করোনা ভাইরাস শনাক্ত করার পদ্ধতি হিসেবে RT-PCR নিয়ে লিখেছিলাম কিছুদিন আগে। এই পরীক্ষাটি যে সহজ নয় এবং সেটি ব্যাপকহারে মানুষকে পরীক্ষা করতে হলে যে দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে হবে সেই সম্পর্কে বলেছিলেন। এর মধ্যে আর একটি বিকল্প পরীক্ষার কথা আমরা জানছি, সেটা হল অ্যান্টিবডি টেস্ট। এটা কি RT-PCR থেকে সহজ? এটা কি RT-PCRআর বিকল্প হতে পারে? (আমি এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই, প্রকাশিত নতুন গবেষণা ও সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এটি লেখা, এই সিরিজের অন্য লেখাগুলির লিঙ্ক একদম নিচে পাবেন।) লেখাটি খুব technical মনে হলে সরাসরি “ফলাফল" পর্বে চলে যেতে পারেন।
প্রথমত আমাদের দেহের সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা অনাক্রম্যতন্ত্র (Immune System) বেশ জটিল, সেই জটিলতায় না গিয়ে বলি আক্রান্ত শরীরে সৃষ্ট প্রতিরক্ষিকা বা অ্যান্টিবডি (antibody) এই প্রতিরোধে একটা বড় ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিরক্ষিকা বা অ্যান্টিবডির ভাল নাম হল ইমিউনোগ্লোবিউলিন (immunoglobulin), এটি এক ধরণের Y-আকারের (গুলতি আকারের) প্রোটিন যার উৎস হল B জাতীয় লিম্ফোসাইট কোষ (বাংলায় লসিকাকোষ)। B-কোষ কীভাবে এরকম প্রতিরক্ষিকা উৎপাদন করে (বড় জটিল প্রক্রিয়া!) সেসবের মধ্যে না গিয়ে বলি এই অ্যান্টিবডি - আক্রমণকারী ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়ার একটা অংশ – যাকে অ্যান্টিজেন, antigen, বাংলায় প্রতিরক্ষা-উদ্দীপক বলা হয় – তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই যে অ্যান্টিবডি-অ্যান্টিজেন যৌগ সেটি (১) হয় কোষের মধ্যে সরাসরি ঢোকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, (২) নয় রক্তের মধ্যে complement নামে একটি প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় ধ্বংস হয়, অথবা (৩) Phagocyte নামে এক ধরণের কোষের খাদ্য হয়ে যায়। কিছু B-কোষ আবার স্মৃতি কোষে রূপান্তরিত হয় যারা কিনা আক্রমণকারী ভাইরাসের অ্যান্টিজেন মনে রাখে এবং বহু বছর পরে আবার সেই ভাইরাসের আক্রমণ হলে খুব দ্রুত কার্যকরী প্রতিরক্ষিকা বা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়।
পাঁচ ধরণের অ্যান্টিবডি ইমিউনোগ্লোবিউলিনের কথা আমরা জানি ImG, ImA, ImM, ImE এবং ImD। করোনা ভাইরাস অ্যান্টিবডি টেস্ট শরীরে ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে IgM এবং IgG তৈরি হয়েছে কিনা সেটার খোঁজ করে। দেহের প্রতিরক্ষায় IgMটি প্রথমে সঞ্চারিত হয়, প্রতিরক্ষিকাদের মধ্যে এদের আকার হল সবচেয়ে বড় এবং সেই বড় আকার তাদের অ্যান্টিজেনদের সঙ্গে সহজে যুক্ত হতে সাহায্য করে। কিন্তু এগুলো শরীরে বেশীদিন থাকে না - পাঁচ থেকে ছ’দিন মত থাকে তারপর ধ্বংস হয়ে যায়। কাজেই এই টেস্টে যদি IgM শনাক্ত হয় তো তার মানে হল সংক্রমণটা খুব বেশী আগে শুরু হয় নি। অন্যদিকে IgG সংক্রমণের শেষদিকে অনেক বেশী থাকে।
পাঁচ ধরণের অ্যান্টিবডি ইমিউনোগ্লোবিউলিন (tebu bio blog)
পাঁচ ধরণের অ্যান্টিবডি ইমিউনোগ্লোবিউলিন (tebu bio blog)
অ্যান্টিজেন হল ভাইরাস বা ভাইরাসের একটি অংশ যা কিনা অ্যান্টিবডির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ।
টেস্টে রোগীর রক্ত নিয়ে একটি কাগজের লম্বা টুকরোর ওপর ঢালা হয়। সেই কাগজে গবেষকদের ল্যাবে তৈরি ভাইরাসের দেহ থেকে নিয়ে কপি-করা অ্যান্টিজেনও থাকে, সেই অ্যান্টিজেনের সাথে থাকে সোনার ন্যানোকণিকাযুক্ত কলয়েড । যে দুটি অ্যান্টিজেনের কথা আমরা জানি সেটা হল করোনা ভাইরাসের আবরণে যে গজাল প্রোটিন (Spike S) তার একটি পরিবর্তিত রূপ ও সেই গজালের একটি অংশ যাকে বলা হয় receptor-binding domain (RBD)। তবে এক এক কিট এক ধরণের অ্যান্টিজেন ব্যবহার করতে পারে। আমাদের শরীরে যদি IgM তৈরি হয় তবে সেটি ওই অ্যান্টিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করবে। কৈশিক প্রক্রিয়া বা capillary actionএর মাধ্যমে এই অ্যান্টিবডি-অ্যান্টিজেন যৌগ কাগজের মধ্যে দিয়ে এগোবে যতক্ষণ না সেটি একটি ফিতার মত রেখার সাক্ষাৎ না পায় যেটি এমন একটি যৌগ দিয়ে তৈরি যা কিনা IgMকে আটকে দিতে পারে। একে বলে অ্যান্টি-অ্যান্টিবডি। সমস্ত IgM-অ্যান্টিজেন এখানে আটকা পড়লে তাদের সঙ্গে যুক্ত কলয়েড-জাতীয় সোনা একটা লাল রঙ ধারণ করবে। কাজেই রুগীর রক্তে যদি IgM থাকে তাহলে একটা M যেখানে লেখা আছে সেই ফিতাটি লাল রঙ ধারণ করবে।
টেস্ট কাগজে অ্যান্টিবডি, অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টি-অ্যান্টিবডির অবস্থান (cliniscience)
টেস্ট কাগজে অ্যান্টিবডি, অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টি-অ্যান্টিবডির অবস্থান (cliniscience)
একইভাবে যেখানে IgG অ্যান্টিবডি-অ্যান্টিজেন যৌগ যেয়ে আটকাবে সেই রাখাটিতে যেখানে আছে IgGর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এমন একটি অ্যান্টি-অ্যান্টিবডি। রক্তে IgG থাকলে G ফিতাটি লাল হয়ে যাবে। এরপরে আছে একটি নিয়ন্ত্রণ (control) রেখা যেখানে রাখা অ্যান্টি-অ্যান্টিবডি SARS2এর IgM ও IgG থাকুক বা না থাকুক লাল রঙ ধারণ করবে যদি পরীক্ষা সফল হয়। C রেখাটি লাল না হলে পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
টেস্ট সফল হল চার ধরনের ফলাফল হতে পারে (cliniscience)
টেস্ট সফল হল চার ধরনের ফলাফল হতে পারে (cliniscience)
ফলাফল
নিচের গ্রাফটা দেখে আমরা ওপরের ফলাফলের কী মানে হতে পারে সেটা কিছুটা অনুমান করতে পারি। যদি পজিটিভ IgM হয় তো মনে করা যেতে পারে রোগী এই মুহূর্তে আক্রান্ত আছেন, যদি শুধু IgG হয় তাহলে হতে পারে সে আক্রান্ত হয়ে সেরে উঠছে এবং হতে পারে যে, ভবিষ্যতে আর তার সংক্রমণ হবে না। যদি দুটোই পজিটিভ থাকে তবে মনে করা যেতে পারে যে সংক্রমণের শেষের দিকে আছে রুগী। আর যদি কোনোটাই না দেখায় তবে রুগী আক্রান্ত নয়। দুঃখের বিষয় এই শেষের বক্তব্যটা যে সবসময় ঠিক তা নয়। এমন হতে পারে এই পরীক্ষায় যে অ্যান্টিজেন ব্যবহার করা হয়েছে সেটি রুগীর অ্যান্টিবডি চিনতে পারছে না। অবার এমনও হতে পারে যে, রুগী সংক্রমিত হয়েছে, কিন্তু যথেষ্ট সময় যায় নি অ্যান্টিবডি তৈরি করার।
সংক্রমণের শুরু থেকে IgM ও IgGর পরিমাণ (cliniscience)
সংক্রমণের শুরু থেকে IgM ও IgGর পরিমাণ (cliniscience)
প্রতিরক্ষিকা (অ্যান্টিবডি) পরীক্ষা শরীরে কিছু বিশেষ প্রতিরক্ষিকা আছে কিনা সেটা শনাক্ত করে, এটা বলে না যে, সেই প্রতিরক্ষিকাগুলো ভাল কাজ করছে কিনা, অর্থাৎ অসুখ সারিয়ে দেবার মত তাদের জোর আছে কিনা। আগেই বলেছি এই টেস্ট সংক্রমণের প্রথম কয়েক দিন হয়তো নেগাটিভ (ঋণাত্মক) ফল দেখাবে কারণ শরীরে তখনো যথেষ্ট অ্যান্টিবডি সঞ্চারিত হয় নি। অন্যদিকে কিছু গবেষণা বলছে যে, অসুখের চিহ্ন ফুটে ওঠার আগে একজন সংক্রমিত মানুষের অন্যকে সংক্রমণ করার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশী হয়। এজন্য এই টেস্টটি যারা ইতিমধ্যে সংক্রমিত তাদের জন্য ভাল কাজ করবে, কিন্তু যারা সংক্রমিত, কিন্তু যাদের মধ্যে অসুখের চিহ্ন বর্তমান নয় তাদের জন্য তেমন কাজ করবে না। সেক্ষেত্রে চিরায়ত PCR টেস্টই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। চীন থেকে যে লক্ষ লক্ষ অ্যান্টিবডি টেস্ট কিট যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়েছিল সেগুলো ভালভাবে যারা সংক্রমিত শুধু তাদের ওপরই কাজ করে, যুক্তরাজ্যে ব্যাপারটা আগে বুঝতে পারে নি। এর আগে চীন থেকে RT-PCRএর জন্য যে কিটগুলো ইউরোপে পাঠানো হয়েছে সেগুলোও ভালভাবে কাজ করে নি। তার জন্য অবশ্য চীন বলেছে স্থানীয়ভাবে যারা পরীক্ষা করছে তারা প্রটোকল অনুযায়ী কাজ করছে না।
অন্যদিকে এই টেস্টটি করা খুব সহজ, আঙুলের ডগা থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত নিলেই হবে। এতে বেশী সময় লাগে না, পরীক্ষাটি ১৫ মিনিটের মধ্যে করা যায়। বিভিন্ন দেশে এই টেস্টটি ব্যবহার করার কথা হচ্ছে সংক্রমণমুক্ত মানুষের সন্ধানের জন্য, সেই মানুষেরা বাড়ি থেকে বের হতে পারবেন। এটা বিশেষত স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য খুব কার্যকরী হবে। কিন্তু টেস্ট কিটটি বানানো অত সহজ নয়। যুক্তরাষ্টের FDA অ্যান্টিবডি টেস্টের অনুমোদন দিয়েছে। মনে হয় গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা dot-blot পদ্ধতিতে অ্যান্টিবডি শনাক্তকরণেরই একটি উপায় উদ্ভাবন করেছেন। দেখা যাক কী হয় ।
অ্যান্টিবডি টেস্ট সহজ, আবার সহজ নয় (The Guardian)
অ্যান্টিবডি টেস্ট সহজ, আবার সহজ নয় (The Guardian)
এছাড়া অন্য সমস্যা হল কিট কাজ করলেও এই টেস্টে false positive ও false negative ফলাফল আসার সম্ভাবনা রয়ে গেছে। জনসংখ্যার অল্প পরিমাণ মানুষ (ধরা যাক শতকরা 4.5%) যদি আক্রান্ত হয় তবে পজিটিভ ফলাফল এলে আসলেই পজিটিভ হবার সম্ভাবনা 50%। অন্যদিকে 30% মানুষ আক্রান্ত হলে পজিটিভ ফলাফল এলে 90% ক্ষেত্রে সেটা সত্যি হবে। এছাড়া ভাবা হচ্ছিল যাদের একবার সংক্রমণ হয়ে গেছে তাদের রক্তে যথেষ্ট অ্যান্টিবডি থাকবে যা কিনা সংক্রমিত রুগীর শরীরে দিলে সে ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে। চীনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে পরিমাণ অ্যান্টিবডি সংক্রমণমুক্ত মানুষের মধ্যে আশা করা গিয়েছিল তা নেই। হয়তো অন্য ধরণের অনাক্রম্যতা (immunity) তাদের মধ্যে কাজ করেছে যেটা আমরা এখনও বুঝতে পারছি না।
তবুও বাংলাদেশের মত দেশের জন্য এই পরীক্ষাটি কাজের। কারণ এর জন্য কোনো বিশেষ ল্যাব তৈরি করতে হবে না। প্রশিক্ষণও হবে সংক্ষিপ্ত। নাই মামা থেকে কানা মামা ভাল। সংক্রমণের বিস্তার কতটুকু জানা যাবে, তার থেকে শিক্ষা নেয়া যাবে। সাধারণ সর্দি-কাশি থেকেও আলাদা করা যাবে। শুধুমাত্র যে কিটগুলো আমদানি করা হবে দেখতে হবে তার গুণগত মান ঠিক আছে কিনা। এটা নিয়ে পৃথিবীতে ব্যাপক ব্যবসা চলছে যার সবগুলোই সাধু নয়।





