একটা বড় ম্যাচ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। টিকিট আপনার হাতেই আছে। কিন্তু গ্যালারিতে প্রবেশ করতে হলে আপনার একটি ছাড়পত্র লাগবে। যেটি প্রমাণ দেবে আপনি কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন।
এমন ভবিষ্যৎ অনেক গবেষক দেখতে পাচ্ছেন। এমন একটি পৃথিবী যেখানে আপনাকে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখা, কাজে যাওয়া কিংবা ট্রেন ভ্রমণের জন্য প্রমাণ দিতে হবে যে আপনি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়েছেন।
বায়োএথিস্ট আর্থুর কাপলান বলেন, আমরা এমন কোনো পর্যায়ে যাচ্ছি না, যেখানে ভ্যাকসিন পুলিশ আপনার দরজা ভেঙে ফেলবে ভ্যাকসিন দেয়ার জন্য। কিন্তু তিনি এবং আরো অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কল্পনা করছেন ভ্যাকসিন গ্রহণের আদেশ স্থানীয় সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ দ্বারা জারি এবং প্রয়োগ করা হতে পারে। স্কুলগামী শিশু, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং হাসপাতাল কর্মীদের জন্যও বর্তমান ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তা একই রকম।
যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাকসিনবিষয়ক বেশির ভাগ আদেশ আসে সরকারের কাছ থেকে। দ্য অ্যাডভাইজরি কমিটি অন ইমিউনাইজেশন প্র্যাকটিস (এসিআইপি) শিশু এবং বয়স্ক উভয়ের জন্য ভ্যাকসিনের সুপারিশ করেন এবং রাজ্য আইনসভা কিংবা নগর পরিষদ নির্ধারণ করবে আদেশ জারি করার বিষয়টি। এই আদেশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি স্কুলে উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত এবং ৫০টি রাজ্যের সবগুলোর ছাত্রছাত্রীদের ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে, কেবল চিকিৎসা, ধর্মীয় ও দার্শনিক কারণে ছাড় পেতে পারে।
বয়স্কদের জন্য ভ্যাকসিনের আদেশ কর্মচারী ও জনগণকে নিজে নিজে ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে বাধ্য করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজ্য এবং শহরগুলো ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকদের বাধ্য করে এবং বাধ্য করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ১৯০১ সালে ম্যাসাচুসেটসে একটি আইন প্রণয়ন করা হয় যে ২১ বছর এবং তার বেশি বয়সী নাগরিকদের গুটি বসন্তের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন নিতে হবে। যারা নেবে না তাদের ৫ ডলার ফাইন দিতে হবে, যা কিনা বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে ১৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে গুটি বসন্তের সর্বশেষ প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল ১৯৪৯ সালে।
শার্ট, জুতা ও টিকা নেয়া জরুরি
বর্তমানে ইউএস সেনাবাহিনীর সদস্যদের অনেকগুলো রোগ যেমন ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস এ এবং পোলিওর বিরুদ্ধে সুরক্ষার প্রয়োজন হয়। অনেক রাজ্যে হেলথকেয়ারগুলোতে কর্মীদের প্রিটুসিস, জলবসন্ত, হাম, মাম্পস ও রুবেলার বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা প্রয়োজন। কাজের শর্ত হিসেবে হাসপাতাল সিস্টেমে প্রায়ই অতিরিক্ত টিকা দেয়ার দরকার হয়। আইনিভাবে সব নিয়োগকর্তা তাদের কর্মচারীদের ভ্যাকসিন গ্রহণে বাধ্য করতে পারে।
এ আদেশ ক্রেতাদের উদ্দেশেও চালিত হতে পারে। যেভাবে ব্যবসায়ীরা জুতা ছাড়া, শার্ট ছাড়া ক্রেতাদের তাদের রেস্টুরেন্টে, সেলুনে ও দোকানে প্রবেশে বাধা দেয়; তেমনি তারা আইনিভাবে যেকোনো কারণে ক্রেতাদের আটকাতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না বৈষম্যমূলক কোনো আইন পরিচালনা করছে।
অনেক গবেষক বলছেন, যখন কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন উপলব্ধ হবে তখন রাজ্যগুলো শিল্প-কারখানাগুলোকে চালিত করতে পারে কর্মীদের ওপর ভ্যাকসিন আদেশ প্রয়োগ করার জন্য। বিশেষত তাদের ওপর যারা ‘জরুরি কর্মী’
হিসেবে বিবেচিত। বিশেষজ্ঞদের একজন কারমেল শাসার বলেন, মুদি দোকানের শ্রমিকরা অনেক মানুষের সংস্পর্শে আসে। আবার কাজের ধরনের কারণে তাদের প্রচুর মানুষকে সংক্রমিত করার সুযোগ আছে। কারণ সবার খাবার কেনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া যারা রেস্টুরেন্ট, বার ও কফি শপে কাজ করে তাদের জন্যও একই ধরনের আদেশ জারি হতে পারে।
শাসার বলেন, এটা মূলত মালিকদের স্বার্থে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের কর্মক্ষেত্র নিরাপদ এবং আপনি আপনার সহকর্মীদের সংক্রমিত করবেন না। আর ভ্যাকসিন নেয়া কর্মী থাকলে আপনাকে রেস্টুরেন্টে আসা ক্রেতারা কভিড-১৯-এ সংক্রমিত কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
এমনকি সাধারণ মানুষকে ভ্যাকসিন নেয়ার প্রতি উদ্দীপ্ত করা যেতে পারে। কাপলান বলেন, আদেশ বাস্তবায়নের সেরা উপায় হতে পারে মানুষকে আরো অনেক স্বাধীনতা উপহার দেয়া, যদি তারা সেটি অনুসরণ করে। যেমন ভ্যাকসিন গ্রহণের প্রমাণ থাকলে আপনি একটি স্পোর্টিং ইভেন্টে উপস্থিত থাকতে পারবেন, সঠিক কাজ করার উপহারস্বরূপ।
তিনি আরো বলেন, আমি কল্পনা করছি একজন আরেকজনকে বলছে, যদি তুমি আমার রেস্টুরেন্টে কিংবা ট্যাটু পার্লারে আসতে চাও, তবে আমি তোমার ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট দেখতে চাইব।
প্রত্যায়িত টিকা
যদিও এই জাতীয় আদেশ কার্যকর করা কোনো চ্যালেঞ্জ ছাড়া হবে না। উদাহরণস্বরূপ আজকে দুবাই থেকে এমিরেটসের ফ্লাইট ছাড়বে। সব যাত্রীকে কভিড-১৯ টেস্টে নেগেটিভ হওয়ার সার্টিফিকেট দেখাতে হবে। যখন ভ্যাকসিন উপলব্ধ হবে তখন নেগেটিভ সার্টিফিকেটের পরিবর্তে
ভ্যাকসিনেশনের সার্টিফিকেট প্রদর্শন করতে হবে।
স্বাস্থ্য ও ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ ডোরিথ রিস বলেন, ফেডারেল আইনগুলোতে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য কভিড-১৯-এর সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হতে পারে। যা কিনা ভ্যাকসিনেশনের একটি প্রতীক হতে পারে। একইভাবে এটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে কর্মীরা ভ্যাকসিনেশনের চিহ্ন হিসেবে স্টিকার লাগাতে পারে এবং ডাক্তারের কাছ থেকে পাওয়া ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট পাবলিক ইভেন্টে উপস্থিত হওয়ার প্রমাণপত্র হিসেবে কাজ করবে।
গ্রসম্যান বলেন, সম্ভবত আমরা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছে যাব যেখানে আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়ার জন্য ইমিউনিটির চিহ্ন বহন করতে হবে।
এখন ১৫০-এর বেশি ভ্যাকসিন বিকাশমান পর্যায়ে আছে। বিভিন্ন
ভ্যাকসিনের দামও সামনে আসতে শুরু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি ডোজ সর্বোচ্চ ৩৭ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ফ্লু শটের জন্যও এ রকম দাম লাগে। এখন যেসব নিয়োগকর্তা ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক করবে তারা চাইলে খরচের দিক থেকে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, যেসব মানুষের ইন্স্যুরেন্স নেই কিংবা যাদের আয় কম কিংবা যারা বেকার ফেডারেল সরকার চাইলে তাদের জন্য ভ্যাকসিনের শট ফ্রি করে দিতে পারে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক





