বিশ্বের অনেক অঞ্চলে মহামারীর নতুন ওয়েব দেখা গেলেও চেন্নাইসহ অনেক জায়গায় মৃত্যুর হার হ্রাস পেতেও দেখা গেছে। চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো মেইন হসপিটালের আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ভারত কুমার থিরোপাকুজি ভিজেয়ারাগাভান বলেন, অক্টোবরের মাঝামাঝিতে সংক্রমণের হার হ্রাস পেলেও উদ্বিগ্ন ছিলাম আসন্ন উৎসবের মৌসুম নিয়ে। যেটি শুরু হয়েছিল ২০ অক্টোবর। ওই সময় এমনকি মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছিল। তার মতে, সবাই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং এটা কখনো শেষ না হওয়া এক স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু একটি আশার কথাও তিনি জানান, আইসিইউতে মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে। এপ্রিলে যারা আইসিইউতে ছিলেন তাদের ৩৫ শতাংশের বেশি মারা গেছে এবং ভেন্টিলেটরে থাকাদের ৭০ শতাংশই মৃত্যুবরণ করেছিল। তবে এখন এসে আইসিইউতে মৃত্যুর হার নেমে এসেছে ৩০ শতাংশে এবং যারা ভেন্টিলেটরে আছে তাদের মৃত্যুহার নেমেছে ৪৫-৫০ শতাংশে। তার মতে, এটা অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতো ছিল।
কেবল নির্দিষ্ট একটি শহরেই নয়, বিশ্বের নানা জায়গায় একই ধরনের গল্পের দেখা মিলেছে। ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের ইনটেনসিভ কেয়ার ফিজিশিয়ান শার্লোট সামার বলেন, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) কর্তৃক যে ডাটা সংগ্রহ করা হয়েছে তাতে মৃত্যুর হারের হ্রাস দেখা গেছে। ইউনিভার্সিটি অব পিটাসবার্গের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ফিজিশিয়ান ডেরেক আনগুস বলেন, তার হাসপাতালেও সময়ের সঙ্গে মৃত্যুহারের হ্রাস দেখা গেছে। তিনি বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই আমরা মৃত্যুহারের পতন দেখেছি। সবকিছু আগের মতো আছে, তবে রোগীদের জীবন নিয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা বেড়ে গিয়েছে।
তবে এর কারণ পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এখানে কোনো অলৌকিক ওষুধ নেই, নতুন কোনো প্রযুক্তি আসেনি এবং চিকিৎসার কৌশলেও বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে এটাও ঠিক যে অনেক হাসপাতালে চিকিৎসকরাও কভিড-১৯-এর চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে ক্রমশ ভালো পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন। যদিও এখনো আশঙ্কা আছে, এ অর্জন বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এর সংক্রমণ ফের বাড়ার সঙ্গে মুছে যাওয়ার।
ভিজেয়ারাগাভান তার প্রতিষ্ঠানে মৃত্যুহারের এ হ্রাসের জন্য পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেন। যেখানে স্টেরয়েডের ব্যবহার সম্পর্কে ভালো বোঝাপড়া ও অপ্রমাণিত ওষুধের ব্যবহার এবং প্রক্রিয়া থেকে সরে আসাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের ইনটেনসিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ মাকুস শুলজ একমত পোষণ করে বলেছেন, কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতির কোনটি মানসম্পন্ন চিকিৎসা তা বুঝতে সময় লেগেছে। তিনি বলেন, মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আমি মনে করি আমরা গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছি। সবকিছু আবার করা হয়েছে এবং সবকিছু একই ধরনের ফল নিয়ে এসেছে।
এদিকে কভিড-১৯-এর মৃত্যুহার সত্যি হ্রাস পাচ্ছে কিনা, তা জানার জন্য গবেষকরা সংগ্রাম করছেন। এ হিসাবনিকাশ বেশ জটিলও হতে পারে। সংক্রমণে মৃত্যুহার নির্ভর করে টেস্টিংয়ের ওপর, অনেক দেশ কেবল গুরুতর লক্ষণ আছে এমন রোগীদের টেস্ট করে। কিন্তু অসংক্রামকদের মাঝে কেউ মারা যাচ্ছে কিনা তা জানার উপায় হচ্ছে বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা করে দেখা। যদি সময়ের সঙ্গে এখানে ভর্তি হওয়ার ডেমোগ্রাফিকস বদলে যায়, তবে আইসিইউতে মৃত্যুহার বিভ্রান্ত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ অনেক হাসপাতাল জানিয়েছে, মহামারী এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে আইসিইউতে তরুণদের ভর্তির উচ্চতর হার লক্ষ করা গেছে।
এপিডেমিওলজিস্ট আলী মোকদাদ বলেন, এ পার্থক্যগুলো বিশ্লেষণের জন্য অনেক দেশে প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন ছিল এবং এটি হতাশ করেছে ডার্টমাউথ কলেজের অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু লেভিনকেও। তিনি বলেন, আমাদের কাছে এখনো সেই ডাটা নেই যা বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য কর্তাদের থাকা উচিত। এর ফলে মৃত্যুহার আসলেই কমেছে কিনা তা নির্ধারণে গবেষকরা কিছুটা সময় নিয়েছেন, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের জন্য। মোকদাদ ও তার সহকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে কেন্দ্রে রেখে বৈশ্বিক ডাটা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন। আমেরিকান হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাথাপিছু সংক্রমণে মৃত্যুহার ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
আইসিইউ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসার উন্নতি হয়েছে কিন্তু সব সময় তা নির্ণয় করা সহজ না। ভিজেয়ারাগাভান ও অন্যরা অবশ্য মানসিকতার পরিবর্তনকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। মহামারীর শুরুর দিকে কভিড-১৯কে ভীতিকর ও আতঙ্কজনক কিছু হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ফলে রোগীদের বাঁচানোর জন্য অপ্রমাণিত অনেক হস্তক্ষেপের মূল্যও দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ রোগ কতটা ভিন্ন কিংবা নতুন তা নিয়ে কোলাহলের কারণে প্রাথমিক অনেক আখ্যান জটিল হয়ে উঠেছিল। এ বিচ্যুতিও অনেক ক্ষতির কারণ হয়েছে।
সামার আঙুল তুলেছেন ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনকে ঘিরে হওয়া হট্টগোলের দিকেও। শুরুতে অনেকে এটিকে কভিড-১৯-এর চিকিৎসার জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। শক্তিশালী কোনো প্রমাণ না থাকার পরও অনেক রাজনীতিবিদও এটার ব্যবহার নিয়ে কথা বলেন। অথচ জুনে বড় আকারের একটি গবেষণা শেষে জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কভিড-১৯-এর রোগীদের এটি কোনো সাহায্য করতে পারে না। উল্টো সেই গবেষণা বলে, এর কারণে কোনো কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে অনেকের হূদযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষত অ্যান্টিবায়োটিক অ্যাজিথ্রোমাইসিনের সঙ্গে মিলিত হয়ে এটি অধিকতর বিপদ ডেকে এনেছে।
ইনটেনসিভ কেয়ার ফিজিশিয়ানরা সাইটোকিন নামক প্রোটিনের বর্ধিত উৎপাদনের দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা কোনো কোনো গুরুতর কভিড-১৯-এর রোগীর ইমিউন প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাটি মূলত সাইটোকিন স্ট্রোম নামে পরিচিত। এটি ইমিউন প্রতিক্রিয়াগুলোকে চালিত করার ব্যাপারে নির্দিষ্ট প্রতিষেধকের শক্তিকে কমিয়ে দেয়। ভিজেয়ারাগাভান বলেন, ভারতের অনেক কভিড-১৯-এর চিকিৎসক উৎসাহিত হয়েছেন টোসিলিজুমাভ দ্বারা চিকিৎসা করার জন্য। এটি এক ধরনের অ্যান্টিবডি, যা সাইটোকিন ইন্টেরলেউকিন-৬কে অবরুদ্ধ করে। কিন্তু তার মতে, এ চিকিৎসা হয়তো রোগীদের অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ রকম আরো বেশকিছু অপ্রমাণিত বা স্বল্প প্রমাণিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোও শুরুর দিকে অনেকের মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো কোনো ইনটেনসিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ উচ্চতর কার্যকর কোনো ওষুধের সন্ধান পাওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান, যা কিনা ‘ম্যাজিক বুলেট’
হিসেবে কাজ করবে। সুলজ বলেন, ভ্যাকসিন আসার আগ পর্যন্ত আমি মনে করি ফলাফলের পার্থক্যগুলো পরিচালিত হবে অক্সিজেন সরবরাহ বা রোগীদের গ্যাস এক্সচেঞ্জে সহায়তা করার মাধ্যমে। পাশাপাশি আইসিইউতে শেষ পর্যন্ত ১০-২০ শতাংশ মৃত্যুহার হ্রাস বড় সাফল্য বলে মনে করছেন লেভিনের মতো বিশেষজ্ঞরা। তার পরও বয়স্কদের মধ্যে এ হার এখনো বেশ উল্লেখযোগ্য। যে কারণে তিনি বলেন, ৭০ ও ৮০ বছর বয়সী মানুষদের সংক্রমিত হওয়া থেকে বাঁচাতে হবে।
নেচার জার্নাল





