উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণগুলোর বোঝার নিচে চাপা পড়ে আছে। রোগ নির্ণয় পদ্ধতির সদ্ব্যবহার ও সহজলভ্যতার অভাব এবং হাসপাতাল ও কমিউনিটিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে যে আপস, তা বাড়িয়ে দিয়েছে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল বা জীবাণু প্রতিরোধী ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার। এটি শরীরে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত যে রোগ তার বিকাশে সহায়তা করে, এসব জীবাণুকে ধ্বংস করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটা সবার জানা যে ডায়রিয়াসহ আরো কিছু সংক্রামক রোগের বিস্তারের কারণ হচ্ছে ভাইরাস। যা কিনা ৬০ শতাংশ অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল প্রেসক্রিপশনের জন্য দায়ী। বিশ্বব্যাপী অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল ওষুধের ব্যবহার হ্রাসে ক্রমবর্ধমান মনোযোগের কারণে ভারতের মতো দেশও ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারত হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে যৌক্তিক পথ বেছে নিয়েছিল।
এখন বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি এই প্রচেষ্টাকে হুমকিতে ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা ও বাজে সরঞ্জামের কারণে। অন্য অনেক শ্বসনতন্ত্রের ভাইরাসের বিস্তারের মতো, কভিড-১৯ও বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে মৃদু চেহারায় দেখা দেয়। কিন্তু কোনো ধরনের নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল না থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী রোগীদের সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।
চীন, ইতালি ও যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব দেশে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হওয়া অনেককেই অ্যান্টিবায়েটিক দেয়া হয়েছে, এমনকি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের খুব সামান্য প্রমাণ থাকার পরও। যদিও কোনো প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন নেই, তবে সাধারণভাবে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের খবর বলছে, কভিড-১৯-এর রোগীদের সবার ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঘটনা দেখা যায় না।
এখন ল্যাবগুলোও তাদের মনোযোগ নিয়োজিত করেছে কভিড-১৯-এর জন্য। এর ফলে সংবেদনশীল অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল টেস্টিংয়ের ঘটনাগুলো এখন কম গুরুত্ব পাচ্ছে। কভিড-১৯-এর রোগীদের ক্ষেত্রে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল কিংবা ফাংগাল সংক্রমণগুলোর প্রমাণও বেশ সীমাবদ্ধ। এছাড়া করোনা আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল বা ফাংগাল সংক্রমণের উপস্থিতি বিচার করতে খুব বেশি প্রয়াসও নেয়া হয়নি। এর বাইরে ল্যাবরেটরিতে থাকা স্টাফদের জন্যও এখানে ভয়ের কারণ রয়েছে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের স্বল্পতার কারণে রোগীর রক্ত সংগ্রহ করাও বেশ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতি অনেক হাসপাতালকে চালিত করেছে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগীর মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা না করার দিকে এবং সেকেন্ডারি সংক্রমণগুলোর ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিষয়টিকে পাত্তা না দেয়ার পথেও। যেহেতু ক্লিনিক্যাল উপসর্গ এবং রেডিওলজিক্যাল অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে ব্যাকটেরিয়াল অথবা ফাংগাল সংক্রমণ এবং বিদ্যমান ভাইরাল নিউমোনিয়ার মাঝে পার্থক্য করা চ্যালেঞ্জিং, তাই সেকেন্ডারি সংক্রমণগুলোর ক্ষেত্রে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। যার ফলে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল প্রেসক্রিপশন প্রদান করাও সহজ হয়। মূল কথা হচ্ছে ল্যাব কর্মীদের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না করে কভিড-১৯-এর সেকেন্ডারি সংক্রমণ ও সহসংক্রমণগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টি জোরদার করা উচিত।
যতক্ষণ পর্যন্ত এটা প্রমাণিত না হয় যে কভিড-১৯ রোগীর অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াল অথবা ফাংগাল সহসংক্রমণের উপস্থিতি আছে কিনা ততক্ষণ পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নিদের্শনা না দিয়ে উপসর্গ অনুসারে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হবে সঠিক কাজ। এমনকি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রেও রোগ নির্মূলে ন্যারোয়েস্ট এক্সপেক্ট্রাম এজেন্টকে (যা কিনা নির্দিষ্ট সংক্রমণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়) অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। এটা যুক্তিযুক্ত যে কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বরাদ্দ রাখা সেসব পরিস্থিতির জন্য, যেসব পরিস্থিতিতে ক্লিনিক্যাল উপসর্গের ভিত্তিতে ব্যাকটেরিয়াল ও ভাইরাল রোগ নির্ণয়ের পার্থক্য বের করা সম্ভব হয় না। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নির্দেশনা সবসময় স্থানীয় এপিডেমিওলজি ও অ্যান্টিবায়োগ্রামসের ভিত্তিতে দেয়া উচিত। কিন্তু যদি কভিড-১৯-এর উপস্থিতি নিশ্চিত হয় তবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত, যদি সেখানে ব্যাকটেরিয়ালের সহসংক্রমণের নিশ্চিত প্রমাণ না থাকে।
ইমিউনিটি অর্জনের ব্যাপারে সন্দেহ ও ভ্যাকসিনের অভাবে করোনাভাইরাস মহামারী হয়তো আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় থেকে যাবে। তবে এখানেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল প্রয়োজন হবে সেকেন্ডারি সংক্রমণের চিকিৎসায়। এখন নতুন অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়ালগুলো ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং অন্য কোনো অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়ালও আমাদের সামনে নেই। তবে করোনাভাইরাস সংকট শেষ হওয়ার পর আমাদের অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়ালের প্রয়োজন পড়বে।
কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নিশ্চিত নির্দেশনা থাকা এবং অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়ালের যেসব মূলনীতি তা মেনে চলা। যদি অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বিচার ব্যবহার চলতে থাকে, তবে যেসব দেশের হাসপাতালগুলো অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল ব্যবহারে নজরদারি শুরু করেছিল তা ব্যাহত হবে। সাবধানতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেয়ার ফলেই কেবল আমরা নিজেদের বাঁচাতে পারি।
হিন্দুস্তান টাইমস





