বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব সোমবার বলেছেন, সংস্থাটির মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বড় সংকট করোনাভাইরাস। যেখানে আক্রান্ত দেশগুলো এর আগে মহামারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছিল, সেখানে এখন সংক্রমণের সংখ্যা ঊর্ধ্বগামী। এশিয়া মহাদেশে মূলত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রথম ধাক্কা হানে করোনাভাইরাস, সেই দেশগুলোই আবার প্রথম এটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। কিন্তু দেশগুলোতে এখন আবার নতুন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে বলেও মনে হচ্ছে। মহামারীর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আগে যে সরকারগুলো প্রশংসিত হয়েছিল তাদের এখন আবার ভাইরাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে দেখা যাচ্ছে।
এসব উদ্বেগজনক সংবাদ তাদের জন্য, যেখানে ভাইরাসের প্রথম ধাক্কা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের বিপর্যস্ত অঞ্চলগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। এটি বিশেষত ভীতিজনক কারণ উত্তর গোলার্ধের কিছু অংশে গ্রীষ্মের মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি আছে এবং অনেক এপিডেমিওলজিস্ট শীতে আবারো ভাইরাসের আক্রমণ শীর্ষে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন।
এশিয়া প্যাসিফিকে অবস্থার অবনতি
মঙ্গলবার মার্চের প্রথম দিককার সময়ের পর পরপর দুদিন স্থানীয়ভাবে সর্বোচ্চ সংক্রমণের কথা জানায় চীন। সবচেয়ে বেশি, ৬৪টি নতুন সংক্রমণ ছিল জিনজিয়াংয়ের। প্রায় পাঁচ মাস নতুন কোনো সংক্রমণ না থাকার পর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজধানী উরুমকিতে নতুন করে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। হংকংয়ের দক্ষিণে আধাস্বায়ত্তশসিত চীনা শহরটিও নতুন করে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে। যেখানে গত দুই সপ্তাহে হাজারের বেশি নতুন সংক্রমণ দেখা গেছে। এছাড়া সেখানে পরপর ছয় দিন একশর বেশি সংক্রমণ দেখা গেছে। নতুন এই ঢেউ এসেছে শহরটি যখন প্রায় করোনাভাইরাসমুক্ত বলে মনে হচ্ছিল তখন।
সোমবার সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও জাপানের সংক্রমণে নতুন করে উত্থান দেখা যাচ্ছে। নতুন প্রাদুর্ভাবে সংক্রমণের কেন্দ্রে আছে রাজধানী টোকিও, যেখানে সোমবার পর্যন্ত পরপর ছয়দিন দুই শতাধিক নতুন কেসের দেখা মিলেছে। সোমবার সেখানে ১৩১টি নতুন কেস পাওয়া যায়। এই হ্রাসের কারণ হতে পারে ঘরোয়া পর্যটনকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে চারদিনের ছুটির সপ্তাহান্তে টেস্ট কম করা।
এশিয়া প্যাসিফিকের অন্য জায়গা যেমন অস্ট্রেলিয়াও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী সংখ্যা দেখছে। জুনে দেশটিতে মুষ্টিমেয় সংখ্যক আক্রান্ত ছিল। কিন্তু মাসের শেষ দিকে তা বাড়তে শুরু করে এবং জুলাইয়ে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। যেখানে সবচেয়ে বাজেভাবে আক্রান্ত এলাকা ছিল ভিক্টোরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল, সোমবার সেখানে আরো ৩৮৪টি কেসের কথা জানানো হয়। ভিক্টোরিয়ায় সক্রিয় কেসের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৭৫টি, যার মাঝে ৪১৪ জনই স্বাস্থ্যকর্মী। ফলে অসুস্থদের চিকিৎসার বিষয়টিও বেশ চাপে পড়েছে।
কী ঘটেছিল?
হংকং, অস্ট্রেলিয়া, চীন এবং অন্য দেশগুলোতে সাম্প্রতিক এ ঝড় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর জন্য কিছুটা বিস্মিত হওয়ার মতো ছিল।
সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়ার বিভিন্ন ত্রুটি চিহ্নিত করা হলেও খুব সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত সংক্রমণের এ রকম বিস্ফোরণ দেখা যায়নি। খুব সম্ভবত ভাইরাসটি আরো মারাত্মক স্ট্রেইন নিয়ে হাজির হয়েছে; সে কেসগুলো চিহ্নিত না হয়েই ছড়িয়ে পড়েছিল এবং আকস্মিকভাবে বড় কেসে পরিবর্তিত হয়ে সামনে আসে।
হংকং ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বেন কাউলিং এ সপ্তাহে লিখেন, আমরা হয়তো কখনো জানি না শহরের সর্বশেষ সংক্রমণ কীভাবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু ডাটা বলছে সংক্রমণ বাইরে থেকে আমদানি হয়ে এসেছে।
তিনি আরো বলেন, যখন এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা হয়, এটি সত্যিকার অর্থেই জোর দেয় কার্যকর টেস্ট এবং কোয়ারেন্টিনের মাধ্যমে হংকংয়ে আসা ব্যক্তিদের সংক্রমণের বাইরে রাখার ওপর। যখন একটি মহামারী শুরু হয়, এটি তখন থামাতে অনেক প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়।
সোমবার হংকংয়ের উপনেতা ম্যাথিউ চিউং বলেন, তারা এখন ‘শিথিল এবং দমন’
পদ্ধতি অনুসরণ করবেন। কেস কমতে থাকলে বিধিনিষেধগুলো শিথিল করা হবে এবং যদি কেস বাড়ে তবে সেগুলো আবার দ্রুত ফিরিয়ে আনা হবে।
এই সপ্তাহে হংকং সরকার ঘোষণা করেছে, জনসম্মুখে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এটি অবশ্য হংকংয়ের প্রায় সবাই এরই মধ্যে মানতে শুরু করেছে। এছাড়া জনসমাগমকে দুজনে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। এদিকে হংকং এয়ারপোর্টের কাছে উহানের মতো করে অস্থায়ী হাসপাতাল বানানোর জন্য সহায়তা করছে চীন সরকার। যেখানে প্রায় দুই হাজারের মতো ধারণক্ষমতা রয়েছে।
চিউং বলেন, মহামারীর অবস্থা জটিল। আগামী কয়েক সপ্তাহ শহরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কমিউনিটি প্রাদুর্ভাবের উচ্চঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছি। নগর কর্তৃপক্ষ এখন সর্বশেষ ঝড় সামাল দেয়ার ব্যাপারে সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ভ্রমণকারী এবং এয়ারলাইনস ক্রুদের প্রচুর পরিমাণে ছাড়পত্র দেয়ার কারণে। যাকে অনেকে নতুন করে শহরে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার কারণ বলেও মনে করছেন। যদিও সরকার এ নীতির সমর্থনে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও এখন পর্যন্ত সংক্রমণ কোথায় শুরু হয়েছে তা বের করতে পারেনি।
অস্ট্রেলিয়ার বিষয়টি অবশ্য ভিন্ন, ভিক্টোরিয়া কঠোর লকডাউনে গিয়েছে। কিন্তু তার পরও সংক্রমণের সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, লকডাউন কাজ করছে এবং যে বাড়তি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে তা আগেই ঘটেছিল, এখন কেবল চিহ্নিত হচ্ছে।
এ অঞ্চলে ভাইরাস দমনে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ভিয়েতনাম। যেখানে তিনজন ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর দেশটির সরকার সোমবার ডানাং শহর থেকে ৮০ হাজার পর্যটককে সরিয়েছে। এখন পর্যন্ত করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল উদাহরণ এ ভিয়েতনাম।
সামনে কঠিন দায়িত্ব
এশিয়া প্যাসিফিকের দেশগুলো, যারা বিশ্বের মাঝে করোনা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি সক্ষমতা দেখিয়েছে তাদের সামনেও ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
এমনকি নতুন করে উত্থানের পর অস্ট্রেলিয়া, হংকং ও জাপানের সংক্রমণের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের কাছাকাছিও আসে না। শেষের দেশ দুটি এখনো প্রথম ঝড় সামলে উঠতে পারেনি এবং সম্মিলিত জাতীয় কার্যক্রমও এখনো গ্রহণ করতে পারেনি, যা বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করে আসছে। এদিকে উত্তর গোলার্ধে শীত আসছে। বিজ্ঞানীরা দেশগুলোকে প্রস্তুত হতে বলছেন সংক্রমণের সম্ভাব্য উল্লম্ফনের ব্যাপারে। ঠান্ডা আবহাওয়া পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলতে পারে। তবে আশা জাগাচ্ছে আবিষ্কারের পথে থাকা করোনাভাইরাসের এক ডজন ভ্যাকসিন। যা কিনা শেষ পর্যন্ত মহামারীর ইতি ঘটাতে পারে।
সিএনএন





