ছয় দশক আগের কথা। ১৯৬৪ সালে জুন আলমেডা তার ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে তাকিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁটা দ্বারা আচ্ছাদিত একটি গোলাকার ধূসর বিন্দু দেখতে পেলেন। তখন তিনি ও তার সহকর্মীরা চিহ্নিত করেন, ভাইরাসের চারপাশে কাঁটার মতো একটি চক্র তৈরি করেছে, যা অনেকটা সূর্যের চারপাশের আলোর বিচ্ছুরণের মতো। 

তখন পর্যন্ত কেউ জানত না যে এটাই অর্ধশত বছর পর করোনাভাইরাস হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠবে। আর এটি শনাক্তকরণে জুন আলমেডা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ কীর্তিটি আরো চমকপ্রদ যে ৩৪ বছর বয়সী এ বিজ্ঞানী কখনো তার আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করেননি।

জন্ম থেকেই জুন হার্ট স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে তার পরিবারের সঙ্গে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। সেখানে তার বাবা বাসচালকের কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকেই জুন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু অর্থাভাবে ১৬ বছর বয়সেই তিনি স্কুল ছেড়ে গ্লাসগো রয়্যাল ইনফার্মারিতে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে টিস্যুর নমুনা বিশ্লেষণে সহায়তা করতেন। 

লন্ডনের সেন্ট বার্থোলোমিউর হাসপাতালে অনুরূপ চাকরিতে যোগদানের পর তার ভেনিজুয়েলার শিল্পী এনরিক্স আলমেডার সঙ্গে পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে তারা বিয়ে করে কানাডায় পাড়ি জমান। জুন আলমেডা টরেন্টোর অন্টারিও ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ নিয়ে কাজ পেয়েছিলেন। সেখানে তিনি ভাইরাসের কাঠামো বর্ণনার নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেন এবং বেশ কয়েকটি পেপারস প্রকাশ করেন। আলমেডার এ মাইক্রোস্কোপ কৌশল সাধারণ হলেও ভাইরাসবিদ্যার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ছিল।

তার দক্ষতা স্বীকৃতি পাওয়ার পর আলমেডা সেন্ট থমাস হসপিটাল মেডিকেল স্কুলে যোগদানের জন্য লন্ডনে ফিরে আসেন। সেখানে ১৯৬৪ সালে তিনি সলসবারির কমন কোল্ড ইউনিটে গবেষণার তদারকি করা ডা. ডেভিড টাইরেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। টাইরেলের দল সেরির একজন অসুস্থ স্কুলছাত্রের ‘বি৮১৪’ লেবেলযুক্ত ফ্লুর মতো ভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ল্যাবে তারা ভাইরাসটিকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হন। প্রথাগত পদ্ধতিগুলো ব্যর্থ হওয়ায় গবেষকরা সন্দেহ করতে শুরু করেন ‘বি৮১৪’ সম্পূর্ণ নতুন একটি ভাইরাস হতে পারে। 

এরপর টাইরেল আলমেডার কাছে নমুনা প্রেরণ করেছিলেন এ আশায় যে তার মাইক্রোস্কোপ কৌশল ভাইরাসটি শনাক্ত করতে পারে। এ বিষয়ে টাইরেল তার ‘কোল্ড ওয়ার্স : দ্য ফাইট এগেইন্সট দ্য কমন কোল্ড’ বইয়ে লিখেছেন, ‘আমরা খুব আশাবাদী ছিলাম না, তবে একবার চেষ্টা করে দেখাই যাক না।’ 

যদিও টাইরেলের সঙ্গে কাজ করার জন্য আলমেডার সীমিত উপকরণ ছিল, তবুও তার অনুসন্ধানগুলো টাইরেলের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। আলমেডা ভাইরাসটির স্পষ্ট চিত্র খুঁজে পেয়েছিলেন ও তৈরি করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি তার গবেষণার আগে দুটি অনুরূপ ভাইরাস দেখে মনে রেখেছিলেন, একটি মুরগিতে ব্রঙ্কাইটিস দেখার সময় এবং দ্বিতীয়টি ইঁদুরের হেপাটাইটিস লিভারের প্রদাহ অধ্যয়নের সময়। তিনি দুই বিষয়েই গবেষণাপত্র লিখেছিলেন, কিন্তু সেগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। পর্যালোচকদের ধারণা ছিল, ছবিগুলো কেবল ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস কণার নিম্নমানের ছবি মাত্র। তবে টাইরেলের নমুনার বিষয়ে আলমেডা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে এটা ভাইরাসের একটা নতুন গ্রুপ। 

আলমেডা, টাইরেল ও আলমেডার তত্ত্বাবধায়ক যখন তাদের অনুসন্ধানগুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য জড়ো হলেন, তারা চিহ্নিত ছিলেন যে ভাইরাসের নতুন এ গোষ্ঠীকে কী নামে ডাকা যায়। চিত্রগুলো দেখার পর তারা ভাইরাসের হলোর মতো কাঠামো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ল্যাটিন শব্দ ক্রাউন, করোনা নামে ডাকার। এর মধ্য দিয়ে জন্ম হলো করোনাভাইরাসের।

জুন আলমেডার সঙ্গে কাজ করা স্কটল্যান্ডের আবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাকটেরিওলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক হিউ পেনিংটন বলেন, নিঃসন্দেহে তিনি তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা স্কটিশ বিজ্ঞানী। তবে দুঃখের বিষয় সবাই তাকে ভুলে গেছেন। 

আজ গবেষকরা এখনো ভাইরাসের দ্রুত ও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে তার কৌশলগুলো ব্যবহার করছেন।