সাম্প্রতিক সময়ে ‘প্ল্যানডেমিক’ নামে একটি ভিডিও কল ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পলিটফ্যাক্ট নামে একটি ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট এটাকে চিহ্নিত করে কভিড-১৯-এর মহামারী সম্পর্কিত ভুয়া কিংবা বিভ্রান্তিকর আটটি দাবি সামনে আনার কারণে। ইউটিউব ও ফেসবুক ভিডিওটি ডিলিট করে দেয়। টুইটার জানায়, এই ভিডিওটি অনিরাপদ এবং প্রাসঙ্গিক হ্যাশট্যাগগুলোও ব্লক করে দেয়।
সব ধরনের প্ল্যাটফর্ম নিজেদের সম্প্রদায়গত মান লঙ্ঘিত হওয়ার নিরিখে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং উদ্বেগ প্রকাশ করে যে এই ভিডিওটি নিশ্চিতভাবে সমাজের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
এ ধরনের দ্রুত ও কঠোর সিদ্ধান্ত কেবল ইন্টারনেটে ঘুরতে থাকা এসব ঘটনাকেই সামনে আনে না, প্রকৃতপক্ষে ট্রেন্ডিং এবং শেয়ারিংয়ের এ ঘটনা সহজেই প্রমাণ করে মানুষ এসব মনে রাখে এবং বিশ্বাস করে। করে না?
কভিড-১৯ সম্পর্কিত ভুল তথ্যের বিস্তৃতি ও প্রভাব বুঝতে মিডিয়ায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরিতে করা ভুয়া দাবির ওপর ভিত্তি করে জরিপ চালানো হয়। যেখানে রোগের চিকিৎসা সম্পর্কিত শিরোনাম, ভাইরাসের উত্পত্তি এবং এর বিপরীতে সরকারের প্রতিক্রিয়া যুক্ত রয়েছে।
প্রথম গবেষণায় আমরা আমেরিকানদের সামনে কভিড-১৯ নিয়ে একটি বিশেষ ভুয়া সংবাদের নমুনা রেখে জিজ্ঞেস করেছি তারা সেটি মনে করতে পারে কিনা। জবাবে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জানায় তারা এমন কিছু পড়েছে। তবে সেখানে সন্দেহ পোষণ করার কারণ ছিল। এক-চতুর্থাংশ লোক দাবি করে তারা এমন কিছু সংবাদ শিরোনাম দেখেছে, যা আমরা আবিষ্কার করেছি এবং যা কিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আকারে দেখা যায়নি। এ থেকে বোঝা যায় যে ভুয়া তথ্য সত্যিকার অর্থে স্মরণে থাকে কম। ১০ শতাংশেরও কম।
এই পরিসংখ্যানটি সম্ভবত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত ভুয়া সংবাদের বিস্তারকে আশ্চর্যজনকভাবে পরিমিত দেখায়। তবে এটি ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে যে রাজনৈতিক ভুয়া তথ্য দেখানো হয়েছিল তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ভুল তথ্যের বিস্তারকে কেন্দ্র করে আমেরিকানরা সত্য যাচাই করতে আগ্রহী কিনা, সেটিও আমরা দেখতে চেয়েছিলাম। গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উত্তরদাতা ভুয়া সংবাদকে সত্য বলে রায় দেয়। সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন কভিড-১৯-এর যে ভুয়া চিকিৎসা তাতে বিশ্বাস করছে।
আমাদের দ্বিতীয় জরিপ ছিল এটা খতিয়ে দেখা যে ভুয়া সংবাদ যদি সংশোধন করা হয়, তবে তা কাজ করে কিনা। আমরা দেখেছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কভিড-১৯ সংক্রান্ত ভুয়া তথ্যগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখে সেগুলো মুছে ফেলে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপত্তিজনক তথ্য শুধরে দিয়েছে।
প্রমাণ বলছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধরে দেয়ার ফলে হিতে বিপরীত হয়েছে। ভুয়া সংবাদের তকমা লাগার পর সংবাদগুলো নিয়ে মানুষের আগ্রহ আরো বেড়ে যাচ্ছে এবং আরো অনেক জনপ্রিয় ভুল ধারণাকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। এদিকে ফেসবুক নিয়মিতভাবে ভুয়া সংবাদের বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয়ার যে পদ্ধতি তা উন্নত করার চেষ্টা করছে। কারণ তারা দেখেছে এটি আরো বেশি মানুষকে ভুয়া সংবাদে যুক্ত করা এবং সে সংবাদে বিশ্বাস করার দিকে চালিত করছে। ‘প্ল্যানডেমিক’কে নিচে নামানোর চেষ্টাকে উদাহরণ হিসেবে নেয়া যেতে পারে। ফলে এর প্রভাব বেড়েছে এবং এটি ভাইরাল হয়েছে।
আমরা খুবই কম প্রমাণ পেয়েছি যে নকল শিরোনামগুলোকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে নিয়মিত উল্টো প্রভাব বয়ে আনতে পারে। তবে তাদের কার্যকারিতা ব্যাপকভাবে পরিবর্তনশীল। একটি কার্যকর সংশোধনের কথা বলা যায়। যেখানে একটি শিরোনাম ভুলভাবে দাবি করে যে শিল্পায়িত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা এই ভুল দাবির ওপর বিশ্বাস রেখেছে।
ভুল তথ্যের মাত্রা ও ব্যাপ্তি যেমন উদ্বেগজনক ছিল, তেমনি উভয় জরিপে এমন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ছিল যারা সত্য বিষয়বস্তুতে বিশ্বাস করে না। যারা উত্তর দিয়েছে, তাদের কাছে ভাইরাসের সঠিক চিকিৎসার তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল না। ৬০ শতাংশের মতো মানুষ সত্য তথ্যকে হয় মিথ্যা বলেছে অথবা তারা বলে যে তারা নিশ্চিত নয়।
মিথ্যা তথ্যে বিশ্বাস এবং সঠিক তথ্যে অবিশ্বাস—দুটোই গণতন্ত্রের জন্য সমস্যার। কিন্তু তা আলাদা আলাদা কারণে। এমনকি মানুষের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশও যদি ভুল খবরে বিশ্বাস করে, এর পরিণতি ক্ষতিকারক হতে পারে। ভুয়া খবরের ক্ষতিকারক হওয়ার জন্য তার সঙ্গে অনেক মানুষের যুক্ত না থাকলেও চলে।
সঠিক তথ্য গ্রহণে বৃহৎ অংশের মানুষের ব্যর্থতা সম্ভবত আরো বেশি সমস্যাপূর্ণ। এখন কোন চিকিৎসা কাজ করবে এবং কোনটি করবে না তা অনেকটা জীবন-মরণ সমস্যার মতো। কিন্তু মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য দাবির মাঝে আমেরিকানরা সঠিক সংকেতটি আবিষ্কার করতে অক্ষম।
এখন নীতিগতভাবে মহামারীর বিরুদ্ধে সাড়া দেয়ার জন্য প্রয়োজন সরকারি পদক্ষেপে জনগণের সমর্থনকে চালিত করা। এটি বহুলাংশে নির্ভর করে আমেরিকানদের রূপকথা থেকে সত্যকে আলাদা করার ক্ষমতার ওপর।
জালিয়াতির প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সত্যের প্রতি অবিশ্বাস যৌথভাবে একটি প্রশ্নের উত্থাপন করে। কেন আমেরিকানরা বিচক্ষণ নয়?
আমাদের হাতে থাকা প্রমাণ এমন জনসাধারণকে ইঙ্গিত করে, যারা অনেক বেশি পোলারাইজড, আদর্শিকভাবে অপরিবর্তনশীল এবং সঠিক বিষয়ের ওপর বিশ্বাসের ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রদর্শন করে। বিস্ময়করভাবে আমরা দেখেছি যে কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংবাদই বেশি গ্রহণ করে। আসল ও নকল খবরের মাঝে পার্থক্য তৈরি করতেও তারা অক্ষম। তারা কোনো কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে চায় না। তারা বরং বেশি বিনোদিত এবং সত্যের দিকে কম আকর্ষিত হতে পছন্দ করে। তবে এটাও বলতে হয় যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে এবং মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান





