বিশ্বব্যাপী ১৫০টির বেশি ভ্যাকসিন বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, বৈশ্বিক সংকট কমাতে রেকর্ড সময়ের মধ্যে যেকোনো একটি বাজারে আসবে। দ্রুত ভ্যাকসিন আনতে অনেকগুলো প্রচেষ্টা চলমান আছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অপারেশন ওয়ার্প স্পিড উদ্যোগও রয়েছে, যার মাধ্যমে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে ভ্যাকসিনের বিকাশ এবং কার্যকর ভ্যাকসিনের ৩০০ মিলিয়ন ডোজ বিতরণের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ভ্যাকসিনের বিকাশ ও বিতরণে বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেখানে ২০২১ সালের শেষ নাগাদ দুই বিলিয়ন ভ্যাকসিন বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

একটি ভ্যাকসিন অনুমোদন পাওয়ার পরও তাকে বেশকিছু বাধা পার করে আসতে হয়। বিশেষ করে বিষয়টি যখন উৎপাদনের মাত্রা ও বিতরণ সংক্রান্ত হয়। পাশাপাশি কারা আগে ভ্যাকসিন পাবে সেই প্রশ্নটিও এখানে চলে আসে। জরুরি প্রয়োজনের কারণে সার্স-কোভ-২ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে কিছু আবিষ্কারককে ক্লিনিক্যাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করতে হচ্ছে, যেখানে অনেকে ট্রায়ালের ধাপগুলো একযোগে পরিচালনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক অ্যান্থোনি ফাউসি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল অতি পজিটিভ বা নেগেটিভ হওয়ার সাপেক্ষে সুরক্ষা পর্যবেক্ষণ বোর্ড চাইলে আগেই ট্রায়াল শেষ করে দিতে পারে।

যদিও এটা বলা কঠিন, কোন ভ্যাকসিন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত সফলতা পাবে। এর পরও তৃতীয় ধাপে থাকা সম্ভাব্য ভ্যাকসিনগুলোর সর্বশেষ অবস্থা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

ভারত বায়োটেক

এ ভ্যাকসিনটির নাম কোভ্যাক্সিন। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিসিন রিসার্চ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটউট অব ভাইরোলজির সহযোগিতায় একটি ভারতীয় বায়োটেকনোলজি সংস্থা। কোভ্যাক্সিন ব্যবহার করে করোনাভাইরাসের নিষ্ক্রিয় কিংবা অসংক্রামক রূপ, যা আর রোগের কারণ নয় কিন্তু তার পরও ইমিউন সিস্টেমকে উজ্জীবিত করতে পরে। ১৪ দিনের ব্যবধানে এ ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ প্রয়োজন। এর ফল অনলাইনে দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত পিআর পর্যালোচনায় দেখা যায়নি ভ্যাকসিনটি বানরের মাঝে অ্যান্টিবডি উৎপাদন করতে পারে কিনা। ২৩ অক্টোবর ভারত বায়োটেক ঘোষণা দেয় যে, তারা ২৬ হাজার অংশগ্রহণকারীর মাঝে তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল চালানোর অনুমোদন পেয়েছে।

নোভাভ্যাক্স

এ ভ্যাকসিনটির নাম এনভিএক্স-কোভ২৩৭৩। এটি ম্যারিল্যান্ডের গেইথার্সবার্গভিত্তিক একটি বায়োটেকনোলজি কোম্পানি। নোভাভ্যাক্স করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনগুলোকে বায়োইঞ্জিনিয়ারিং করেছে, এ অংশটি ভাইরাসকে কোষে আক্রমণ করতে সহায়তা করে। কিন্তু এগুলো প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে না কিংবা কভিড-১৯-এর কারণ হতে পারে না। এ ভ্যাকসিনটি সেই প্রোটিনগুলোকে নাকলবোন-আকারের ন্যানো পার্টিকেলের সঙ্গে যুক্ত করে। এটি ইনজেক্ট করা হয় ম্যাট্রিক্স এম সহায়কসহ, এটি একটি যৌগ যা ইমিউন সেলকে উজ্জীবিত করে। সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখ নোভাভ্যাক্স যুক্তরাজ্যে তার তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের ঘোষণা দেয়।

জনসন অ্যান্ড জনসন

এ ভ্যাকসিনটির নাম হচ্ছে জেএনজে-৭৮৪৩৬৭৩৫। এটি নিউজার্সিভিত্তিক বিশ্বের বৃহত্তম মাল্টিন্যাশনাল করপোরেশন, যা স্বাস্থ্যসেবা এবং ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। জনসন অ্যান্ড জনসন অ্যাডেনোভেক্টর ভ্যাকসিনের বিকাশ ঘটাচ্ছে। ইবোলা, জিকা ও এইচআইভি ভ্যাকসিনের বিকাশের জন্য ব্যবহূত কৌশলকেই এখানে ব্যবহার করছে জনসন অ্যান্ড জনসন। জুলাইয়ে নেচারে প্রকাশিত একটি গবেষণা দেখিয়েছে এ ভ্যাকসিন বানরের মাঝে নিউট্রোলাইজিং অ্যান্টিবডি প্রকাশ করতে পারে এবং একটি ডোজেই পুরোপুরি কিংবা প্রায় পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারে। ২৩ সেপ্টেম্বরই তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরুর ঘোষণা। ১২ অক্টোবর সুরক্ষা ইস্যুতে তারা ট্রায়াল থামিয়ে দিয়ে ২৩ অক্টোবর থেকে ফের শুরু করে।

মোডের্না থেরাপিউটিকস

এ ভ্যাকসিনটির নাম এমআরএনএ-১২৭৩। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের সহযোগিতায় এমআইটিভিত্তিক একটি বায়োটেক কোম্পানি। এ ভ্যাকসিন প্রার্থী নির্ভর করে ভাইরাসের জিনগত উপাদানের বিভিন্ন অংশ ইনজেক্ট করার ওপর। এটি ভাইরাল প্রোটিন সৃষ্টি করে, যা করোনাভাইরাসকে নকল করে। পাশাপাশি ইমিউন সিস্টেমকে প্রশিক্ষিত করে এর উপস্থিতিকে শনাক্ত করার জন্য। এ প্রযুক্তি কখনো কোনো রোগের জন্য লাইসেন্স পায়নি। এটি যদি সফল হয় তবে এটি হবে প্রথম অনুমোদনপ্রাপ্ত এমআরএনএ ভ্যাকসিন। চার সপ্তাহের ব্যবধানে এ ভ্যাকসিনের দুটি ডোজের প্রয়োজন হবে। ২৭ জুলাই তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর ঘোষণা দেয় কোম্পানিটি। পাশাপাশি ২০২১ সাল থেকে প্রতি বছর ৫০০ ডোজ সরবরাহ করার ঘোষণাও দেয় মোডের্না।

ফাইজার

এ ভ্যাকসিনটির নাম বিএনটি১৬২বি২। এটি নিউইয়র্কভিত্তিক বিশ্বের বৃহত্তম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর একটি। এর সঙ্গে সহযোগিতায় আছে জার্মান বায়োটেক কোম্পানি বায়োনটেক।

ফাইজার ও বায়োনটেকও এমআরএনএ ভ্যাকসিন বিকাশের কাজ করছে। কোম্পাটি একই কৌশল ক্যানসারের পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিল। ডিসেম্বর ২০২১ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য ফাইজার প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে মার্কিন সরকারের সঙ্গে। জুলাইয়ের ২৭ তারিখ একটি ট্রায়াল শুরু করেছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের সম্মিলনে। ২০২১ সালের শেষ নাগাদ এটি ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডোজ সরবরাহ দেয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড

এ ভ্যাকসিনটির নাম সিএইচএডিওএক্স১এনকোভ-১৯। যুক্তরাজ্যের এর এ নামি বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে আছে বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি আস্ট্রাজেনেকা। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি পরিচিত ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন নামেও। ৮ সেপ্টেম্বর সুরক্ষা ইস্যুতে ট্রায়াল বন্ধ হওয়ার পর ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ভ্যাকসিনটি। যদিও পরে ছাড়পত্র পেয়ে আবার ট্রায়াল শুরু করেছে তারা।

সিনোভ্যাক

এ ভ্যাকসিনটির নাম করোনাভ্যাক। চীনা এ বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিটি কাজ করছে ব্রাজিলিয়ান গবেষণা কেন্দ্র বুটানটানের সঙ্গে। করোনাভ্যাক করোনাভাইরাসের অসংক্রামক ভার্সনটি ব্যবহার করে ইমিউন প্রতিক্রিয়া উজ্জীবিত করার জন্য। ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশেও সিনোভ্যাকের ট্রায়াল পরিচালনা করার কথা রয়েছে।

এছাড়া অন্যদের মধ্যে সিনোফার্ম, মারডোক চিলড্রেন’স রিসার্চ ইনস্টিটিউট, কানসিনো বায়োলজিস এবং দ্য জার্মান ন্যাশনাল সেন্টার অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজির ভ্যাকসিনও এ প্রতিযোগিতায় ভালো অবস্থানে আছে।

দ্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত