ইংল্যান্ডে দক্ষিণ উপকূলে আমার শহর ব্রাইটন পার্টি টাউন হিসেবে সুপরিচিত। এটি জেলেদের গ্রাম থেকে বিলাসবহুল রিসোর্টে পরিণত হয়েছিল। যেজন্য একজন প্রিন্সের আকাঙ্ক্ষাকে ধন্যবাদ জানানো যেতে পারে। যিনি নিজের গোপন স্ত্রীর সঙ্গে এখানে অবকাশ যাপনে আসতেন। সে ঘটনার দুই শতাব্দী পরও মানুষ এখনো এ স্থানটিকে আনন্দ উদযাপনের কেন্দ্র হিসেবে দেখে।
উজ্জ্বল আলোর বাইরে যে বিষয়টি এ জায়গাটিকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে তা হলো এর রাস্তার ধার এবং পার্কগুলো সুশোভিত করা হয়েছে ১৭ হাজার এলম গাছ দিয়ে। এলম সিটিতে স্বাগতম, গাছেদের সর্বশেষ মহত্তম আশ্রয়, যা একদা ইংল্যান্ডের প্রাকৃতিক দৃশ্যকে অপরূপ করে তুলেছিল।
যুক্তরাজ্য তার বেশির ভাগ এলম গাছ হারিয়ে ফেলেছিল ১৯৭০-এর দশকে ডাচ এলম ডিজিজ নামক রোগে। যা স্থানীয় এলাকাটিকে কঙ্কালসার অবস্থায় রূপান্তরিত করেছিল। এক দশকে তিন কোটি এলমের মৃত্যু হয়। যা ছিল দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঠের উৎস। এরপর এলম গাছ টিকে ছিল, যার জন্য ধন্যবাদ জানানো যেতে পারে ভৌগোলিক বৈচিত্র্যময়তাকে এবং সংক্রামক গাছকে প্রাথমিক অবস্থাতেই পুড়িয়ে ফেলাকে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এ গাছগুলো বৈশ্বিক পরিসরে উদ্ভিদগুলোর রোগজীবাণুর বিপদের শিকার হওয়ার স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বৃক্ষ হত্যার অণুজীব অনেকটাই ডাচ এলম ডিজিজের জন্য দায়ী মাইক্রোফাংগাসের মতো। যা বিশ্বকে কয়েক শতক ধরে উদ্ভিদ জগেক বিপদে ফেলে আসছে, যা ছড়িয়েছে বহিরাগত গাছ, গুল্ম, কাঠ, কাঠের পণ্য ও প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে। ভীতিকর ছত্রাকগুলো যেমন ফাইটোফটোরাস সত্যিকার অর্থে কৃষি, বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ হতাশাজনক অভিজ্ঞতা এবং শক্ত বায়োসিকিউরিটির পরও গাছের হন্তারক জীবাণুর আগমনের ঘটনা বাড়ছে। দাবানলগুলোর তীব্রতা বাড়ছে এবং প্রায়ই সংঘটিত হচ্ছে। বিশ্বনেতারা প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের নিমিত্তে কোটি কোটি গাছ লাগানোর এবং পরিবেশগত জরুরি অবস্থা মোকাবেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভবিষ্যতের মহামারী মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে উপায় খুঁজে বের করা দরকার। এ বছরটি জাতিসংঘের বৃক্ষ স্বাস্থ্য বর্ষ। তাই এটাই উপযুক্ত সময় আমরা কী করছি তা মূল্যায়নের জন্য।
উদ্ভিদ রোগবিষয়ক এপিডেমিওলজিস্ট স্টেফান পারনেল বলেন, আমরা এদিকটাতে ভালো করছি, কারণ আমরা ভালোভাবে প্রস্তুত। কিন্তু একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জগুলো বেড়ে চলেছে। আমাদের মহামারীর চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে, কেবল ক্ষতির বিষয়টি দেখলে চলবে না। যদি আমরা তা না করি, আমরা অনেক প্রজাতি এবং গাছ হারাব, যাদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
ঐতিহাসিক রোমহর্ষক গল্প
নিজেদের অঞ্চলের ভেতর গাছ ও রোগজীবাণুগুলো বিবর্তিত হয়। গাছ প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে এবং জীবাণু আরো জোরের সঙ্গে আক্রমণের চেষ্টা করে। গাছ তখন প্রতিরক্ষাকে আরো শক্তিশালী করে। গাছগুলো এটি ততক্ষণ করে যতক্ষণ তারা সংক্রমণের একটি সহনশীল অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে এবং রোগজীবাণুগুলো খুব সামান্য ক্ষতিই করতে পারে। জীবাণুকে সরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যান এবং প্রতিরক্ষাহীন গাছগুলোর মাঝে ছড়িয়ে দিন, দেখা যাবে মৃদু অণুজীবগুলোও ভয়ংকর হয়ে উঠছে এবং গোটা জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রতিটি জায়গা এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে এবং জনসচেতনতায় স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রকেই উদাহরণ হিসেবে নেয়া যাক: দেশটি দারুণ দর্শনীয় কাঠবাদাম গাছ হারিয়ে ফেলেছে, যা কিনা একসময় মাইনে থেকে আলবামা এবং পূর্ব উপকূল থেকে মিশিগান এবং দক্ষিণ ইলিয়ন অবধি দেখা যেত। যেভাবে এটি হারিয়ে যায় তাকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বাজে পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে। এ ঘাতককে ডাকা হয় চেস্টনাট ব্লাইট নামে। যা চীন ও জাপানের স্থানীয় ছত্রাক। আমেরিকার স্থানীয় কাঠবাদামগাছগুলোর মতো সংবেদনশীল গাছে এ ব্লাইট জীবন্ত টিস্যুগুলোকে মেরে ফেলে এবং এক পর্যায়ে পানি ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।
আপনি যেখানেই বাস করুন না কেন, গাছের কয়েকটি রোগ সম্পর্কে আপনি নিশ্চয় শুনে থাকবেন। সাইট্রাস গ্রিনিং কিংবা হুয়াংলংবিং, ব্যাকটেরিয়াল রোগ যা চালিত হয় পোকার মাধ্যমে। এর দ্বারা ফ্লোরিডার সাইট্রাস ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় ওকের আকস্মিক মৃত্যুর কারণ আরেকটি ফাইটোফোথারা রোগ যা র্যামোরাম ছত্রাক নামে পরিচিত। ওকের এ আকস্মিক মৃত্যু যুক্তরাজ্যেও পৌঁছে গেছে।
অস্ট্রেলিয়ায় এখন সর্বসাম্প্রতিক শিরোনাম হচ্ছে আতঙ্ক জাগানিয়া মাইরটাল রাস্ট, একটি ছত্রাকজাতীয় জীবাণু যা বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ করেছে এবং ২০১০ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসে হাজির হয়। এ রাস্ট গাছ ও ঝোপকে সংক্রমিত করে। অস্ট্রেলিয়ার ৩৫০টির বেশি প্রজাতির জন্য এটি হুমকিস্বরূপ। এখানে আসার কয়েক বছরের মাথায় এ রোগটি স্থানীয় পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। প্রচুর গাছ এখন অস্তিত্বের হুমকিতেও আছে।
বিশ্বায়নের আরো একটি প্রভাব
আরো একটু স্পষ্ট চিত্র পাওয়ার লক্ষ্যে দ্বারস্থ হতে হয়েছিল রয়াল বোটানিক গার্ডেনসের রিচার্ড বাগসের। যিনি উদ্ভিদের স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকে তাদের কীটপতঙ্গ ও রোগজীবাণু ভাগ করে নিচ্ছে। ইউরোপে এমন রোগজীবাণু রয়েছে যা কিনা আমেরিকা থেকে আগত এবং আমেরিকায় এমন জীবাণু আছে যা কিনা ইউরোপ থেকে এসেছে। এ রকম আদান-প্রদান চলছেই। বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হওয়ার আগ পর্যন্ত এগুলো অনির্ণেয় থেকে যাচ্ছে। প্রতি বছর এজন্য কোটি কোটি টাকার শস্য নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া পরিবেশগতভাবে যে ক্ষতি হচ্ছে তা নির্ণয় অযোগ্য।
পরিস্থিতি কীভাবে এত খারাপ হলো? এক শব্দে বলতে হলে কারণটি হলো ‘বিশ্বায়ন’। দ্রুততম সময়ে ভ্রমণ ও বাণিজ্যের গতিময় বিস্তার। যেখানে উদ্যান শিল্পের জন্য কোটি কোটি গাছ বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। যা কিনা শেষ বিচারে বেশ বিপর্যয়কারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
আকস্মিক আমদানির ঝুঁকি কমাতে বাণিজ্য নীতির বাইরে উদ্ভিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে হবে এবং বায়োসিকিউরিটির নীতিগুলো মজবুত করতে হবে। বাগস বলেন, কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতে আপনার সিস্টেম যতই ভালো হোক না কেন, কিছু বিষয় আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কীটপতঙ্গকে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। কিন্তু আণুবীক্ষণিক ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক শনাক্ত করা খুব শক্ত, কারণ সংক্রমিত উদ্ভিদ প্রায়ই কোনো লক্ষণ দেখায় না। অন্য প্রজাতির ওপর না আসা পর্যন্ত ভুলগুলো কখনো চোখেই পড়ে না।
গোটা বিষয়টিকে আরো খারাপ করে তুলেছে কিছু সম্ভাব্য গাছখেকো যারা কিনা এখন পর্যন্ত কোনো তালিকায়ই নেই: তারা অজানা ও অদেখা। সেসব শনাক্ত করাও এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়তো নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর মতো উদ্ভিদদের এ মহামারীতে শেষ পর্যন্ত ভুগতে হবে মানুষকেই।
স্মিথসোনিয়ান থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত





