এটা হয়তো একটু দূর কল্পনা হতে পারে। কিন্তু এটা সম্ভব যে আপনার স্মার্টফোন রোগ শনাক্ত করার জন্য ব্যবহূত হতে পারে। আপনার মোবাইল পরিবর্তিত হতে পারে এমন একটি যন্ত্রে যা কিনা ব্যাকটেরিয়া, টক্সিন ও ভাইরাসজাতীয় রোগ শনাক্তে ব্যবহূত হবে।

স্মার্টফোনভিত্তিক টেস্টের মাধ্যমে এইচআইভি, ম্যালেরিয়া, টিবি ও খাদ্যে বিষক্রিয়াসহ নানা রোগ শনাক্ত করা যায়। এখন স্মার্টফোন দিয়ে কভিড-১৯ শনাক্ত করার প্রক্রিয়াও অব্যাহত আছে। যদিও প্রযুক্তিকে এভাবে ব্যবহার করার বিষয়ে এবং কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

এর মাঝে একটি দল কাজ করেছে স্মার্টফোন ব্যবহার করে খাদ্যে বিষক্রিয়া রোগ পর্যবেক্ষণের জন্য। যা ছিল মূলত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ফুড স্মার্টফোন প্রজেক্ট। এখন ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ প্রযুক্তির ব্যবহারের সম্ভাবনাও বেশ বেড়েছে।

কীভাবে এটি কাজ করে

স্মার্টফোন দিয়ে টেস্ট করার একটা সাধারণ উপায় হচ্ছে এখানে পাশাপাশি বিশেষভাবে তৈরি লেবেল ব্যবহার করা হয়। যা কিনা বিশেষ কোনো পদার্থের উপস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য ডিজাইন করা হয়। যেমন নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির জন্য।

টেস্ট করার জন্য গলা অথবা রক্ত থেকে তরল পদার্থ নেয়া হয়, যা লেবেলে যুক্ত করা হয়। এটি আপনি যা খুঁজছেন তার জন্য সংবেদনশীল। যদি সে পদার্থ সেখানে উপস্থিত থাকে তবে তা প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এ প্রতিক্রিয়া আপনি জানতে পারবেন আলো, রঙ অথবা ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যালের মাধ্যমে। যা ফোন চিহ্নিত করবে এবং তারপর এটি প্রকাশিত হবে ক্যামেরা অথবা লাইটের সেন্সরের মাধ্যমে। কিংবা এটি হতে পারে ইলেকট্রোকেমিক্যাল ডিভাইস ব্যবহার করে। ফোনের অ্যাপে তার ফল দেখা যাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবে।

কভিড-১৯-এর জন্যও বিদ্যমান লেবেল এমনভাবে মানিয়ে নিতে পারে যেন নতুন উপাদানের ক্ষেত্রে এটি প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। যে উপাদান হতে পারে সার্স-কোভ-২-এর জিনগত উপাদান অথবা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি। বিদ্যমান প্রযুক্তিতে এ ধরনের পিগিব্যাংকিংয়ের কথা এরই মধ্যে বলা হচ্ছে।

যদিও এই ধরনের টেস্টের ব্যবস্থা জনগণের জন্য সহজলভ্য হতে এখনো কিছুটা সময়ের প্রয়োজন আছে। আর স্মার্টফোনভিত্তিক টেস্টগুলো এখনো পরীক্ষামূলক অবস্থায় আছে। এখনো কার্যকারিতা দেখার জন্য এসব টেস্টেরও কয়েক ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়ার প্রয়োজন আছে। যাতে কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ এইচআইভি ও সিফিলিস শনাক্তের জন্য এ রকম স্মার্টফোনভিত্তিক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। যা কিনা ২০১৫ সাল থেকে চলে আসছে। কিন্তু এর দ্বিতীয় পর্যায়ের ঘরে বসে টেস্টিংয়ের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে ২০২০ সালের এপ্রিলে। যার ফলাফল এখনো অপেক্ষমাণ আছে। যদি সেই ফলাফল ইতিবাচকও আসে, তার পরও আরেকটি ট্রায়ালের প্রয়োজন রয়েছে।

বর্তমানে মহামারীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাপক চাপ রয়েছে, যা মূলত হতে পারে কভিড-১৯-এর টেস্টের পদ্ধতি উন্নত করার মাধ্যমে। এমনিতে সংক্রামক রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে সাধারণত এক দশকের বেশি সময় লাগে। তবে আশা করা হচ্ছে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ১২ থেকে ১৮ মাসের মাঝে পাওয়া যাবে। একইভাবে স্মার্টফোনভিত্তিক টেস্টিং পদ্ধতিও দ্রুতই হাতের কাছে পাওয়া যাবে।

কীভাবে ব্যবহার করতে হবে

কভিড-১৯-এর স্মার্টফোনভিত্তিক ডিভাইস বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করা যাবে। প্রথমত এটি ভাইরাল জেনেটিক উপাদান শনাক্ত করতে পারে শ্বাসনালির মধ্য থেকে। সংক্রমণের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে টেস্ট করে দেখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এগুলো ব্যবহূত হতে পারে ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য। যাতে করে দেখা যাবে কেউ একজন আগেই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে কিনা। এই তথ্য আবার আমাদের উপসর্গহীনতা ও ইমিউনিটি সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করতে পারে।

সবশেষে এটিকে আমরা ব্যবহার করতে পারি সারফেসে কিছু আছে কিনা তা দেখার জন্য।

সুবিধা ও অসুবিধা

স্মার্টফোনভিত্তিক কভিড-১৯-এর রোগ নির্ণয় পদ্ধতি উন্নতি ঘটাতে পারে সেলফ আইসোলেশন রীতি, ডাটা কালেকশন এবং অধিক সংক্রমিত এলাকা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায়। তার ওপর আমরা জানি যে মানুষ স্মার্টফোনভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্র্যাকিং এবং রোগ নির্ণয় করতে আগ্রহী। তাই সম্ভবত এই প্রযুক্তি গৃহীত হবে। এছাড়া ঘরে পরীক্ষা করার এ পদ্ধতি সরঞ্জাম ও হাসপাতাল ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাবে। যা অবশ্য অন্যান্য পরিস্থিতিতে মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিতে পারে।

কিন্তু যদি এটি জনপ্রিয় হয় এবং এর মধ্য দিয়ে অনেক বেশি টেস্ট করা হয়, তবে এই টেস্ট যথাযথ হওয়াও জরুরি। এই টেস্ট পাশাপাশি স্বচ্ছ এবং ব্যবহারে সহজ হওয়াও বাঞ্ছনীয়, যাতে করে এটি ঠিকঠাকভাবে কাজ করে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যদি কোনো ভুল হয়, তবে ভিন্ন ফল আসবে এবং অনেক মানুষের রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভুল হবে।

এসব ঝুঁকি অবশ্য সুপরিচিত এবং অন্যান্য স্ব-পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয়। ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য একাধিক পরীক্ষা একযোগে চালানোর মতো সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে এটি কি পৃষ্ঠতল পরীক্ষার জন্য প্রাসঙ্গিক কিনা। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন এবং প্রিপ্রিন্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বলছে, কভিড-১৯-এর ভাইরাস বিভিন্ন পৃষ্ঠে সাতদিনের বেশি সময় থাকতে পারে। যাই হোক, এমন কোনো পরীক্ষা নেই যা দেখায় ভাইরাস আসলে উল্লেখিত সময়ের জন্য সংক্রামক থাকতে পারে। তাই বিস্তৃত পৃষ্ঠতলের পরীক্ষা ভাইরাসের কম ঝুঁকিপূর্ণ কণা শনাক্ত করে অহেতুক ভয়ের সৃষ্টি করতে পারে।

স্মার্টফোনভিত্তিক বায়োসেন্সর সম্ভবত কভিড-১৯-এর ট্র্যাকিং ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সহায়ক প্রমাণিত হতে পারে। তবে এই জাতীয় ব্যবহারের জন্য যে সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে তা অবশ্যই উচ্চমানের হতে হবে। এছাড়া বিভ্রান্তি কমাতে এই সম্পূর্ণ ক্ষমতা ও ত্রুটি সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। তবে প্রযুক্তির এমন বহুল ব্যবহার বিজ্ঞানীদের ওপর থেকে জনগণের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। এরই মধ্যে কভিড-১৯ ঘিরে কয়েকটি হাইপ্রোফাইল কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে, যা এ মুহূর্তে আমাদের জন্য ভালো খবর নয়।

স্ক্রলইন