করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হওয়ার পর পরই মায়ো ক্লিনিকের চিকিৎসকরা দ্রুত দিকনির্দেশনা চেয়েছিলেন। রক্ত জমাট বাঁধা রোগীদের কী ধরনের চিকিৎসা করা উচিত? গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে কী ফলাফল আশা করা উচিত? মায়ো ইন্টার্নিস্ট হাসান মুরাদ বলেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের বন্যায় বাছাই করার মতো সময় তাদের হাতে ছিল না। কিছু গবেষণা ফলাফল অন্যান্য গবেষণার বিরোধিতা করেছে এবং চিকিৎসা সমিতিগুলো ক্লিনিক্যাল নির্দেশনার বিষয়ে একমত হতে পারেনি।

সাধারণত বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের বিশদ বিবরণ ও ডাটা বিশ্লেষণ করার নিয়মতান্ত্রিক পর্যালোচনার সাহায্যে এ ধরনের বিভ্রান্তির সমাধান করা হয়। পদ্ধতিগত পর্যালোচনা প্রায়ই নিরাপদ ও সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা সম্পর্কে ভালো ফলাফল দেয়, যা যেকোনো একক গবেষণার চেয়ে বেশি প্রামাণিক। তবে পর্যালোচনাগুলো সম্পূর্ণ হতে এক বা দুই বছর সময় লাগে।

প্রমাণভিত্তিক পর্যালোচনা পরিচালনায় বিশেষজ্ঞ মুরাদ লক্ষ করলেন, মহামারীর মাঝামাঝি সময়ে এসে সাধারণভাবে পর্যালোচনা করার এত সময় নেই। সুতরাং এ বসন্তে তিনি ও তার সহকর্মীরা বিষয়টিকে ত্বরান্বিত করতে কাজ শুরু করেন। তারা প্রাসঙ্গিক বৈজ্ঞানিক নিবন্ধগুলোর একটি সংরক্ষণাগার তৈরি করেছেন এবং কভিড সম্পর্কে দ্রুত সাতটি পর্যালোচনা তৈরি করেছেন। কিছু কিছু পর্যালোচনা মাত্র তিনদিনেই করা সম্ভব হয়। যদিও মুরাদের দলটি একা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্য গোষ্ঠীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা প্রায় দুই হাজার পদ্ধতিগত পর্যালোচনা তৈরি করে দ্রুত কভিড-১৯-এর চিকিৎসা মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন।

গবেষকরা বলছেন, তারা কোনো চিকিৎসা কার্যকরী কিনা তা নির্ধারণ করতে সহায়তা করেছেন এবং কভিড-১৯ সম্পর্কে জ্ঞানের ফাঁকগুলো হাইলাইট করেছেন। তবে এখন পর্যালোচনাগুলোর অথরিটি সংস্থা নিজেই তদন্তের মুখে পড়েছে। তারা গুরুতর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে—দ্রুত উত্তর দিতে গিয়ে তারা কি মহামারী সম্পর্কিত গবেষণা পর্যালোচনাগুলোর পূর্ণাঙ্গতা ও মানের সঙ্গে আপস করছে?

কিছু প্রাথমিক উত্তর হতাশ করেছে। অনেক কভিড-১৯ গবেষণা পর্যালোচনায় ত্রুটি রয়েছে। গবেষকরা সিদ্ধান্তে এসেছেন, পর্যালোচক বা বিশেষজ্ঞরা বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে দরকারি সংকেত পৃথক করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন করোনাভাইরাসের ওষুধ চিকিৎসা সম্পর্কে ২৪০টি পর্যালোচনার একটি অপ্রকাশিত বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে, সেখারকার ৯৫ শতাংশ এরই মধ্যে পুরনো হয়ে গেছে। বিশ্লেষণটির লেখক চিলির পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টার্নিস্ট গ্যাব্রিয়েল রাডা বলেন, প্রতিটিতে র্যানডম ট্রায়াল অনুপস্থিত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে পর্যালোচকরা এরই মধ্যে প্রকাশিত ট্রায়ালগুলো মিস করেছেন।

এপিস্টেমোনিকোস নামে একটি ডাটাবেজে করোনাভাইরাস সম্পর্কে ৩৫ হাজারেরও বেশি গবেষণা ও প্রিপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করে রাডা ও তার দল আবিষ্কার করেন যে সেখানে মাত্র ২১১টি গবেষণা ট্রায়াল ডিজাইন অনুসরণ করেছে। বিভিন্ন সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কিছু পদ্ধতিগত পর্যালোচনা বেশ কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যেমন র্যান্ডম ট্রায়াল করা ওষুধগুলো কভিডের চিকিৎসা প্রভাবিত করেছে। ডব্লিউএইচও ডেক্সামেথাসন নিয়ে একটি মেটা-বিশ্লেষণ প্রকাশ করে নিশ্চিত করেছে যে এটা লক্ষণের তীব্রতা হ্রাস করেছে।

পুরনো পর্যালোচনা এড়াতে অন্তত ছয়টি দল নতুন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছে, প্রাসঙ্গিক পর্যালোচনা। তারা নতুন প্রাসঙ্গিক গবেষণা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে আপডেট করে। অস্ট্রেলিয়ার বন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর এভিডেন্স-বেজড হেলথ কেয়ারের পল গ্লাসজিও মূল পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও আপডেট উভয়ের জন্য কাজটি হালকা করার বিষয়ে আশাবাদী। র্যান্ডম ট্রায়াল পরিচালনা করা হয়নি এমন গবেষণাগুলো বাদ দিয়ে তিনি পুনরাবৃত্ত কাজগুলো চিহ্নিত করতে সফটওয়্যার ব্যবহার করেছিলেন।

প্লস মেডিসিন জার্নালের জুন সম্পাদকীয়তে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক কেয়ার চিকিৎসক ত্রিশা গ্রিনহাল্গ লিখেছিলেন, ইতিহাস একদিন আমাদের বলবে প্রমাণভিত্তিক অনুশীলন মেনে চলা কভিড-১৯-এর জনস্বাস্থ্যের প্রক্রিয়াটিকে সহায়তা কিংবা বাধা দিয়েছিল কিনা।

সায়েন্স ম্যাগ