বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত রোববার বিশ্বব্যাপী ২ লাখ ৩০ হাজার কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা বলেছে। যা কিনা মহামারীকালে দৈনিক হিসেবে সর্বোচ্চ। সংক্রমণের এ উত্থান বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোকে নতুন করে লকডাউন ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করেছে।
এ তালিকায় মেলবোর্নও আছে। যারা দ্বিতীয় ঝড় আঘাত হানার পর নতুন করে ছয় সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করেছে। অবশ্য মেলবোর্নই একমাত্র শহর নয় যারা দ্বিতীয় ঝড়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। বেইজিং ও লেস্টারের মতো শহরও কভিড-১৯ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছিল। তবে প্রাদুর্ভাব ফিরে এলে তাদের আবারো নতুন করে এসব বিধিনিষেধ বলবৎ করতে হয়েছে।
তাহলে শহরগুলো কীভাবে তাদের দ্বিতীয় লকডাউন ফিরিয়ে এনেছে এবং এই ব্যবস্থাগুলো কভিড-১৯-এর পুনরুত্থান মোকাবেলায় কতটা কার্যকর? কয়েকটি উদহারণ থেকে বিষয়টি দেখা যেতে পারে।
লকডাউন ফিরে আসা
যদিও লকডাউনের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে এটা মূলত নিজেদের সমাজের মাঝে জনগণের চলাচলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার কর্তৃক আরোপ করা বিধিনিষেধকে বোঝায়। এটি প্রায়ই পুলিশের উপস্থিতি এবং জনস্বাস্থ্যের বিধিবিধান একসঙ্গে প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এটি প্রয়োগ করা যেতে পারে আংশিকভাবে, কিংবা সম্পূর্ণরূপে। আর ‘হার্ড লকডাউন’ শব্দটি তখন প্রয়োগ করা হয় যখন একটি বিল্ডিং কিংবা ভৌগোলিক অঞ্চলে প্রবেশ এবং বের হওয়ার স্বাধীনতা পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ কিংবা সীমাবদ্ধ থাকে।
কভিড-১৯ রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি বৃদ্ধি পেলে স্পেনের কাতালোনিয়া অঞ্চলের সের্জিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য ৪ জুলাই আংশিক লকডাউনে প্রবেশ করেছে।
যুক্তরাজ্যের শহর লেস্টার দ্বিতীয় লডকাউনে প্রবেশ করে জুনের শেষ দিকে দেশের সব কভিড-১৯ সংক্রমণের সংখ্যায় ১০ শতাংশ যুক্ত হওয়ার পর। দুই সপ্তাহ ধরে শহরটি লকডাউনে আছে, তার পরও সর্বশেষ ডাটা বলছে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে।
বেইজিংয়ে দ্বিতীয় ঝড় মোকাবেলা করা হয়েছিল লকডাউনের মাত্রা বাড়িয়ে। কঠোর পদক্ষেপটি উচ্চঝুঁকিসম্পন্ন কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। তাদের চারপাশ ঘিরে আলগা লকডাউনের একটি রিংও তৈরি করা হয়েছিল। এসবের পাশাপাশি বিস্তৃতভাবে পরীক্ষার ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে দৈনিক হিসাবে তিন লাখ টেস্ট করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়া সফলতা নিয়ে এসেছিল। কারণ এর ফলে ৭ জুলাই দেশে কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা নেমে এসেছিল শূন্যে।
দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে লকডাউনের বিধিনিষেধ ফের ক্রমবর্ধমান হারে ফিরে এলেও একমাত্র বেইজিং ছাড়া অন্য কোথাও দ্বিতীয় লকডাউন সফল হওয়ার উদাহরণ নেই। তাই এখনই এটা নিয়ে কিছু বলা কঠিন।
জনস্বাস্থ্য বার্তা
দ্বিতীয় লকডাউনে প্রবেশের সময় প্রথম লকডাউন থেকে শিক্ষা নেয়া কার্যকর বিবেচিত হতে পারে। যদি জনস্বাস্থ্য বার্তা ও প্রয়োগে ত্রুটি থাকে তাহলে কী হতে পারে প্রাথমিকভাবে ইতালি ও ভারতের লকডাউন আমাদের সে বার্তা দেয়।
ইতালিয়ান প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়া এবং ডিক্রিতে স্বাক্ষর করার একদিন আগে দেশের অভ্যন্তরীণ বিধিনিষেধ সম্পর্কে তথ্য দেয় দেশটির মিডিয়া। সে সময় কেবল ইতালির উত্তরাঞ্চল ব্যাপকভাবে কভিড-১৯ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা যাদের অনেকেই ভাইরাস বহন করছিল, তারা দেশের নানা অঞ্চলে ঘরে ফেরার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করে। ট্রেন স্টেশনগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। যদিও লক্ষ্য ছিল ভাইরাসের গতিকে রোধ করা, কিন্তু এর ফল হয় সম্পূর্ণ উল্টো। অল্প সময় পরেই দেখা গেল দক্ষিণ ইতালিতে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হতে থাকল। বিশেষ করে যেসব পরিবারের ছাত্ররা উত্তরাঞ্চল থেকে ফিরে এসেছিল তাদের পরিবারেই আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দেখা গেল।
ভারতের পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যেও একই রকম উদ্বেগ দেখা গেছে, যখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লকডাউন শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে নোটিস দিয়েছিলেন। ভারতের লকডাউনকে ‘দর্শনীয় ব্যর্থতা’ আখ্যা দেয়ার এটি অন্যতম একটি কারণ।
লকডাউন, রিল্যাক্স, লকডাউন, রিল্যাক্স
একটি লকডাউনের পরও যতদিন ভ্যাকসিন আসবে না জনগণের বৃহৎ একটি অংশের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই বিধিনিষেধ শিথিল হলে সংক্রমণের সংখ্যাও আবার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। যে প্যাটার্নে এটি চালিত হয় তা হলো লকডাউন, রিল্যাক্স, পুনরায় লকডাউন।
তাহলে কেন সরকারগুলো কেবল ভাইরাস দূর করাকে লক্ষ্যে রাখতে পারে না? ভাইরাস দূর করতে হলে প্রয়োজন কঠোর ও নিবিড় লকডাউন। স্থানীয় ও বাইরে থেকে আগত সংক্রমণকে উত্খাত করতে যা দরকার তা হলো দেশের ভেতরের ও বাইরের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া।
ভাইরাস দূরীকরণের কৌশল কাজ করেছে কেবল কয়েকটি দেশ ও অঞ্চলে। যেমন নিউজিল্যান্ড। যারা শুরুতেই কঠোর লকডাউন নীতি অবলম্বন করেছিল। তবে লকডাউনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে পুনারায় বিধিনিষেধ ফিরিয়ে আনার ফলে জনগণের মাঝে ক্লান্তি বেড়ে যাওয়ার কারণে।
এছাড়া লকডাউনের কতগুলো মারাত্মক প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর পড়া তীব্র প্রভাবও রয়েছে। যেমন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জেন ক্যাসটেক্স আরেকটি লকডাউনের সম্ভাবনা বাতিল করেছেন এটা বলে যে লকডাউন অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক থেকে ভয়াবহ ফলাফল বয়ে নিয়ে আসবে।
মাস্কের ব্যবহার
এটা স্পষ্ট যে লকডাউন অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল রাখা যায় না। যে কারণে কভিড-১৯ থেকে মুক্তিলাভের জন্য ওষুধের পাশাপাশি হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য দ্রুত কার্যকর ভ্যাকসিন প্রয়োজন।
তাহলে মেলবোর্নের লকডাউন কতদিন পর্যন্ত চলবে? দ্য গ্রাটান ইনস্টিটিউট যুক্তি দেখিয়ে বলছে, সমাজে কভিড-১৯-এ সক্রিয় সংক্রমণের সংখ্যা শূন্যে নেমে না আসা পর্যন্ত লকডাউন চালিয়ে যেতে হবে এবং তার পরও আরো দুই সপ্তাহ পর্যন্ত এটি বলবৎ রাখা উচিত।
তবে অন্য একটি দল যুক্তি দেখিয়ে বলছে, ফেস মাস্কের সার্বজনীন ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লকডাউনের সময়কাল অর্ধেক করা যেতে পারে। মাস্কের ব্যবহার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দেয়।
স্ক্রলডটইন





