করোনা সম্পর্কে অনেক তথ্য ও তত্ত্ব এখন জানা যাচ্ছে। কিছু অবশ্য পরস্পরবিরোধী। মোদ্দাকথা, পৃথিবীতে এখন ১৮ লাখেরও বেশি মানুষ করোনা শনাক্ত এবং ১ লাখ ১০ হাজার মারা গেছে। মরণশীলতার অনুপাত ৬ শতাংশ; বাংলাদেশে এটি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। করোনা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একটা কথা সবাই বলছেন, এই অসহায় অবস্থা থেকে বের হতে হলে নমুনা পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কভিড-১৯-এর লড়াইয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, জার্মানি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম ক্ষতিতে লাগাম টেনেছে। তারা শুরু থেকেই অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে সবাইকে পরীক্ষা করে, করোনা শনাক্ত করে, চিকিৎসা-কোয়ারেন্টিন করে সফল হয়েছে। বাংলাদেশে অবশ্য এর সীমাবদ্ধতা আছে। এর মধ্যে কি সর্বোচ্চ শক্তিতে স্যাম্পল পরীক্ষা করা হচ্ছে? শুক্রবারে সমাপ্ত ২৪ ঘণ্টায় স্যাম্পল পরীক্ষা করা হয় ১ হাজার ১৫৪ জনের আর শনিবার সমাপ্ত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা করা হলো ৯৮৪ জনের। আরো বেশি চেষ্টা দরকার স্যাম্পল সংখ্যা বাড়ানোর, নইলে সব করোনা আক্রান্তের পরীক্ষা করতে অনেক সময় লেগে যাবে।

এদিকে সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও লকডাউন মোটামুটি সফল হলেও পুরো হচ্ছে না। অল্পসংখ্যক হলেও কিছু জিদ্দি মানুষ তেমন প্রয়োজন না থাকলেও বাইরে বের হচ্ছে। এক্ষেত্রে সম্ভবত একযোগে কিছুদিনের জন্য করোনা আক্রান্ত ২০-২২টি জেলায় কারফিউ জারি করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। কিছুটা ব্যতিক্রম ও কড়াকড়ি শিথিল ও কাটছাঁট এবং সময় হ্রাস করার অবকাশ আছে।

লকডাউন হোক অথবা কারফিউ, মানুষের কষ্ট হচ্ছে নিঃসন্দেহে। সরকার করোনা বেকার তথা ছুটা দোকানি, দিনমজুর, রিকশাচালক, ঠেলাওয়ালা ও এ রকম অন্য হতদরিদ্রদের জন্য যে উদারহস্তে অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে, তার সুষ্ঠু বিতরণের জন্য তালিকা হালনাগাদ এবং নতুন সংযোজন জরুরি। উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং নজরদারিতে তালিকা প্রস্তুত ও হালনাগাদ করতে অঞ্চলের প্রবীণ কিংবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী যে অসামান্য কাজ করছে, তালিকা প্রস্তুত ও তাতে বিশেষ করে গোয়েন্দাদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। অনেক মহৎ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান যেভাবে খাদ্য  ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে, তাতে সমন্বয় আনাও জরুরি। তাত্ক্ষণিকভাবে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরিকল্পনা কমিটির মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প আপাতত স্থগিত করা যায়। অর্থবছর ডিসেম্বর পর্যন্ত নেয়া যায়।

সাধারণভাবে কোথাও কারো করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর জানা গেলে উক্ত স্থানটিকে লকডাউন করা হচ্ছে। এমনকি বেসরকারি লোকেরাও রাস্তা বন্ধ করে লকডাউন করছে। ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পুনরায় স্থাপনের জন্য এসব ভালো নজির নয়। 

তৈরি পোশাক শিল্পের অন্তত কয়েকশ কারখানা গোপনে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা জিইয়ে রাখছে। আমার ভুল হতে পারে কিন্তু তদন্ত করতে বাধা কী! যারা বলছেন তাদের সবাই পিপিই বানাচ্ছেন না, একটি পক্ষ ঢাল হিসেবে এর নাম ব্যবহার করছে আর পিপিই বানানোর নামে অত্যন্ত নিম্নমানের কাপড় দিয়ে তা বানাচ্ছে।

তাত্ক্ষণিকভাবে দেশের একটি ক্ষতিগ্রস্ত খাত হলো কৃষি তথা ফলফলাদি, সবজি, মাছ, দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য, হাঁস-মুরগি, ডিম ও ফুল, যেগুলো পচনশীল। একদিকে এসব যারা ফলাচ্ছেন তারা দিশেহারা, অন্যদিকে পরিবহনকারী ও গ্রাহকরা এগুলো পাচ্ছেন না ঠিকমতো। সরকারি উদ্যোগে বড় বড় রিটেইলার আগোরা, মীনা বাজার, প্রাণ, স্বপ্ন, ইউনিমার্ট, ল্যাভেন্ডার প্রভৃতিদের যদি বিশালভাবে এসব পণ্য  কিনতে মেইল অর্ডারে (চিঠির মাধ্যমে আদেশ প্রদানের মাধ্যমে) লোভনীয় প্রণোদনা দেয়া যায় তাহলে যথেষ্ট ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া চাঁদপুর মডেলে খোলা জায়গায় ‘সততা মার্কেট’ করেও এগুলো বিক্রি করা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে সুদক্ষ সশস্ত্র বাহিনী আর পুলিশ ফোর্সকে এ  দায়িত্ব দিলে উৎপাদনকারীদের বাঁচানো যাবে। আর ক্রেতারাও সুবিধা পাবে। তাছাড়া প্রকল্পের জন্য আনা হাজার হাজার অলস পড়ে থাকা গাড়িগুলো এ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। মাঠের বোরো ফসল কাটা ও সংগ্রহ অভিযানে সম্ভবত সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ করা সঠিক হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে মে মাসে অর্থনীতি খুলে যাবে। ট্রাম্প সাহেব শুধু চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং পুনর্নির্বাচনের স্বার্থেই  সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ইউরোপের কয়েকটা দেশও তা-ই করছে। চীন তো খোলা আছে। মার্কিন আর ইউরোপেও খেলার গোষ্ঠীগুলো পারলে আজই মাঠে নামে। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রচণ্ড উন্নয়ন ধারা বেগমান ও দারিদ্র্যের বৃদ্ধি ঠেকাতে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার জরুরি। অত্যন্ত চমত্কার ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা তথা পুনরুদ্ধার বাস্তবায়নের নিরিখেই সেই কৌশল ঠিক করতে হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কৃষির জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন টাকা জোগাড় করতে হবে। দরকার হলে সময়োচিতভাবে সম্প্রসারণশীল অর্থনৈতিক কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা ছাপাতে পারে। তবে দুটি সরকারি ব্যাংক অগ্রণী আর জনতার কাছে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের জন্য টাকা আছে। সিআরআর কমানোতে কিছু অর্থ রিলিজ হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের চাপ দিয়ে প্রতিশ্রুত সহায়তা দ্রুত ছাড় করানো যেতে পারে। দুঃখের বিষয়, বিশ্বব্যাংক আবারো বাংলাদেশের প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ করছে। তাদের ২২৭ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিশেষ তহবিল থেকে আমাদের মাত্র ১০০ মিলিয়ন ডলার দিতে চায়। আমাদের খুব ভালো বন্ধু এডিবি ও আইডিবির কাছে জোর তদবির করা যায়।

বলতে দ্বিধা নেই, আগামীতে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এমএসএমই) যে বিশাল কর্মসংস্থান (স্বকল্প কর্মসংস্থানসহ), তার প্রস্তুতি বড়ই দুর্বল। এই এমএসএমইর জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, এটাকে একটি তহবিল করা যেতে পারে। এ বিষয়ে ১০ বছর ধরে  ছাত্র পড়াই ও গবেষণা করছি। এডিবিতে ড. আলমগীর এবং বিআইডিএসে ড. মনজুর হোসেন রীতিমতো নিবেদিতপ্রাণ। এডিবি যদি দৃষ্টি দিতে পারে, তাহলে সরকার এসএমই ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্র করে বিশাল অর্জন তথা শতকরা ৫০ ভাগ কর্মসংস্থান একসঙ্গে করতে পারবে। ২৩ লাখ এমএসএমই উদ্যোক্তা রয়েছেন, তাদের মধ্যে থেকে সুদক্ষ গোলকচয়নের মাধ্যমে এক লাখকে বাছাই করতে পারে। দেশেই কাঁচামাল রয়েছে। বাজারের কোনো অভাব হবে না। এ খাতটি বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনরুত্থানে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে সন্দেহ নেই। স্বকর্মসহ কর্মসংস্থানে এ খাত শতকরা ৫০ ভাগ পর্যন্ত অবদান রাখতে পারে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি শতকরা তিন ভাগে নেমে আসবে। তবে তারা আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কারের সুপারিশ করেছে। বিশ্বব্যাংকের মুখে আগের মতোই ছাই দিয়ে বাংলাদেশ যেন অন্ততপক্ষে ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, সেভাবেই সফল সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে হবে।

 

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য

অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মী