত্বেও এ অগ্রগতি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও বিজ্ঞানীদের অবদানকে তুলে ধরছে। একই সময়ে পূর্ববর্তী অন্যান্য আরএনএ মহামারীর সঙ্গে কভিড-১৯-এর সাফল্যের তুলনা বলে দিচ্ছে গবেষণা কত দ্রুততার সঙ্গে এগিয়েছে।
উদাহরণ এইডস টার্মটি সিডিসি দ্বারা প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ সালে। প্রথম কেসটি সামনে আসার প্রায় ১৮ মাস পর এটি করা হয়েছিল। যার প্রায় চার বছর পর জানা গিয়েছিল এইচআইভির কারণে এইডস হওয়ার কথা। যার দুই বছর পর ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কর্তৃক এইচআইভি শনাক্ত করার জন্য বাণিজ্যিকভাবে ব্লাড টেস্ট করার লাইসেন্স দেয়া হয়। তার এক বছর পর ১৯৮৭ সালের মার্চে এসে এফডিএ প্রথম অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল ড্রাগ অনুমোদন দেয়। একই বছরের আগস্ট মাসে ভ্যাকসিনের প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়। এরপর ভ্যাক্সগেন প্রথম বৃহৎ আকারে ট্রায়াল শুরু করে ১৯৯৮ সালে। এসব ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যর্থ হয়। বর্তমানে বেশকিছু ভ্যাকসিনের গবেষণা চলছে, কিন্তু কোনোটিকেই এখন পর্যন্ত এফডিএ এইচআইভি ভ্যাকসিন হিসেবে অনুমোদন দেয়নি।
তুলনামূলকভাবে অবশ্য সার্স মহামারীর ক্ষেত্রে গবেষণার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার দেখা মিলেছে। যার প্রাদুর্ভাব শুরু হয় ২০০৩ সালে। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে অ্যাটিপিক্যাল নিউমোনিয়ার প্রথম কেসটি সম্ভবত সার্স-কোভ ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট, যার দেখা মেলে চীনের দক্ষিণাঞ্চলে। পাঁচ মাসের কম সময়ে সিডিসি এর জিনগত সিকোয়েন্সও আবিষ্কার করে। ২০০৩ সালের মে ও ডিসেম্বর মাসে দুটি আর্টিকেলও প্রকাশিত হয় নিউ ইংল্যান্ড ও জার্নাল অব মেডিসিনে। মানুষের রক্তে বা টিস্যুতে ভাইরাস শনাক্ত করার উপায় সম্পর্কে বলা হয়। যা কভিড-১৯ মহামারীতেও ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে। তবুও সার্সের ক্ষেত্রে আমরা তেমন অগ্রগতি দেখিনি, যা কিনা কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মাসের মাঝে দেখা গেছে। এখন পর্যন্ত সার্সের কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। এছাড়া সার্স মহামারী কয়েক বছরের মাঝে তীব্রতা হারিয়ে ফেলায় এ নিয়ে কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও সম্পন্ন হয়নি এবং এফডিএ অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিনও নেই।
অথচ কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে মহামারী সময়েই বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে বেশকিছু মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। উহানে প্রথম কেস শনাক্ত হওয়ার দুই সপ্তাহ পর প্রথম ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা যায়। দ্রুততম সময়ে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীরা চিকিৎসার কার্যকারিতা পরীক্ষা শুরু করেন। এফডিএ ফেব্রুয়ারির শুরুতে জরুরি ভিত্তিতে আরটি-পিসিআর টেস্ট শুরু করে। এর নির্ভুলতার সফলতার বিষয়টিও এখন সামনে এসেছে। মার্চে এফডিএ ভাইরাসের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে অ্যান্টিবডি শনাক্ত করার কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এক ডজনের বেশি সেরোলজি টেস্ট চলমান আছে। যার কাজ শরীরে অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা।
একইভাবে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কাজও বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। অনেকগুলো কোম্পানি একসঙ্গে প্রচলিত ও নতুন উপায়ে ট্রায়ালের কাজ সম্পন্ন করছে। ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ১০০টির বেশি ভ্যাকসিন বর্তমানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায়ে আছে।
দ্রুতগতিতে সায়েন্টিফিক প্রিপ্রিন্টস ও পিয়ার-রিভিউড আর্টিকেল মহামারী চলাকালে প্রকাশিত হয়েছে। এ রকম অনেক প্রকাশনায় কিছু তথ্যগত ভুলভ্রান্তি ও দুর্বল বিশ্লেষণ রয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে ভাইরাসটি যেভাবে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে বিশ্বব্যাপী হুমকি তৈরি করেছে তাও লক্ষণীয়। সত্য আবিষ্কারে বর্তমান এই বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়তো যথেষ্ট নয়। কিন্তু বর্তমান মহামারীতে ত্বরিত প্রতিক্রিয়ায় এবং ভবিষ্যৎ মহামারীগুলোর জন্য এসব গবেষণা যথেষ্ট সম্ভাবনাময়।
দ্য সায়েন্টিস্ট





