করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ইউরোপীয় দেশগুলো লকডাউন আরোপ করলেও একটি দেশ ব্যতিক্রম ছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে সুইডেনের বাধ্যতামূলকের পরিবর্তে স্বেচ্ছানির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করা সব দেশে কার্যকরী হবে না।

ইউরোপের দেশগুলোয় সংক্রমণ বাড়ছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার মানুষ কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলেও ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জিন ক্যাসটেক্স জাতীয় লকডাউনের পরিবর্তে ভাইরাসের সঙ্গে বেঁচে থাকার এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। এ সপ্তাহে স্পেনে আক্রান্তের সংখ্যা সাত লাখ পেরিয়ে গেলেও দেশটি দ্বিতীয় লকডাউন ঘোষণার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ বলেছেন, আমাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে। তবে আমাদের নাগরিকদের সহায়তা দরকার।

অক্সফোর্ডের সেন্টার ফর এভিডেন্স-বেজড মেডিসিনের পরিচালক কার্ল হেনেঘান সুইডেনের মতো ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভরতা ও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, এমন একটি গ্রহণযোগ্য নীতি আহ্বান করেছিলেন। তবে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক র্যাব বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন।

ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকার ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থাগুলো এখন আর সর্বজনীন নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ঊধ্বর্তন একজন কর্মকর্তা বলেছেন, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি থেকে বিশ্ব সম্প্রদায় শিক্ষা নিতে পারে। ডব্লিউএইচওর ইউরোপের আঞ্চলিক জরুরি পরিচালক ডরিত নিতজান বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ীত্ব, নাগরিকদের যুক্ত করা ও স্বেচ্ছাসেবী সম্মতিতে সুইডেনের পদ্ধতিটি আকর্ষণীয়। কারণ এখন আমাদের সবাইকে ভাইরাসটির সঙ্গে বাঁচতে শিখতে হবে। এটার একক কোনো সমাধান নেই এবং প্রতিটি পন্থা পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

অনেক দেশের মতো সুইডেনও ১৬ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে তরুণদের জন্য বিদ্যালয় খোলা রেখেছিল। দেশটি ৫০ জনের বেশি লোকের জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সী ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া ১০ মিলিয়ন জনসংখ্যার এ দেশটি জনগণকে শারীরিক দূরত্বকে সম্মান করতে এবং যদি সম্ভব হয় তবে বাড়ি থেকে কাজ করতে অনুরোধ জানায়। বেশির ভাগ দেশ বিষয়গুলো মেনে চলতে আদেশ দিলেও সুইডেন তার নাগরিকদের আদেশ দেয়নি। দেশটিতে দোকান, বার, রেস্তোরাঁ ও জিম খোলা রাখা হয়েছিল এবং মাস্ক ব্যবহারেরও সুপারিশ করা হয়নি।

দেশটির প্রধান মহামারীবিদ অ্যান্ডারস টগনেল জোর দিয়েছিলেন যে লক্ষ্যটি দ্রুত হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা নয়। মহামারীর এ সংকটটি ম্যারাথন ছিল, স্প্রিন্ট নয়। যুক্তি দিয়ে সুইডেনের দৃষ্টিভঙ্গি লকডাউনের চেয়ে বেশি টেকসই প্রমাণ করা যেতে পারে। জনস্বাস্থ্যকে বিস্তৃত অর্থে দেখা উচিত। কঠোর বাধ্যতামূলক লকডাউনগুলো বেকারত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাসহ গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

যদিও এ দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে সুইডেনের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। মে মাসে দেশটিতে ইউরোপের মাথাপিছু হারে সর্বাধিক কভিড-১৯ মৃত্যুর রেকর্ড করেছে। দেশটির প্রতি মিলিয়নে মৃত্যুর হার স্পেন ও ইতালির তুলনায় কম হলেও নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। সুইডেনের প্রায় অর্ধেক মৃত্যু কেয়ার হোমগুলোয় হয়েছিল। এ কারণে অভিযোগ উঠেছিল যে দেশটি সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ লোকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। সরকার স্বাস্থ্য যত্ন খাতে মারাত্মক ব্যর্থতার বিষয়টি স্বীকার করেছে।

তবে নিতজান জোর দিয়েছিলেন যে সুইডেনের পদ্ধতি সব দেশে প্রযোজ্য নয়। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে অন্য দেশগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে, সুইডেনের সরকার ও জনগণের মধ্যাকার যোগাযোগটি ঐতিহাসিকভাবে খুব উচ্চস্তরের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। সুইডিশ জনগণ ও সরকার এভাবেই যোগাযোগ করে থাকে।

গার্ডিয়ান