নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিস্তার লাভ করার পর থেকে পরিবেশের পরিবর্তন বেশ চোখে পড়ার মতো। রোগ এবং দেশে দেশে লকডাউন যতই ছড়িয়েছে, আমাদের মাথার ওপর আকাশটাও ততই পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এমনকি আমাদের ফুসফুসের বাতাস এবং পায়ের নিচের মাটিও অনুভব করতে পেরেছে এ পরিবর্তনের প্রভাব।

রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই ও ফ্যাক্টরিগুলোও বন্ধ। যে কারণে শিল্পাঞ্চলগুলোর দূষণের মাত্রাও সংকুচিত হয়ে গেছে। যেটি শুরু হয়েছিল মূলত চীনকে দিয়ে। এরপর ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের হেভিওয়েট দেশগুলোয়ও এর প্রভাব পড়েছে। যেসব দেশে এখন কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইডের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পতন ঘটেছে। যা বাতাসের গুণগত মানের উন্নতি ঘটিয়েছে এবং হাঁপানি, হার্ট অ্যাটাক ও ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি কমিয়েছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়া পৃথিবী কেমন দেখাতে পারে, এটা তার একটি চিত্র তুলে ধরছে। অবশ্য এসব ভাইরাসটির কেবল স্বল্পমেয়াদি প্রভাব হতে পারে। এরপর কী হবে তা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

মূল পরিবেশ সূচকগুলো, যা কিনা গত অর্ধশতক ধরে ক্রমশ পতিত হচ্ছিল তা অনেকটা হঠাৎ করেই উন্নতির দিকে। চীন যারা কিনা কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় উত্স, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত তা নেমে এসেছে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। পরিমাণের দিক থেকে যা প্রায় ২৫০ মিলিয়ন টনের মতো। যা কিনা আবার যুক্তরাজ্যের বার্ষিক নিঃসরণের অর্ধেকের সমান। সব মিলিয়ে ইউরোপে নিঃসরণ কমতে পারে ৩৯০ মিলিয়ন টন পর্যন্ত। এমনকি ধারণা করা হচ্ছে, লকডাউন উঠে যাওয়ার পর এই গ্রহ ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক নিঃসরণের বড় পতনের সাক্ষী হতে পারে

এদিকে অনেকেই এখন টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে ঘরে বসে কাজ সারছে। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সরকারকে নতুন রাস্তা নির্মাণের চেয়ে ইন্টারনেটের গতি বাড়ানোয় বেশি বিনিয়োগ করতে বলেছেন।

এসব পরিবেশের জন্য ভালো সংবাদ। কারণ তেল হচ্ছে কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় উত্স। যা ক্রমশ পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছিল। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এটি হতে পারে নিঃসরণ কমানো এবং তেলের রাজত্ব শেষ করার পথে প্রথম পদক্ষেপ।

গ্লোবাল কার্বন প্রজেক্টের প্রধান রব জ্যাকসন বলেছেন, নিঃসরণের এ পতন বৈশ্বিক ও নজিরবিহীন। বেশির ভাগ অঞ্চলে বায়ুদূষণ কমে গেছে। আমরা কীভাবে বাতাসকে পরিষ্কার রাখতে পারি ভাইরাসটি যেন সেই শিক্ষাই দিচ্ছে। তবে তিনি এটিও বলেছেন যে মানুষের জীবনের বিনিময়ে পরিবেশগত এ অর্জনের মূল্য খুবই সাময়িক প্রমাণিত হতে পারে। পাশাপাশি মানুষের মৃত্যুর বাইরে এতে চাকরি হারাতে পারে ১০ লাখ লোক, তাই একে উদযাপন করতেও রাজি নন তিনি।

তবে পরিষ্কার পৃথিবীর এ ধারণা এরই মধ্যে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। যাকে দারুণভাবে তুলে ধরেছিলেন লেখক নাওমি ক্লেইন। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে জাতীয় সংকটকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ ও শ্রমগত অধিকার নিয়ে সরকারগুলো অজনপ্রিয় ও চরম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন জায়গায় এরই মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তেল কোম্পানিগুলো হোয়াইট হাউজে ভর্তুকি চেয়ে দেনদরবার শুরু করেছে। পরিবেশ রক্ষার সংস্থাগুলো তার আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বন্ধ করে রেখেছে। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পরিবেশের ওপর আরো বিরূপ হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে করোনা লকডাউন বন্যপ্রাণীর জীবনেও ফিরিয়ে এনেছে স্বস্তি। এ বছর এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণীদের নিহত হওয়ার পরিমাণ কমে এসেছে। যুক্তরাজ্যে বছরে এক লাখ শজারু, ৩০ হাজার হরিণ এবং ১ লাখ শেয়াল রাস্তায় প্রাণ হারায়। এছাড়া নানাভাবে আরো অনেক পাখি ও পোকা ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃত্যুবরণ করে, যা এখন অনেকটাই কমে গেছে।

অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, প্রকৃত চিত্র ভিন্নও হতে পারে। আমরা হয়তো ভুল ধারণা নিয়ে আছি। অসম পৃথিবীতে এই চিত্র আলাদা হতে যাচ্ছে। ধনী দেশগুলো হয়তো প্রকৃতির অস্থায়ী পুনরুদ্ধার দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু দরিদ্র দেশে বন্যপ্রাণীদের জীবনের হুমকি বাড়তে পারে। কারণ মহামারী মানে বিপন্ন প্রজাতি ও আবাস সংরক্ষণের জন্য তাদের কাছে অর্থ ও জনবলস্বল্পতা রয়েছে।

তবে সব মিলিয়ে এটা বড় সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়েই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ করোনার প্রভাব হয়তো এখনো আমাদের ধারণার বাইরে। তবে আরো নানা ধরনের সংকট যে ঘনিয়ে আসছে তা দৃশ্যমান। যেখানে বিশুদ্ধ হতে শুরু করা পরিবেশ পড়তে পারে আরো বড় বিপর্যয়ে।

দ্য গার্ডিয়ান