মহামারীকালে জরুরি বিভাগে মানসিক সমস্যা নিয়ে শিশুদের চিকিৎসা নিতে আসার হার বেড়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। যা করোনাকালে লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের কারণে শিশুদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

লকডাউনের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে শিশুরা স্কুল থেকে দূরে বাসায় বসে শিক্ষা গ্রহণ করছে। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সিডিসি জানাচ্ছে, মার্চ-অক্টোবর পর্যন্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মানসিক সমস্যা নিয়ে ১২-১৭ বছর বয়সীদের জরুরি চিকিৎসা নিতে আসার হার বেড়েছে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত। ৫-১১ বছর বয়স পর্যন্ত সেটি বেড়েছে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কভিড-১৯-এ যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের মধ্যে পাঁচজনের একজনের মানসিক সমস্যা যেমন উদ্বেগ, বিষণ্নতা কিংবা অনিদ্রার সমস্যা দেখা গেছে। এটি দেখা গেছে, ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে। গবেষণায় অংশ নেয়া গবেষকদের পক্ষ থেকে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতি প্রশমনে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদও দেয়া হয়েছে।

এ গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড ও এনআইএইচআর অক্সফোর্ড হেলথ বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের গবেষকরা। গবেষকদের মতে, যাদের আগে থেকে মানসিক সমস্যা বিদ্যমান ছিল তাদের ক্ষেত্রে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৬৫ শতাংশ বেশি। এ গবেষণায় জড়িতদের একজন ড. ম্যাক্স টাকুয়েট বলেন, এ অনুসন্ধান অপ্রত্যাশিত এবং এর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি একই সময়ে মানসিক সমস্যাকে কভিড-১৯-এর ঝুঁকির তালিকায় যুক্ত করা উচিত।

এ হিসাবটি গবেষকরা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ মিলিয়নের মতো স্বাস্থ্য তথ্যের ভিত্তিতে। যেখানে ৬২ হাজারের বেশি কভিড-১৯ কেস অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাদের হাসপাতালে ভর্তির কিংবা জরুরি বিভাগে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। দেখা গেছে, ১৮.১ শতাংশ ক্ষেত্রে কভিড-১৯ নির্ণয়ের ১৪ থেকে ৯০ দিন পর যেকোনো ধরনের মানসিক রোগ ধরা পড়েছিল। যেখানে ৫.৮ শতাংশের এ সমস্যা ধরা পড়েছে প্রথমবারের মতো।

অতিরিক্ত ঝুঁকি সরাসরি কভিড-১৯-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কিনা তা পরীক্ষা করতে গবেষকরা এ ডাটা একই সময়ে আরো ছয়টি পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন: ইনফ্লুয়েঞ্জা, শ্বাসযন্ত্রের অন্যান্য সংক্রমণ, ত্বকে সংক্রমণ, গালস্টোন, মূত্রথলিতে পাথর ও বড় ধরনের হাড় ভাঙা। দেখা গেছে, কভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমবারের মানসিক সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে ৫.৮ শতাংশ রোগীর, যেখানে অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সেই হারটি ছিল ২.৫-৩.৪ শতাংশ। অর্থাৎ কভিডে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের মনোরোগ বিভাগের প্রফেসর পল হ্যারিসন বলেন, আমাদের আরো গবেষণা প্রয়োজন মানসিক সমস্যা সরাসরি করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুক্ত কিনা তা জানার জন্য। স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এমন অন্য কারণগুলো বিশ্লেষণ করা রেকর্ডে ধরা হয়নি। যেমন আর্থসামাজিক অবস্থা, ধূমপান কিংবা অন্য যেকোনো মাদক গ্রহণ। এছাড়া মহামারীজনিত সাধারণ উদ্বেগেরও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।

গবেষণা বলছে, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র আর্থসামাজিক অবস্থান থেকে যারা উঠে এসেছে তাদের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এছাড়া এক জায়গায় অনেক লোকের বাস এবং অনিরাপদ পরিস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। হ্যারিসন বলেন, একইভাবে এটা মোটেই অগ্রহণযোগ্য নয় যে কভিড-১৯ হয়তো সরাসরি আমাদের মস্তিষ্ককে এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে আঘাত করছে। এখন তিন মাসের মধ্যে চিহ্নিত হওয়া এ মানসিক সমস্যাগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য বজায় থাকবে, নাকি সেরে যাবে তা সময়েই বলে দেবে। তবে এ গবেষণা কভিড-১৯ রোগীদের মানসিক ঝুঁকির বিষয়টিকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে দেখার ওপর জোর দিচ্ছে।

দ্য গার্ডিয়ান