নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিটি দেশ নিজেদের মতো কৌশল অবলম্বন করেছে। নিজেদের আর্থসামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর ভর করে সবাই মারণঘাতী এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। তবে একটা বিষয়ে সবাই একমত যে মহামারীর বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে চূড়ান্তভাবে রক্ষা পেতে হলে যা দরকার তা হলো ভ্যাকসিন। একমাত্র কার্যকর ভ্যাকসিনই পারে কভিড-১৯-এর ছোবল থেকে মানুষকে রক্ষা করতে। এরই মধ্যে বিশ্বে অনেকগুলো কোম্পানি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করে
সাধারণত ভ্যাকসিন কাজ করে মানবদেহে প্যাথোজেনের অংশ ইংজেক্ট করার মাধ্যমে। এই অংশগুলোকে বলা হয় অ্যান্টিজেনস, যা কিনা শরীরে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত হয়। অ্যান্টিজেনস সাধারণ ভাইরাসের মৃত অথবা দুর্বল সংস্করণ দ্বারা গঠিত হয়। যা কিনা শরীরের ইমিউন সিস্টেমের প্রতিক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে।
অ্যান্টিজেন আপনার শরীরকে রোগ দ্বারা অসুস্থ করার জন্য যথেষ্ট না। কিন্তু এটিকে বহিরাগত রোগজীবাণু হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য শরীরের পক্ষে যথেষ্ট এবং ইমিউন সেল উৎপাদন শুরু করে, যা কিনা জীবাণু ধ্বংস করতে পারে।
একবার যদি তারা মৃত অথবা দুর্বল রোগজীবাণু ধ্বংস করতে পারে, সেক্ষেত্রে কিছু ইমিউন সেল কাজ করে মেমোরি সেল হিসেবে। যদি প্রকৃত ভাইরাস আঘাত হানে তখন তারা সাড়া দেয় এবং শরীর আক্রান্ত হওয়ার আগেই জীবাণুকে ধ্বংস করে।
কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার
সাধারণত ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হতে কয়েক বছর সময় লাগে। বেশ কয়েক ধাপের কঠোর পরীক্ষার ভেতর দিয়ে তা উৎপাদিত হয় এবং প্রয়োজন হয় বড় পরিসরে ট্রায়ালেরও।
কিন্তু পরিস্থিতি যে রকম তাতে পৃথিবীর করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের খুব দ্রুতই প্রয়োজন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুবরণ করছে। এ অবস্থায় বিশ্বের একশর বেশি দেশ দ্রুত গবেষণার মাধ্যমে কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ
মার্চের মাঝামাঝিতে যুক্তরাষ্ট্রে মানবদেহে প্রথম ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরু হয়। যেখানে অর্থায়ন করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ। এটি অনুষ্ঠিত হয় সিয়াটলে। এই ট্রায়ালে ৪৫ জন স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ করেন। যাদের আগামী কয়েক মাস খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এই ট্রায়াল অবশ্য ভ্যাকসিন তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় পাশ কাটিয়ে গেছে। যেমন প্রাণীদেহে ট্রায়াল করা। এই ভ্যাকসিন মূলত বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন করোনাভাইরাস নিয়ে তাদের পূর্ববর্তী জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে, যা কিনা এর আগে সার্স ও মার্স নামে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এরপর এপ্রিলে ইউরোপে প্রথমবারের মতো মানবদেহে ট্রায়াল শুরু হয়। যাকে কিনা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছিল। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি দল তিন মাসের মধ্যে এই ভ্যাকসিনটি তৈরি করে। এর ট্রায়ালের জন্য এক হাজার মানুষকে জড়ো করা হয়। যেখানে অর্ধেককে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের ভ্যাকসিন দেয়া হয় এবং বাকি অর্ধেককে মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন। একমাত্র গবেষকরাই জানেন কোন ভ্যাকসিন কাদের দেয়া হয়েছে।
আবার ভাইরাসের জেনেটিক কোডের কিছু অংশ পুরো ভাইরাস তৈরির বদলে ব্যবহার করা হয়েছে কেবল ভ্যাকসিন বানানোর জন্য। অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন ডোজ এবং একাধিক ভ্যাকসিন দেয়া হবে। তারপর তাদের মাঝে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে কিনা তাও দেখা হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা তা হলো ইমিউনিটি।
ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি
এপ্রিলে ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট সানোফি ও জিএসকেও যোগ দেয় ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দৌড়ে। যাকে তারা বলছিল অভূতপূর্ব বলে। সানোফি কাজ করছিল এস-প্রোটিন কভিড-১৯ অ্যান্টিজেন নিয়ে। যাকে তারা বলেছে সার্স-কোভ-২-এর প্রোটিনে পাওয়া জেনেটিকের হুবহু মিলসম্পন্ন। জিএসকে কাজ করছে ‘অ্যাডজুভান্ট’
প্রযুক্তি নিয়ে। অ্যাডজুভান্ট
ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কারণ যখন ভ্যাকসিন গ্রহণ করা হয় তখন তা ব্যক্তির ইমিউন সিস্টেমকে ত্বরান্বিত ও দীর্ঘায়িত করে।
এক্ষেত্রে সানোফির কাছে করোনাভাইরাসের জেনেটিক উপাদান রয়েছে, যা কিনা তাদের ভ্যাকসিনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং জিএসকের সেই জিনগত উপাদানকে কার্যকর করার উপায় রয়েছে, যা কিনা বৈশ্বিক মহামারী মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোটিনভিত্তিক অ্যান্টিজেন ও অ্যাডজুভান্টস ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে বিস্তৃতভাবে ব্যবহূত হয়। ট্রায়ালের কাজ বেশ জোরের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে ২০২১ সালের মাঝামাঝিতে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে।
অবশ্য কেবল এই কয়েকটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিই যে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা করছে তা নয়। পিফিজারও কাজ করছে জার্মানভিত্তিক কোম্পানি বায়োনটেকের সঙ্গে। জার্মানিতে তারা ট্রায়ালও শুরু করেছে।
এশিয়া-প্যাসিফিক
এপ্রিলেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কর্তৃক তৈরি ভ্যাকসিন অস্ট্রেলিয়ায় ট্রায়াল করার অনুমতি প্রদান করে। অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (সিএসআইআরও) বলেছে, প্রাণীদেহকে মডেল হিসেবে নিয়ে এই টেস্ট ভ্যাকসিনের প্রথম বিস্তৃত প্রাক-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এই পরীক্ষায় ফেরেটস নামে এক ধরনের প্রাণীকে ব্যবহার করা হয়েছে, যারা কিনা মানুষের মতো করেই করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছিল।
এদিকে কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরির পথে চীন এগিয়ে আছে। ক্যানসিনো বায়োলজিস নামে একটি কোম্পানি ভাইরাস প্রোটিনের পূর্ববর্তী জ্ঞান এবং ভ্যাকসিনকে কাজে লাগিয়ে এমন কিছু তৈরির চেষ্টা করছে যাকে বলা হচ্ছে এডি৫-এনকোভ। প্রাণীদেহে সাফল্য লাভের পর এটি এখন মানবদেহেও ট্রায়ালের কাজ শুরু করেছে। যা কিনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে তাদের এগিয়ে রেখেছে। এছাড়া চীনে আরো একাধিক কোম্পানি ভ্যাকসিন আবিষ্কারে নিজেদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
অন্তত আরো এক বছর প্রয়োজন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় ভ্যাকসিন আবিষ্কারের যে প্রচেষ্টা তা অভূতপূর্ব। কিন্তু পাশাপাশি অনেক বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সব মিলিয়ে ভাইরাস সামনে আসার অন্তত ১২-১৮ মাস পর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। সময়টা দূরে মনে হতে পারে। কিন্তু এটিই আবার অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কম। যদিও ভ্যাকসিন কার্যকারিতার শতভাগ নিশ্চয়তাও কেউ এখনই দিতে পারবে না।
আল জাজিরা





