কভিড-১৯ মহামারীর ভবিষ্যেক চালিত করার অন্যতম বিষয় হলো ভাইরাসটি কীভাবে বিকশিত হয়। গত সপ্তাহে বিজ্ঞানীরা প্রথম প্রমাণ করেছিলেন, ভাইরাসটি আরো বেশি সংক্রামক হয়ে উঠছে। পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপে স্থানান্তরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ভাইরাসটির মিউটেশন বা রূপান্তর ঘটেছিল। এ আশঙ্কা উত্থাপন করে একটি প্রবন্ধ প্রকাশকারী প্রথম দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির জীববিজ্ঞানী ও এইচআইভি বিবর্তন বিশেষজ্ঞ বেটে করবার। এরপর নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট রাল্ফ ব্যারিক বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন।
গত সপ্তাহে মানব কোষ ও হামস্টারগুলোতে (গিনিপিগ জাতীয় প্রাণী) একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ব্যারিক ও উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউসিহিরো কাওয়াকা সায়েন্স জার্নালে আরো একটি সম্পূর্ণ ঘটনা প্রকাশ করেছিলেন। ভাইরাস এমন জীব বেছে নেয়, যা তাদের বেঁচে থাকা ও পুনরুৎপাদন করার ক্ষেত্রে আরো ভালো। সার্স-কভ-২-এর মতো ভাইরাসের ক্ষেত্রে এটার অর্থ হলো দীর্ঘস্থায়ীভাবে পুনরুৎপাদন করা এবং নতুন হোস্টে চলে যাওয়া।
এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা একটি মাত্র মিউটেশন খুঁজে পেয়েছেন, যা ভাইরাসের বেঁচে থাকার ক্ষমতা দৃঢ় করে। জি৬১৪ স্ট্রেনকে আরো সংক্রামক ও ডি৬১৪-কে বংশানুক্রমিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের ভাইরাস বাস্তবে কম বিবর্তন ক্ষমতাসম্পন্ন হতে পারে, কারণ ভাইরাসগুলোও তার হোস্টের সঙ্গে মারা যায়।
ব্যারিক বলেছেন, আরেকটি সুসংবাদ হলো বর্তমানের প্রভাবশালী জি স্ট্রেনের স্পাইক প্রোটিনগুলোর গঠন ভ্যাকসিনের অ্যান্টিবডির মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন হতে পারে। যদিও ভ্যাকসিনগুলো ডি স্ট্রেনের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া জি স্ট্রেন সম্ভবত পূর্ববর্তী সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট অ্যান্টিবডিগুলোর কাছে আরো ঝুঁকিপূর্ণ।
জি স্ট্রেনের সংক্রমণযোগ্যতা পরীক্ষা করার জন্য তারা অনুশীলিত কোষগুলো দিয়ে শুরু করেছিলেন। এটা নাক থেকে ফুসফুসের গভীরতম অংশগুলোতে কোষের অনুকরণ করে থাকে। তারপর তারা জিনগতভাবে ডি স্ট্রেনকে হেরফের করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে রূপান্তরটি মূল ভাইরাসের চেয়ে সহজেই কোষ থেকে অন্য কোষে ছড়িয়ে পড়তে দেয়। তারা একই ভাইরাস উভয় স্ট্রেনের সঙ্গে একই কোষগুলোকে সংক্রমিত করেছিলেন এবং এ রূপান্তর স্ট্রেনকে বারবার প্রভাবিত করেছিল।
গবেষকরা মনে করেন, কোনো মানব শরীরে রূপান্তরিত হয়ে সেই ব্যক্তির মাধ্যমে ভাইরাসটি আকাশপথ হয়ে অন্য মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। রূপান্তরিত স্ট্রেন আরো সংক্রামক হওয়ার আশঙ্কা পরীক্ষা করার জন্য গবেষকরা পৃথক খাঁচায় আটকানো হ্যামস্টারও ব্যবহার করেছিলেন। তারা দেখতে পেলেন, রূপান্তরিত ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে এক খাঁচা থেকে অন্য খাঁচায় যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
কিন্তু এই জি স্ট্রেন কি ভ্যাকসিনগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে? ব্যারিক বলেন, এটা সম্ভব। প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেলে ভাইরাসটি পরিবর্তনের চাপে থাকবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি লোক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। আর বিবর্তনটি সেই ভাইরাসের পক্ষে যায়, যা অ্যান্টিবডিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো। এটা করার একটি উপায় হলো অন্য প্রজাতিতে ঝাঁপিয়ে পড়া। যেমন ডেনমার্কের মিঙ্কদের মতো। আবার এটি বিশ্বের ১৪০০ প্রজাতির বাদুড়ের একটিতে চলে যেতে পারে। বাদুড় নভেল করোনাভাইরাসের জন্য ভালো হোস্ট এবং এখনো মনে করা হয়, তারাই সম্ভবত সার্স-কভ-২-এর উৎস।
ব্যারিক বলেন, এখানে বিপদ রয়েছে। ভাইরাসটি যদি অ্যান্টিজেনিক স্ট্রাকচার পরিবর্তন করে, তবে আমাদের অ্যান্টিবডিগুলো এটিকে চিনতে পারবে না। অর্থাৎ ভ্যাকসিনগুলো কাজ করবে না। আবার এটিও সম্ভব যে ভাইরাসগুলো অন্য ভাইরাসের মতো সাধারণ একটি সর্দিতে পরিণত হবে।
ব্যারিক বলেন, মনে রাখবেন ভাইরাসটি সত্যিই তাদের হোস্টকে হত্যা করতে চায় না। এটি কেবল প্রতিলিপি ও ছড়িয়ে পড়তে চায়। যদি ভ্যাকসিনগুলো আশানুরূপভাবে কাজ করে, তবে ভাইরাসটির সাধারণ সর্দিতে পরিণত হবে।
ব্লুমবার্গ





