নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গৃহবন্দি পৃথিবীর মানুষ। একের পর এক দেশ লকডাউন হয়ে আছে। এজন্য অবশ্য দায়ী করা হচ্ছে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোকে। এখন জনসংখ্যার ঘনত্ব কি সত্যিকার অর্থেই মহামারীকে প্রভাবিত করে, নাকি এ ধারণাটি ভুল? শহর এলাকায় যখন মানুষ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাস করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা একে অন্যের সংস্পর্শে আসে। যে কারণে এখান থেকে রোগ ছড়িয়ে পড়ার বেশ ভালো সুযোগ থাকে। এটা মূলত সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কে আমাদের যে অনুমান তার সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও তা আংশিক সত্য।
কতটা দ্রুত ও বিস্তৃতভাবে সংক্রামক রোগ ছড়ায় তা বোঝার জন্য এপিডেমিওলজিস্টরা ‘জ’ তত্ত্বের কথা বলেন। অর্থাৎ ‘জ’ দিয়ে একজন আক্রান্ত রোগী কতজনকে সংক্রমিত করতে পারে, তা হিসাব করা হয়। চারটি গড় মানকে গুণ করে এটি গণনা করা হয়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তির যোগাযোগের হার, যাকে বলে ‘ঝ’। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে একজন সুস্থ ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা, যেটি হচ্ছে ‘ঞ’। আক্রান্ত ব্যক্তির সেরে ওঠার সময়কাল, যা হচ্ছে ‘উ’ এবং জনসংখ্যায় সম্ভাব্য সংক্রামক ব্যক্তির হার ‘ঝ’।
জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে শহরে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার যে অনুমান, তা কিছু বিবেচনায় সঠিক। যেমন শহরের ক্রমবর্ধমান ঘনত্ব আক্রান্তের যোগাযোগের মাত্রাকে বৃদ্ধি করে, যা কিনা আক্রান্ত সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অধিক মাত্রায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।
কভিড-১৯ আক্রান্ত কয়েকটি এলাকা থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কিছু ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। ঘনত্ব ইতিবাচকভাবে বর্তমান আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। ঘনত্বের যে পরিমাপক ‘জ’ তা কিনা এর সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত নয়, যা কিনা মহামারীর এ পর্যায়ে এসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
মহামারী যতই ছড়াতে থাকে, তখন অনেক লোক এতে আক্রান্ত হবে ও সেরে উঠবে। পাশাপাশি তারা প্রতিরোধীও হয়ে উঠবেন (কভিড-১৯-এর মতো বেশির ভাগ ভাইরাল ইনফেকশনে তেমনটাই হয়ে থাকে। এজন্য অবশ্য নিশ্চিত তথ্য-প্রমাণের অপেক্ষা করা হচ্ছে)। এছাড়া মহামারী যখন অনেককে একসঙ্গে আক্রান্ত করে, তখন খুব অল্পসংখ্যক লোকই অবশিষ্ট থাকে। অর্থাৎ ‘জ’ দিয়ে পরিমাপ করলে দেখা যাবে জনসংখ্যায় সম্ভাব্য আক্রান্ত হওয়ার যে হার, সেই ‘ঝ’ কমতে থাকবে। এ ‘ঝ’-কে চাইলে আগুনে জ্বলতে থাকা কাঠের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ কাঠ জ্বলে ছাই হয়ে গেলে আগুনও নিভে যাবে। আর যখন আক্রান্ত হওয়ার মতো লোক অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মহামারীও চলে যাবে। এটা সম্ভব যখন ‘জ’-এর মান একের নিচে চলে আসবে।
এ পর্যায়ে প্রতিজন আক্রান্ত ব্যক্তি তাদের মধ্য থেকে গড়ে একজনের চেয়ে কম ব্যক্তিকে সংক্রমিত করছেন। তারা একবার সেরে উঠলে আক্রান্তের সংখ্যাও কমে আসবে। সংক্রামক রোগ একবার জনসাধারণের মধ্যে প্রবেশ করলে সেটি ততক্ষণ পর্যন্ত টিকে থাকবে যতক্ষণ না ‘ঝ’ পর্যাপ্ত পরিমাণে কমে আসে। এরপর তা একেবারেই নাই হয়ে যাবে।
যদি আমরা এ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোর ওপর দৃষ্টিপাত করি, আমরা অনেকগুলো শহরে এ রকম ঘটনা দেখতে পাব। সিয়াটল, নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ার অনেক শহরে এভাবেই ঘটেছে। মিয়ামি ও নিউ ওরলেন্সসহ আরো কিছু শহর দ্রুতই একই পথে এগোচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ প্রত্যেকটি শহরকে আপনি গাছে সমৃদ্ধ একটি ছোট বন হিসেবে ভাবতে পারেন। যদি এ বনের কোথাও আগুন লাগে, তবে তা ততক্ষণ জ্বলতে থাকবে যতক্ষণ না এটি পুড়ে যাচ্ছে। কারণ ঘনবসতিপূর্ণ শহরের একজন আক্রান্ত ব্যক্তির যোগাযোগের হার অনেক বেশি থাকে। তারা তখন অনেক দ্রুত ও অনেকক্ষণ ধরে জ্বলতে থাকবে। এখন নিউইয়র্ক সিটিতে যা হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি অন্য শহরগুলোতেও হবে। আর নিউইয়র্ক আজ বা আগামীকাল টোপেকা কিংবা টোকসোনে পরিণত হবে।
এখন নিউইয়র্ক কিংবা অন্য কোনো বড় শহরের ঘনত্বের দিকে মনোযোগ দেয়া বিভ্রান্তিকর। করোনার উপকেন্দ্র যেকোনো জায়গা হতে পারে। শিকাগো, সেন্ট লুইস কিংবা সিয়াটলেও এটি একইভাবে আঘাত হানতে পারে। আমরা কি ভুলে যাচ্ছি, এটা মূলত প্রথমে সিয়াটলে শুরু হয়েছিল। মার্চের দ্বিতীয় ভাগে গিয়ে আমরা নিউইয়র্কের নিউ রোচেলের ওপর নজর দিয়েছিলাম।
সত্যি কথা হচ্ছে, প্রথম আঘাতটা যেকোনো জায়গায় হতে পারে। কেবল নিউইয়র্ক, সিয়াটল ও লস অ্যাঞ্জেলেসে মনোযোগ দেয়ার মাঝে পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। এগুলো সব বাণিজ্যিক কেন্দ্র। পাশাপাশি পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণও এখানে বেশি হয়ে থাকে। সংক্রামক রোগ এলেমেলোভাবে শহরে পড়ে থাকে না। তারা সেই শহরগুলোতে বেশি দেখা যায়, যেখানে প্রচুর লোক আসা-যাওয়ার মাঝে থাকে। যেমনটা হয়ে থাকে নিউইয়র্ক কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসে। এসব শহরে প্রথমে কভিড-১৯-এর আঘাত তাই কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা না।
আমরা যদি আবারো তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখি, তবে যেসব এলাকায় শুরুতে কভিড-১৯-এর অস্তিত্ব ছিল, সেগুলো এখন আরো বড় হয়েছে। এখানে জনসংখ্যার ঘনত্বের চেয়ে প্রথম পর্যায়ে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনো এলাকা কম ঝুঁকিপূর্ণ এমনটা বলার সুযোগ নেই।
শহরের ঘনত্বের ওপর বেশি মনোযোগ দেয়া তাই ভুল। আমরা এ মহামারীর প্রথম দিকে আছি, যেখানে আমাদের মনে হতে পারে যে জনসংখ্যার ঘনত্বই সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এটি যে কারণে ঘটে তা হচ্ছে, ভ্রমণের কেন্দ্রে থাকা শহরগুলো প্রথম আঘাতের শিকার হয়।
সম্ভবত দুই মাসের মধ্যে আমরা মহামারীর চালিকাশক্তি হিসেবে নিউইয়র্কের ওপর কম মনোযোগ দেব। তার পরিবর্তে সারা দেশে আক্রান্তের দিকে আমাদের নজর থাকবে। পাশাপাশি যেসব শহর আজ রোগমুক্ত বলে মনে হচ্ছে, কাল তেমনটা থাকবে না। তাদের এখন মহামারীর বাটন হাতে নেয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান





