নভেল করোনাভাইরাসে একদিকে পুরো পৃথিবীতে কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে, অন্যদিকে ভাইরাসটিকে পরাস্ত করতে ভ্যাকসিন ও ওষুধ আবিষ্কার করতে রাতদিন পরিশ্রম করছেন গবেষকরা। চলছে কয়েকটি ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এর মধ্যে
প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ রেমডিসিভির। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি একটি ভ্যাকসিনেরও মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে।
এদিকে ম্যালেরিয়ার প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ বিশ্বনেতারা করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় কার্যকর হিসেবে বর্ণনা দিয়েছেন। এর পরই বিশ্বব্যাপী ওষুধটির সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে এবং অনেক দেশে এটি পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও কভিড-১৯-এর চিকিৎসায় এ ওষুধটির কার্যকারিতা নিয়ে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো প্রমাণ নেই। ওষুধগুলোর কার্যকারিতার নিশ্চয়তায় কিছু মানুষ এখন নতুন ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ট্রায়ালগুলোতে অংশ নিতে চাচ্ছেন না। ফলে দীর্ঘায়িত হতে পারে কভিড-১৯-এর প্রতিরোধ ও চিকিৎসা।
ট্রাম্প ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর মতো রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থনের কারণে করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও তার ঘনিষ্ঠ রাসায়নিক ক্লোরোকুইন অনর্থক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। অথচ করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এটা কাজ করে—এ ধারণা সমর্থন করার জন্য খুব অল্প ডেটা রয়েছে। তবুও বিশ্বজুড়ে ওষুধটির ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং এটা অন্যান্য সম্ভাব্য চিকিৎসার ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাগুলোকে প্রভাবিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান মেডিকেল স্কুলের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল কৌল বলেন, যখন আপনার চারপাশে হতাশাগ্রস্ত মানুষ ও চিকিৎসকরা রয়েছেন, তখন আপনি বিশ্বাস করতে চান যে কার্যকর কিছু আপনার কাছে আছে। যেটা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। তবে দিন শেষে এটি কার্যকর না হলে কাউকেই সহায়তা করবে না। প্রমাণ না হওয়ার আগেই এমন তথ্য উপস্থাপন অন্য গবেষণায় অংশগ্রহণ থেকে মানুষদের বিরত রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার জন্য হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইন অনুমোদন দেয়। এরপর ফেব্রুয়ারিতে গবেষকরা দেখেছিলেন, ক্লোরোকুইন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হ্রাস করতে পারে। কিছুদিন পর চীনের দশটি হাসপাতালে কভিড-১৯ রোগীদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ পরীক্ষাগুলো পরামর্শ দেয় ক্লোরোকুইন কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় রোগের সময়কাল কমিয়ে আনতে পারে। এরপর এ কয়েকটি ছোট ডেটা নিয়েই ওষুধটি নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়। যদিও সেখানে এটাও পরিষ্কার করে বলা হয়নি যে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইনের মধ্যে কোনটি কার্যকর। আবার কিছু গবেষণায় পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে এ চিকিৎসা রোগীদের ক্ষতি করতে পারে।
প্রথম থেকেই করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে ওষুধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জোর প্রচেষ্টা চলছিল। কাজগুলো এগোচ্ছিলও বেশ দ্রুত। কিন্তু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের এমন মন্তব্য ওষুধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারকে ধীরগতি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওষুধগুলোর কার্যকারিতার নিশ্চয়তায় কিছু মানুষ এখন নতুন ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ট্রায়ালগুলোতে অংশ নিতে চাচ্ছেন না। এতে লম্বা হতে পারে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং জীবন যেতে পারে হাজার হাজার মানুষের।
নেচার ম্যাগাজিন





