আন্না ওবেনাওফ কখনো তার ফলাফল প্রিপ্রিন্ট সার্ভারে (কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশিত বা পিয়ার রিভিউ হওয়ার আগে যে প্লাটফর্মে প্রকাশ করা যায়) পোস্ট করেননি। কিন্তু তিনি এপ্রিলে এসে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। তিনি মূলত অন্য একটি দলের সঙ্গে দুর্লভ স্কিন ক্যানসারের নানা বিষয় অনুসদ্ধান করার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করছিলেন। যে কারণে তাকে দ্রুতই তার গবেষণাপত্র বায়ো-আর্কাইভ নামে একটি প্রিপ্রিন্ট সাইটে প্রকাশ করতে হয়। বর্তমানে একই কাজ করে যাচ্ছেন কভিড-১৯ নিয়ে গবেষণা করতে থাকা হাজারো গবেষক। নিজের এই পদক্ষেপটি ওবেনাওফের জন্য দারুণ ব্যাপার ছিল। কারণ ভিয়েনার রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব মলিকিউলার প্যাথলজির এক ক্যানসার বায়োলজিস্ট তার গবেষণাপত্রটি পছন্দ করেন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াও জানান। ফলে ওবেনাওফ ভবিষ্যতে তার দলের আরো কাজ প্রিপ্রিন্ট সার্ভারে প্রকাশ করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।
কভিড-১৯ দেখিয়ে দিয়েছে কত দ্রুত এবং খোলামেলাভাবে বিজ্ঞানবিষয়ক প্রকাশনা প্রকাশিত হতে পারে। গবেষকরা এখন মহামারীর নানা দিক নিয়ে কাজ করছেন এবং প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত ফলাফলগুলো তারা প্রকাশ করছেন প্রিপ্রিন্ট সার্ভার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইটগুলোতে। জার্নালগুলোও রেকর্ড দ্রুততম সময়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভবে গবেষণাপত্রগুলো প্রকাশ করে একটা ধাক্কা দেয়। যাতে সহায়তা করেন গবেষকরা, যারা দ্রুততম সময়ের মাঝে পিয়ার রিভিউ করে দেন। এলসভিয়ার, স্প্রিংগার নেচার এবং নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনসহ ডজনের বেশি প্রকাশক এবং জার্নাল করোনাভাইরাস নিয়ে নতুন ও পুরনো গবেষণাপত্রগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তারা প্রাদুর্ভাব চলাকালে এটি চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গবেষকদের গবেষণাপত্র প্রিপ্রিন্ট সার্ভারে প্রকাশের ব্যাপারে উৎসাহিতও করেছিল।
এমনকি কভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রাপ্ত ফলাফলগুলো অনলাইনে প্রকাশের একটা ধারা তৈরি হয়েছিল এবং উন্মুক্তভাবে কাজ করার বিষয়েও। এ বিষয়ে পার্থের কার্টিন ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্যামেরন নেইলোন বলেন, আমরা যদি মনে করি উন্মুক্ত যোগাযোগ সংকটকালে মূল্যবান, তবে সেটি সাধারণ সময়েও মূল্যবান। যদিও মহামারীর অভিজ্ঞতা একজন স্বাধীন বিজ্ঞানীকে খোলামেলাভাবে এবং দ্রুতগতিতে কাজ করে তা প্রকাশ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে, তবে এটি কোনো বৈপ্লবিক ঘটনা ছিল না। নেইলন বলেন, আমি এটাকে বড় কোনো পরিবর্তন হিসেবে দেখছি না। যে বড় পরিবর্তনগুলো আসতে যাচ্ছে, তা কাঠামোবদ্ধভাবেই আসবে।
প্রিপ্রিন্টে ভিড়
প্রকাশনার ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন স্থায়ী হতে যাচ্ছে। বিজ্ঞানবিষয়ক গোষ্ঠীগুলো যেভাবে প্রিপ্রিন্টসকে গ্রহণ করেছে, সেটিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না, বলেছেন মেড-আর্কাইভ ও বায়ো- আর্কাইভের সহপ্রতিষ্ঠাতা জন ইংগলিস। পাশাপাশি মে মাস ছিল দুটো সাইটের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যস্ততম মাস।
বায়ো-আর্কাইভে গবেষণাপত্র জমা দেয়ার বিষয়টি অবশ্য মহামারীর আগে থেকেই বৃদ্ধি পেয়েছিল। করোনাভাইরাসের গবেষণাপত্র প্রদান বিষয়টিকে আরো বেশি ত্বরান্বিত করেছে। অন্যদিকে মেড আর্কাইভের ক্ষেত্রে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে কভিড-১৯ সংক্রান্ত ৩ হাজার ৭০০টিরও বেশি গবেষণাপত্র। ইংগলিসের মতে, মহামারী এই সাইটটির প্রোফাইল বেশ বাড়িয়ে দিয়েছে। যা কিনা মেডিকেল রিসার্চের অন্যান্য ক্ষেত্র বিকাশেরও সহায়তা করবে। তিনি বলেন, আমাদের অনেক অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, কিন্তু আমি মনে করি এখানে অনেক সচেতনতা প্রয়োজন।
যেহেতু ভাইরাসটি চীনেই প্রথম দেখা গিয়েছিল, তাই এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে প্রিপ্রিন্ট সাইটগুলোতে চীনের গবেষকদেরই প্রথম দিকে বেশি দেখা গিয়েছিল। এই পরিবর্তন স্থায়ী হতে পারে এবং এর ফলে দেশের বিজ্ঞান প্রকাশনা ইন্ডাস্ট্রিও বাড়তি গতি লাভ করতে পারে।
দ্রুত রিভিউ
গবেষণার কিছু ফলাফল যা সংকটকালে গবেষকরা অনলাইনে পোস্ট করেছেন তাতে সতর্কতার সঙ্গে সময় নিয়ে তৈরি করার চেয়ে দ্রুত সামনে পাঠানোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, বলেছেন লিংগলিস। এই ট্রেন্ড হয়তো মহামারী পরবর্তী সময়ে আর নাও থাকতে পারে।
যদিও বিজ্ঞানীরা এখনো চান ভালোভাবে ঘষামাজা করা পিয়ার রিভিউ করা কাজই সামনে আনতে। জার্নালগুলো পিয়ার রিভিউ করা গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রেই এখন প্রতিযোগিতা করছে। ১৪টি মেডিকেল জার্নালের ওপর বায়ো-আর্কাইভের করা এক জরিপ বলছে, করোনাভাইরাস সংক্রান্ত যেকোনো গবেষণাপত্র তারা অন্যান্য পেপারের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুততার সঙ্গে করেছে।
আমেরিকান সোসাইটি অব মাইক্রোবায়োলজির প্রধান নির্বাহী স্টেফানো বেরটোজি বলেন, এটা অসম্ভব যে জার্নালভিত্তিক পিয়ার রিভিউগুলো সবসময় এমন দ্রুতগতিতে কাজ করতে পারে। তিনি বলেন, নিয়মিত এটি করার জন্য দক্ষতার যে উন্নতি দরকার তা আমি দেখছি না। আমি মনে করি, এটা কেবল জরুরি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে করা সম্ভব হচ্ছে। তবে সংকটকালে রিভিউ করার ক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের উৎসাহিত করার যে বিষয়টি তা অব্যাহত থাকতে পারে। অনেক জার্নাল বিজ্ঞানী একটি পুল তৈরি করছে, যারা কিনা দ্রুত কভিড-১৯ সংক্রান্ত পেপার রিভিউ করবে। অনেক গবেষক প্রিপ্রিন্ট কিউরেট করার উদ্যোগ নিজেরাই নিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মাউন্ট সিনাইয়ের ইচান স্কুল অব মেডিসিনের প্রিসিসন ইমিউনোলজি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা বায়ো-আর্কাইভ ও মিড-আর্কাইভের ডজনের বেশি প্রিপ্রিন্টস রিভিউ করে নিজেদের মন্তব্য পোস্ট করেছেন। লিংগলিসের মতে, এটা দেখায় যে জার্নালভিত্তিক প্রক্রিয়ার বাইরেও পিয়ার রিভিউ সম্ভব। যা কিনা ভবিষ্যতের বিজ্ঞান প্রকাশনার ক্ষেত্রে
নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপ
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বিজ্ঞান প্রকাশনা জগতে বড় প্রভাব পড়বে অর্থনৈতিক দিক থেকে এবং তা কয়েক বছর ধরে চলবে। যদি অর্থনীতিতে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকে তবে প্রকাশনা ক্ষেত্রে যে সহায়তা বাজেট তা কাটছাঁট হতে পারে।
নেইলনের মতে, বড় প্রকাশকরা আয়ের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়বে না, এমনটা খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটবে। অনেক ইনস্টিটিউট প্রকাশকদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের পথ নিতে পারে। তবে ছোট প্রকাশকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এজন্য বিকল্প উপায়ের কথাও ভেবে রাখতে বলছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
নেচার ম্যাগাজিন





