মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি শিল্প-কারখানায়, বিশেষ করে রফতানির কাজে নিয়োজিত শিল্প-কারখানায় লকডাউন শিথিলের ব্যাপারে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাশের দেশ ভারতও তাদের নীতি আয়োগ বা কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা সাপেক্ষে বেশকিছু শিল্পাঞ্চলে সোমবার থেকে ধীরে ধীরে কর্মতত্পরতা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে জনবসতি থেকে দূরের শিল্পাঞ্চলগুলোকে এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।      

অর্থনীতির একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে আগেই ভাবছিলাম, প্রায় ১৮ কোটি লোকের দেশে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ গরিব বা হঠাৎ গরিবের মধ্যে কী প্রভাব পড়বে লকডাউন তুলে নিলে? অনেক লোক মারা পড়বে? সংখ্যাটা কত হতে পারে? আর লকডাউন না তুললে কর্মহীনতায়, অনাহারে-অর্ধাহারে কী পরিমাণ মরবে বা মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছবে?

অর্থনীতিতে আমরা সেন্সিটিভিটি অ্যানালাইসিস বা র্যাপিড ইম্প্যাক্ট অ্যানালাইসিস (রিয়া) পড়েছি। এমনকি বিশ্বব্যাংকের আনুকূল্যে একটি বৃহৎ ব্যবসায়ী সংগঠনের জন্য সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রভাব বিশ্লেষণের ওপর প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছিলাম। আমি নিশ্চিত, সরকার চাইলে তার নিজস্ব সংস্থাকে ব্যবহার করে একটি র্যাপিড ইম্প্যাক্ট অ্যানালাইসিস বা ত্বরিত সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখতে পারত বা হয়তো করেছেও।

অনেকে বেশ কিছুদিন ধরেই বলছিলেন, করোনা অভিঘাতে বাংলাদেশে জানমালের খুব ক্ষতি হবে না। কিন্তু লকডাউনের প্রভাবে অনেক লোক গরিব থেকে গরিবতর হয়ে পড়বে। ত্রাণের গাড়ি লুট, রিকশায় চড়ে বাজার থেকে বাড়ি ফেরতরত মহিলার বাজারসামগ্রী ছিনিয়ে নেয়া দেখে অনেকেই সন্দেহ করছেন লকডাউন বেশিদিন চললে চুরি-সন্ত্রাসের সমস্যা আরো অনেক গুণ বাড়বে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিরাট অবনতি হবে। ভিক্ষুকে শহর-নগর ভরে যাবে। কেউ কেউ আবার বলছেন, ১৮ কোটির দেশে হোক না ৫ হাজার লোক আক্রান্ত আর ৫০০ লোক মৃত (যদিও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেন না), দেশে তো এমনিতেই সড়ক দুর্ঘটনায় দিনে ২০-৩০ জন মারা যায়। লকডাউন বেশিদিন চললে তো ক্ষতি আরো অনেক অনেক গুণ বাড়বে। অন্যদিকে লকডাউন তুলে নিলে অর্থনীতিতে, বিশেষ করে উৎপাদন ব্যবস্থায়, কর্মচাঞ্চল্য এলে মানুষ অনেক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। আমাদের খাদ্যের বা পণ্যের অভাব নেই, সমস্যা সরবরাহ ব্যবস্থা আর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে। ত্রাণের টাকা হোক আর নিজের আয় হোক, টাকা এলেই বিক্রি বৃদ্ধি পাবে।  

আমাদের অর্থনীতিবিদ ভাই-বোনেরা দেখছি প্রতিনিয়ত সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করছেন, অর্থনীতিতে টাকা ঢেলে, কেউ কেউ আবার চাহিদা হ্রাস আর মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েও টাকা ছাপিয়ে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার কথা বলছেন। সুষ্ঠু ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করছেন, এনজিওদের ত্রাণ বিতরণে সম্পৃক্ত করার কথা বলছেন। প্রয়োজনে তাদের কেউ কেউ এই প্রভাব বিশ্লেষণের কাজটিতেও হাত দিতে পারতেন। তবে সবাই যেন সবকিছু সরকার তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

ভারতের বিশ্লেষণের আলোকে আমিও ভাবছি, বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। তবে সেটা হবে শুধু জনবসতি থেকে দূরের শিল্পাঞ্চলে, ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহন নিশ্চিত করা সাপেক্ষে।

সংকট যেমন মানুষকে অনেক সময় দিশেহারা করে ফেলে, তেমনি অনেক ‘বিয়ন্ড দ্য বক্স’ বা গতানুগতিকতার বাইরের চিন্তারও খোরাক জোগায়। ১৯৩০, ২০০৮-এর সংকট সমাধানের অভিজ্ঞতা ২০২০-এর সংকট সমাধানে খুব কাজ করবে না, সেটা অনেকেই বলছেন। অভিনব সময়, তাই অভিনব বিশ্লেষণেরও দাবি রাখে। সেজন্যই জানমালের ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রেখে আমাদের অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনার প্রতিটি সম্ভাব্য উদ্যোগকেই বিবেচনায় নিতে হবে।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক