অনেক দিন ধরেই মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অনেক কাজ করে আসছে রোবট। নিউক্লিয়ার সাইট পরিষ্কার করা, ভেতর থেকে পাইপলাইনগুলো পর্যবেক্ষণ এবং মঙ্গলের হিমশীতল বর্জ্য অন্বেষণও এর অন্তর্ভুক্ত। তবে করোনাভাইরাসের আগমন অনেক পরিচিত বিষয়-আশয় বদলে দিয়েছে। যেমন মুদি দোকান ও হাসপাতালের মতো জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে রূপ নিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার লেখক ও সাংবাদিক এরিকা হায়াসাকি বলেন, এই মহামারী অনেক সংস্থার সামনের সারির কর্মীদের সহায়তার জন্য অটোমেশন পরিকল্পনায় বাড়তি গতি নিয়ে এসেছে।

এক সাক্ষাত্কারে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসের অটোমেশন কোম্পানিগুলোর চাহিদা পূরণে হিমশিম খাওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। এমআইটি টেকনোলজি রিভিউর পক্ষে সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন ওয়েড রাশ।

ওয়েড রাশ: ২০১৯ সালের বিবিসির একটি ক্লিপ বলছে, দ্রুতই লাখো চাকরিতে মানুষের পরিবর্তে রোবট নিয়োগ দেয়া হবে। তবে রোবট এখন উৎপাদন কাজের বাইরে নতুন ধরনের কর্মক্ষেত্র যেমন হাসপাতাল ও মুদি দোকানেও কাজ শুরু করেছে। কিন্তু করোনাভাইরাস আঘাত হানার পর এ প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে রোবট যদি হাসপাতালে মেডিকেল ফ্রন্টলাইনার হিসেবে কাজ করে, তবে মানুষের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।

এরিকা হায়াসাকি: এই আলাপ কিছুদিন ধরে চলমান ছিল। কিন্তু মহামারী সেটাকে আরেকটু এগিয়ে দিয়েছে। যেমন মোক্সি নামের রোবট এরই মধ্যে হাসপাতালে কাজ করছে। এখন তাদের পরিকল্পনা ভবিষ্যতে চোখ রেখে এগিয়ে যাওয়া এবং কভিড যা শেখাচ্ছে তার থেকে শিক্ষা নেয়া।

আমার মনে হয় প্রশ্নটা হচ্ছে কখন রোবট এগিয়ে এসে মানুষের জায়গা নেবে? কখন আমরা রোবটের ওপর অনেক বেশি আস্থা রাখব? এই মহামারী এ রকম অনেক আলাপকে আরো এগিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি বরং নতুন আলাপকেও উসকে দিয়েছে যে রোবট আসলে আমাদের নিরাপদ রাখার জন্য কতটা সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে কভিড-১৯-এর মাঝামাঝি সময়ে এসে স্যানিটাইজিং থেকে শুরু করে হাসপাতাল কিংবা মুদি দোকানের কাজের দিকে তাকানো যেতে পারে। হ্যাঁ, অবশ্যই মানুষের কাজের ক্ষেত্রে কী হবে এবং কেমন প্রভাব পড়বে, সে প্রশ্নও চলে আসে।

ওয়েড: কোন বিষয়টি আপনাকে এক্ষেত্রে আগ্রহী করে তুলেছে?

এরিকা: মহামারীর আগে থেকেই আমি রোবোটিকস নিয়ে গবেষণা করে আসছিলাম এবং অ্যামাজানের গুদামে যাওয়ার সুযোগও হয়েছিল আমার। কভিড আঘাত হানার আগে আমি বেশ কয়েকটি গুদামে গিয়েছিলাম। আমি রোবট নিয়ে আগ্রহী ছিলাম এবং আমি দেখতে চাচ্ছিলাম রোবট কীভাবে কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয় এবং তারা কতটা দক্ষভাবে কাজ করতে পারে? পশাপাশি এটা কি আসলেই মানুষের চাকরির ক্ষেত্রে হুমকি হতে পারে কিনা, তাও আমি দেখতে চাচ্ছিলাম। এরপর কভিড এল। দেখলাম হাসপাতালে এবং এই পরিস্থিতিতে নার্সদের নিরাপত্তা কতটা হুমকিতে। তাদের যে কাজ তা তাদের বিপদের মাঝে ফেলে দিয়েছে।

ওয়েড: কিন্তু হাসপাতালই একমাত্র জায়গা নয়, যেখানে ভাইরাস ছড়াতে পারে। বর্তমানে মুদি দোকানগুলোও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানেও  রোবট দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালে কাজ করলেও তাদের সম্ভবত কভিড-১৯-এর ওয়ার্ডে দেখা যাচ্ছে না। সেখানে তারা কী ধরনের কাজ করছে?

এরিকা: তারা প্রাথমিকভাবে জিনিসপত্র সরবরাহের কাজ করছে। আপনি জানেন, ওষুধপত্র এবং অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী তারা সরবরাহ করছে। এটা মূলত সেই প্রাথমিক বিষয়গুলোর একটি, যা ডিজাইনাররা নার্সদের বিকল্প হিসেবে ভেবেছেন। এই যেমন আপনি হাসপাতালের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। আপনি জানেস অনেকটা সময় বাঁচাতে পারতেন যদি কাজ করার জন্য ব্যক্তি হিসেবে এই দৌড়াদৌড়িটুকু আপনাকে করতে না হতো। সেক্ষেত্রে আপনি রোগীর সঙ্গে অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে পারতেন। তাই এ ধরনের অনেক কাজ মোক্সি করছে। বিভিন্ন জিনিসপত্র সরবরাহের কাজ সে করে চলেছে। এখন কভিড আসার পর মোক্সি হয়তো কভিড ওয়ার্ডে কাজ করছে না, কিন্তু তারা বেশ যত্নশীল। কিন্তু যেসব হাসপাতালে কভিড রোগী আছে সেখানে তাদের দায়িত্ব বেড়েছে। যেমন তারা প্রচুর পিপিই, মাস্ক ও গ্লাভস সরবরাহ করছে। কিন্তু এটাও আলোচনার বিষয় যে কভিড-পরবর্তী সময়ে মোক্সি আরো কী কী করতে পারে।

ওয়েড: মহামারী কাজের জায়গার পরিচ্ছন্নতা এবং বিপদের ধরনে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে?

এরিকা: যারা রোবোটিকসের কথা ভাবছে তারা আসলে ভাবছে রোবটকে কীভাবে স্যানিটাইজের কাজে লাগানো যায়। তারা ভাবছে রোবটকে দিয়ে হাসপাতাল পরিষ্কার করা এবং মানব বর্জ্য সরানোর ব্যাপারেও।

ওয়েড: একদিকে আপনি ভাবছেন প্রতিটি নিরস, নোংরা ও বিপজ্জনক কাজ যা মানুষ করে তা রোবটকে দিয়ে দেয়ার কথা। বিশেষ করে যখন তা মানুষকে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করবে কিংবা সাহায্য করবে মহামারী ছড়ানোর গতিকে শ্লথ করতে। কিন্তু আপনার আর্টিকেলে আপনি আরো কয়েক স্তর গভীরে প্রবেশ করেছেন। আপনি যা বলেছেন তা অনেকটা এ রকম শোনায় যে মোক্সি প্রস্তুতকারকরা এ ভয় নিয়ে খুব সচেতন যে তাদের প্রযুক্তি মানুষের চাকরির জন্য হুমকি হতে পারে।

এরিকা: তারা আমাকে বলেছে, যখন তারা গবেষণা শুরু করে তারা সে সময় প্রচুর স্বাস্থ্যকর্মীর সাক্ষাত্কার নিয়েছে। জিজ্ঞেস করেছে, তাদের কী প্রয়োজন। তারা পরে প্রচুর প্রশ্ন করেছে। তাদের প্রশ্ন ছিল এ রকম, ‘আপনারা কি এমন কিছু বানাচ্ছেন যা আমাদের চাকরি নিয়ে নেবে?’ পরে কোম্পানি উত্তর দেয়, তাদের তেমন কোনো উদ্দেশ্য নেই। বরং তারা এমন রোবট তৈরি করতে চায়, যা কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। যা হচ্ছে তা হলো মোক্সি নার্সদের কাজ করছে না। তারা কভিড রোগীদের হাত ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছে না এবং কথা বলছে না। এটা স্পষ্ট হচ্ছে রোবট মানুষের জায়গা নিতে পারে না, যার কিনা সমবেদনা জানানোর এবং কথা বলার ক্ষমতা আছে। তাই মোক্সি হাসপাতালে নার্সদের কাজ নিয়ে নেবে, এমন দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।

এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ