করোনাভাইরাস মহামারীর শুরুতে কিছু গবেষক অতীতের প্রাদুর্ভাবগুলোর অভিজ্ঞতার দিকে নজর দিয়েছিলেন। তারা প্রস্তাব করেছিলেন অনেক রোগী পুরনো প্রতিকারের মাধ্যমে রক্ষা পেতে পারে, আর তা হলো সেরে ওঠা রোগীদের থেকে নেয়া প্লাজমা। ধারণাটি হলো সেরে ওঠা লোকদের প্লাজমায় কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে কাজ করা অ্যান্টিবডি থাকে, যা রোগীদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাটিকে ওই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহ দিতে পারে। এর পরই কভিড-১৯ চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে পদ্ধতিটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার রোগী প্লাজমা নিচ্ছে। মার্কিন গণমাধ্যম বাজফিডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্লাজমার অতি জনপ্রিয়তা এই চিকিৎসা পদ্ধতিটি কার্যকর কিনা এবং এটা কোন পর্যায়ের রোগীদের জন্য উপযুক্ত, সে উত্তর পাওয়া কঠিন করে তুলেছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারী বিশেষজ্ঞ ডব্লিউ ইয়ান লিপকিন নিউইয়র্ক টাইমসে বলেছেন, র্যানডম ট্রায়াল ছাড়া সেটাকে অর্থবহ করে তোলা খুব কঠিন। লিপকিন এ জাতীয় ট্রায়াল চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যেখানে রোগীদের প্লাজমা বা প্লাসবো গ্রহণের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছিল। তবে ট্রায়ালে যথেষ্টসংখ্যক অংশগ্রহণকারী তালিকাভুক্ত হওয়ার আগেই নিউইয়র্কের প্রাদুর্ভাব হ্রাস পেয়েছে। তিনি গবেষণাটি চালিয়ে যেতে সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চলে অংশীদারদের সন্ধান করেছেন। তিনি বলেন, তাদের খুঁজে পেতে খুব কষ্ট হচ্ছে, কারণ রোগী ও তাদের চিকিৎসকরা প্লাসবো নিতে হতে পারে জেনে অংশ নিতে নারাজ।
এপ্রিলের শুরুতে মায়ো ক্লিনিক পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) অনুমোদিত প্রোগ্রামের মাধ্যমে অনেক রোগী ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বাইরে প্লাজমা পেয়ে আসছেন। গত মাসে এই উদ্যোগ প্রিপ্রিন্ট জার্নালে প্রকাশিত হয়, যা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে প্লাজমা চিকিৎসা নিরাপদ। এই সপ্তাহে এটি আরো ৩৫ হাজার ৩২২ জন চিকিৎসা করা রোগীদের ফলাফল তুলে ধরেছে। সেখানে যারা বেশি ঘনত্বের অ্যান্টিবডির প্লাজমা পেয়েছিল এবং যারা তাদের অসুস্থতার আগেই চিকিৎসা পেয়েছিল তাদের কম অ্যান্টিবডিসমৃদ্ধ প্লাজমা পাওয়া বা পরে পাওয়া রোগীদের চেয়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি ছিল।
তবে মায়ো গবেষণায় র্যানডম ট্রায়ালগুলো অনেক ছোট আকারে ছিল। জুনে জ্যামা জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় চীনভিত্তিক গবেষকরা জানিয়েছেন, প্লাজমা চিকিৎসাপ্রাপ্ত রোগীদের ২৮ দিনের মধ্যে তারা সেরে ওঠা নিয়ে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য খুঁজে পাননি। তবে তারা তাদের পরীক্ষায় কেবল ১০৩ জন রোগীকে অংশগ্রহণ করাতে পেরেছিলেন।
পর্যাপ্ত রোগীর অভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্লাজমার ট্রায়াল থমকে গেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে টাইমস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এফডিএ প্লাজমার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন প্রস্তুত করছে, যা এর ব্যবহার আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ইয়েল নিউ হ্যাভেন হাসপাতালের সেন্টার ফর আউটকামস রিসার্চ অ্যান্ড ইভালুয়েশনের পরিচালক হারলান ক্রমহোলজ বলেছেন, মায়ো ক্লিনিকের নতুন গবেষণা মহামারীর সময় প্লাজমা চিকিৎসার জন্য আসলে কী পরিমাণ প্রমাণের দরকার, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে। সমস্যাটি হলো চিকিৎসার দৃষ্টান্ত পরিবর্তন করতে কী পরিমাণ প্রমাণ প্রয়োজন তা আমরা এখনো সমাধান করতে পারিনি।
গবেষণাটির সঙ্গে জড়িত সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ নিকোল বাউভিয়ার বলেছেন, এমনকি যদি সেরে ওঠা রোগীদের প্লাজমা উপকারীও হয় তবু এটা কোনো রোগের চূড়ান্ত চিকিৎসা হওয়ার কথা ছিল না। এটা আমাদের অন্যান্য চিকিৎসা উদ্ভাবনে আরো একটু সময় করে দেয় মাত্র।
দ্য সায়েন্টিস্ট





