উহানের হুনান সি ফুড মার্কেট থেকে কভিড-১৯ মহামারীর যাত্রা শুরু হওয়ার ১০ মাস পার হয়েছে। কীভাবে এ মহামারীর উত্পত্তি হয়েছিল সেই বিতর্কও একই সময় ধরে চলছে। কিন্তু মানুষ হয়তো শিগগিরই উত্তর জানতে পারবে কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের উত্পত্তি অনুসন্ধানের শেষ ধাপে উপনীত হয়েছে।

২৩ অক্টোবর একটি সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইমার্জেন্সিজ প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মাইকেল রায়ান বলেন, চীনা বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে দুই ধাপের প্রাথমিক গবেষণা শুরু করেছেন। সেই বিশেষজ্ঞ দলের অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে ডব্লিউএইচও আন্তর্জাতিক একট দল চীনে পাঠাবে। যেখানে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ বিজ্ঞানীরা একযোগে কাজ করে কভিড-১৯-এর শিকড় খুঁজে বের করবেন। 

এক সপ্তাহ পর সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল টেড্রোস অ্যাডহ্যানম বলেন, এ প্রক্রিয়ায় ডব্লিউএইচওর পূর্ণ সমর্থন দেয়ার আগে আন্তর্জাতিক একটি গবেষক দল চীনভিত্তিক দলটির সঙ্গে প্রথম ভার্চুয়াল মিটিং করেছে। ৫ নভেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নীরবে চীনের নিজেদের মিশনের বিস্তারিত প্রকাশ করে। যাকে তারা ব্যাখ্যা করে ‘আ গ্লোবাল স্টাডি অব দ্য অরিজিন অব সার্স-কোভ-২’ বলে।

এ তদন্ত শুরু করতে বেশ কয়েক মাস দেরি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য গবেষক এবং বিশ্বনেতারা সমালোচনাও শুরু করেন। যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প যিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চীনের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। প্রথম ধাপের গবেষণায় ডব্লিউএইচও সরাসরি মাঠে উপস্থিত ছিল না। তারা কেবল চীনা গবেষকদের সংগ্রহ করা পরিসংখ্যানের পর্যালোচনা করেছেন এবং তা নিয়ে আলোচনা করেন। কোনো কোনো প্রতিবেদনে সংস্থাটির বিরুদ্ধে দায় এড়ানোর অভিযোগও আনা হয়।

যদিও রোগ গোয়েন্দারা (ডিজিজ ডিটেক্টিভ) যারা একই ধরনের কাজে নিয়োজিত তারা বলেছেন, এটা সচরাচর এমনই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মী সংকট রয়েছে, যেখানে ১৫০টি দেশে তাদের সাত হাজার কর্মী রয়েছে। নিজেদের পক্ষ থেকে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের তদন্ত পরিচালনার জন্য তাদের সব সময় নির্ভর করতে হয় স্থানীয় দল কিংবা আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর। ২০০৩ সালে সার্স মহামারীর তদন্তে হংকং সরকারের গঠিত দলের সহসভাপতি সিয়ান গ্রিফিথস বলেন, কেন এটি বিস্তৃত হয়েছে এবং আমরা এখান থেকে কী শিখলাম তার বদলে আপনি যদি কারো ভুল খোঁজার ওপর মনোযোগ দেন, তবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা হবে। তার মতে, পেছনে ফিরে তাকানো এবং কাউকে দায়ী করা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক।

হোস্টের সন্ধানে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রায়ান বলেন, পরিকল্পনা মূলত শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে। যদিও চূড়ান্ত মিশনের জন্য সবাই একত্র হন জুলাইয়ে। যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দুজনের একটি দল তিন সপ্তাহের প্রাথমিক অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করে। তিনি বলেন, আমরা সব দলকে একত্র করি গবেষণার প্রয়োজনে, যাতে ভাইরাসের উত্পত্তিকে আরো ভালোভাবে বোঝা যায়।

সংস্থার মুখপাত্র মার্গারেট হ্যারিস বলেন, ভাইরাসের উত্পত্তিসংক্রান্ত এ গবেষণা আরো আগে শুরু করার সুযোগ ছিল না, কারণ চীনে সংস্থার প্রাথমিক মিশন ছিল মানুষের ওপর ভাইরাসের প্রভাব মোকাবেলাকে অগ্রাধিকার দেয়া।

তিনি আরো বলেন, সে সময় কীভাবে চিকিৎসা করা হবে, কোন বিষয়গুলো ভাইরাসের বিস্তৃতিতে ভূমিকা রাখছে, সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে কোন কৌশলগুলো কাজ করছে তার ওপর অন্য কিছু প্রাধান্য লাভ করেনি। হ্যারিসের মতে, আমাদের খুব দ্রুত জানা প্রয়োজন যে এ ভাইরাস আসলে কী ছিল এবং অসুস্থতা ও মৃত্যু রোধ করার সেরা উপায়টি কী? এর মাঝে কয়েক মাসের গবেষণার পর গবেষকরা এরই মধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে মহামারী শুরু হয়েছিল যাকে বলা হচ্ছে জোনোটিক স্পিলওভার থেকে। এমন একটি ঘটনা যেখানে জীবাণু প্রাণী থেকে মানুষে স্থানান্তরিত হয়।

জীববিজ্ঞানী লিনফা ওয়াং বলেন, এ দুর্ভাগ্যজনক স্থানান্তরটি কীভাবে ঘটেছে তা এখন নির্ধারণ করা যেতে পারে এপিডেমিওলজি এবং জেনেটিকস ব্যবহারের মাধ্যমে ‘পেশেন্ট জিরো’ সন্ধান করে। ওয়াং মূলত ‘ব্যাটম্যান’ হিসেবে পরিচিত। ২০০৩ সালে সার্সের সময় তার গবেষণাকর্ম ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। সেই মিশনে তিনি মধ্যবর্তী হোস্ট খুঁজে পেয়েছিলেন খাটাশ এবং পরে বাঁদুড়ের মাঝে।

কভিড-১৯-এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল বায়োলজিক্যাল নমুনার পরীক্ষা করা। যেমন রক্ত, যা নিয়মিত সংগ্রহ করা হয় এবং হাসপাতালে সংরক্ষণ করা হয়। গবেষকরা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই ঘোষণা দেন যে করোনাভাইরাসের আগে-পরের নমুনা নিয়ে গবেষণা করা হবে।

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটির পরিচালক ইয়ান লিপকিন বলেন, সার্স-কোভ-২ কতদিন ধরে মানব সমাজে প্রবেশ করেছে এবং কোথায় চালিত হচ্ছে তা জানতে আমি অ্যান্টিবডি দেখতে জমাকৃত মানুষের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করব।

এ পরীক্ষা প্রাথমিকভাবে কভিড-১৯ টাইমলাইন তৈরি করতে সাহায্য করবে। ক্রিস্টিয়ান জনসন নামে এক এপিডেমিওলজিস্ট বলেন, মূল প্রশ্নগুলো হবে, প্রাথমিকভাবে সংক্রমিত হওয়ার পর মানুষের আচরণ কেমন ছিল? লোকেরা কি নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করত বা নির্দিষ্ট জায়গায় ভ্রমণ করত কিনা?

ওয়াং বলেন, গবেষকদের ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং প্রাণী যোগাযোগ পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। এটা করতে হবে কোন কার্যকলাপ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলে তা দেখার জন্য। এ জরিপে বাঁদুড়, বনরুই, খাটাশ কিংবা অন্য যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী যা মার্কেটে দেখা যায় তার রক্ত, মূত্র ও মলের নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এগুলো প্রাণী বাণিজ্য ও সরবরাহ চেইনের সঙ্গেও যুক্ত। এরপর বিজ্ঞানীরা সংক্রমণ শনাক্তকরণের জন্য নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। যেখানে পিসিআর টেস্ট (ভাইরাসের জিনগত স্বাক্ষর চিহ্নিতকরণের জন্য) করা এবং অ্যান্টিবডি টেস্ট করা অন্তর্ভুক্ত। কিছু নমুনা ভাইরাস বেড়ে উঠতে পারে কিনা তা দেখার জন্য ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর আরো কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

অনেক গবেষক আতঙ্কিত যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নতুন এ প্রজেক্টে হয়তো কার্যকর কিছুই খুঁজে পাবে না, কারণ মহামারীর বয়স প্রায় এক বছর হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের একজন ইয়ানজং হুয়াং মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ নমুনা কিংবা প্রমাণগুলো এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে।

তবে রোগ গোয়েন্দা ড্যানিয়েল লুসি বলেন, এমন ইঙ্গিত আছে যা বলছে চীন হয়তো উল্লেখযোগ্য তথ্য সংগ্রহসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ সম্পন্ন করেছে। তিনি বলেন, অবশ্যই তারা তা করেছে। চীনের জাতীয় স্বার্থেই তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করতে চাইবে। যেখানে জনস্বাস্থ্য গভীরভাবে জড়িত। অবশ্য এখনো বেশকিছু রহস্য ও বাধা রয়ে গেছে। সেগুলো পার করে এ তদন্ত কী ফল নিয়ে আসতে পারে, তাই এখন দেখার অপেক্ষা।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক