করোনায় যারা অনেক বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং যাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে এটা আশা করা হয় যে তাদের পুরোপুরিভাবে সেরে উঠতে কয়েক মাস লাগতে পারে। তবে কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে অন্যান্য আরো অনেক প্রমাণ বলছে, কিছু লোক যাদের কিনা অপেক্ষাকৃত মৃদু উপসর্গ আছে এবং যারা বাসায় চিকিৎসা নিয়ে সেরে উঠছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা থাকতে পারে। অনেকের মধ্যে ক্লান্তি, প্যালপিটিশন বা বুক ধড়ফড় করা এবং পেশিতে ব্যথাসহ আরো বেশকিছু লক্ষণ থাকতে পারে ভাইরাস-পরবর্তী প্রভাব হিসেবে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৩.৯ মিলিয়ন মানুষের প্রায় ১০ শতাংশের লক্ষণ চার সপ্তাহের অধিক স্থায়ী হয়।

ক্রনিক ফ্যাটিগ বা দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি হলো মূলত ছয় সপ্তাহের অধিক স্থায়ী ক্লান্তি। ক্যান্সারের চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিসের বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল সেটিংয়ে এটি স্বীকৃত। যদি যুক্তরাজ্যে যারা কভিড-১৯-এ আক্রান্ত তাদের ১ শতাংশ তিন মাস এ অবস্থায় থাকে তবে হাজারো মানুষ কাজে ফিরতে পারবে না। তাদের সম্ভবত এমন সব জটিল চাহিদা থাকবে যা এ মুহূর্তে সমাধানের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস প্রস্তুত নয়।

কভিড-১৯ই কেবল দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির জন্য দায়ী নয়। দীর্ঘমেয়াদি এই ক্লান্তি অন্যান্য ভাইরাল সংক্রমণ যেমন এপস্টেইন-বার ভাইরাস, যা কিনা সংক্রামক মোনোনিউক্লিওসিসের কারণ, তার ফলেও হতে পারে। এটি আবার গ্লানডোলার ফিভার হিসেবেও পরিচিত। ২০০৩ সালে হংকংয়ে শুরু হওয়া অরিজিনাল সার্স ভাইরাসের সংক্রমিতদের এক-চতুর্থাংশের পোস্ট-ভাইরাল ফ্যাটিগ দেখা গেছে।

যখন বিষয়টি হয় দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির চিকিৎসার বিষয়, তখন অন্তর্নিহিত রোগের কার্যকর চিকিৎসার ওপর জোর দেয়া হয় এই বিশ্বাসে যে এটি ক্লান্তি হ্রাস করবে। কিন্তু অনেক ভাইরাল সংক্রমণের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। আর কভিড-১৯ যেহেতু নতুন, আমরা এখনো জানি না কভিড-পরবর্তী ক্লান্তি কীভাবে সামলাতে হয়।

সম্ভাব্য কারণ

যদিও আমরা জানি যে স্থায়ী ক্লান্তি কখনো কখনো অন্যান্য ভাইরাল সংক্রমণকে অনুসরণ করতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিশদ যান্ত্রিক অন্তর্দৃষ্টির অভাব রয়েছে। যা ফুসফুস, মস্তিষ্ক, ফ্যাট কিংবা অন্যান্য টিস্যুতে চলমান ভাইরাল সংক্রমণের একটি প্রক্রিয়া হতে পারে। আরেকটি হতে পারে সংক্রমণের চলে যাওয়ার পর দীর্ঘস্থায়ী ও অনুপযুক্ত ইমিউন রেসপন্স।

পূর্ববর্তী একটি গবেষণা আমাদের কিছুটা অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে। যখন একটি কেমিক্যাল যাকে ইন্টারফেরন-আলফা বলা হয় মানুষকে দেয়া হয়েছে হেপাটাইটিস সি-এর চিকিৎসা হিসেবে। এটি ফ্লুর মতো অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাল-পরবর্তী ক্লান্তিও। গবেষকরা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির মডেল হিসেবে কৃত্রিম সংক্রমণের প্রতিক্রিয়া অধ্যয়ন করেছেন। তারা দেখলেন শরীরের দুটি অণুর বেইসলাইন স্তর প্রদাহকে উৎসাহিত করে, যা মানুষের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির বিকাশকে নির্দেশ করে।

বিশেষ আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে এই একই প্রাক-প্রদাহের অণু কভিড-১৯-এ মারাত্মকভাবে আক্রান্ত রোগীদের ‘সাইটোকিন স্ট্রোমে’ও দেখা যায়। এটা যা বলে তা হলো ভাইরাল সংক্রমণের সময় ইমিউন সিস্টেম সচল হওয়ার একটা প্যাটার্ন থাকতে পারে, যা চলমান লক্ষণগুলোর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।

এরপর কী?

কিংস কলেজ লন্ডনে আমরা যমজদের ওপর একটি গবেষণা চালিয়ে দেখেছি জেনেটিক ও পরিবেশগত ফ্যাক্টরগুলো কীভাবে রোগকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণগুলো পরীক্ষার জন্য আমরা ব্যবহার করেছি কভিড সিম্পটম স্টাডি অ্যাপ। আমরা আমাদের প্রশ্নগুলো স্বেচ্ছাসেবক যমজদের কাছে ডাটাবেসে পাঠিয়ে দিয়েছি। করোনাভাইরাস মহামারীর বহু আগে যারা ইমিউন সিস্টেমের গবেষণায় জড়িত ছিল। যেখানে আমাদের একটি লক্ষ্য ছিল পোস্ট-কভিড সিনড্রোমকে সংজ্ঞায়িত করা।

এই গবেষণা ডিজাইন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল: কারণ কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াগুলো মানুষের সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তাদের অসুস্থতা এমন সময় হচ্ছিল যখন সামাজিক পরিবর্তনগুলো নজিরবিহীন ছিল। যেখানে চলাফেরায় বিধিনিষেধ ছিল, সময়টা ছিল উদ্বিগ্নতার এবং ঝুঁকি নির্ণয় করাও অনেক কঠিন ছিল। কেউ কেউ ঘরেই অনেক বেশি অসুস্থ ছিল এবং তারা মনে করছিল তারা মৃত্যুর খুব কাছাকাছি আছে। এ কারণে আমরা পোস্ট-ট্রমাটিক উদ্বিগ্নতাও পরীক্ষা করব।

দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি একক চিকিৎসার বিশেষত্বের মাঝে পড়ে না। তাই এটিকে মেডিকেলের পাঠ্যক্রমে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। সে সঙ্গে ডাক্তারদেরও এ বিষয়টি নির্ণয় ও চিকিৎসার ব্যাপারে দুর্বলভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময় এটি উন্নতি লাভ করেছে এবং ডাক্তারদের জন্য অনলাইন ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যেখানে গুরুতর লক্ষণগুলোর সঙ্গে এ বিষয়টিতে তারা কীভাবে যত্ন নেবে তাও অন্তর্ভুক্ত।

দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি কীভাবে সামলাতে হবে এবং কীভাবে শক্তি সংরক্ষণ করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা এখন রোগীদের জন্য উপলব্ধ। তবে জিমের সদস্য হওয়া এবং অনুশীলনের জন্য চাপ দেয়া ভুল কাজ। তা বরং ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়াকে পিছিয়ে দিতে পারে। ছোট ছোট মানসিক ও শারীরিক প্রচেষ্টা এবং বিশ্রামের রুটিনই বরং অনুসরণ করা উচিত। যখন সুযোগ হবে কাজে ফিরে যাওয়া উচিত।

স্ক্রলডটইন