(পূর্ব প্রকাশের পর)

মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (এমএসএমই)

এমএসএমই উপখাত করোনায় বিষাক্ত অর্থনীতিতে সুস্থ সজীব করতে টনিক হিসেবে কাজ করবে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি সৃষ্টিতে এ উপখাত শতকরা ৬৩-৬৫ ভাগ অবদান রাখে। বাংলাদেশে এটি শতকরা ২০ ভাগ (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) থেকে শতকরা ৩৩ ভাগ (প্ল্যানিং কমিশন) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা আছে এক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ব্যাংক শতকরা ৪ ভাগ হার সুদে ১০ হাজার কোটি টাকার (পুরোটা ২০ হাজার নয় কেন?) পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এটি আবর্তিক হোক এবং খেলাপিদের রাক্ষুসী ক্ষুধার নাগাল থেকে দূরে থাক। তবে সাংগঠনিক, জনবলিক, আর্থিক ও প্রক্রিয়াজাতিক ক্ষমতায়নে ২৩ লাখ এমএসএমই প্রতিষ্ঠান থেকে সেরা এক লাখ উদ্যোক্তা চয়ন করে করোনার ক্ষতিগ্রস্ততা তথা বৈখাখী বাজার না পাওয়া এবং ঈদুল ফিতরের বাজার অর্ধেক পাওয়ার আশঙ্কাই কাটিয়ে বিপুল উত্থান ঘটানো যেতে পারে। এক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফ জরুরি ভিত্তিতে নীতি কৌশল ও কর্মকাণ্ড নির্ধারণে সুপারিশ করতে পারে। এমএসএমই পারে দারিদ্র্য নির্মূল ও বৈষম্য হ্রাসে বিপুল অবদান রাখতে। কারণ এখানে সুরক্ষাসহ কর্মসংস্থান তথা আয়-রোজগারের ব্যবস্থা হয়।

বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের পুনর্জাগরণ

প্রায় সবক’টি তৈরি পোশাক কারখানা বোধ হয় খুলে গেছে। শ্রমিকদের বেতন নিয়ে অসন্তোষ রয়েই গেছে—হচ্ছে হরতাল। সরকার শতকরা ২ ভাগ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা এ বাবদেই ঋণ দিয়েছে। মালিকদেরও নড়ানো-চড়ানো হোক। কারখানায় স্বাস্থ্যসম্মত বিধিবিধানে কড়াকড়ি করতেই হবে।

তৈরি পোশাক ও নিট আয়ের নাকি বড় বড় অর্ডার ধরে রাখার জন্যই পোশাক কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। ভালো কথা, তবে প্রতিযোগী ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার সজ্ঞান মুদ্রা অবমূল্যায়নের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে বাংলাদেশেও অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে হবে। যতদূর সম্ভব এখনই উদ্যোগ নিয়ে বস্ত্র শিল্পে বড় বিনিয়োগ উৎসাহিত করে প্রতি বছর যে ৬০০ কোটি টাকার বস্ত্র আমদানি করা হয় তা কমাতে হবে। সফল ও দক্ষ পোশাক উৎপাদনকারীদের বেশি বেশি করে ইন্টিগ্রেশনে যেতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। চামড়া ও পাদুকা শিল্প, কৃষিনির্ভর শিল্প, খেলাধুলার সরঞ্জাম, সাইকেল, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাকার শিল্পের প্রণোদনা প্যাকেজ পুনর্বিবেচনা করে বাড়ানো যায়।

বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই সতর্ক নজরদারি করতে হবে, যাতে এ সাশ্রয়ী সুদের অর্থ খেলাপিদের পেটে চলে না যায়। প্রথমেই স্বঘোঘিত ঋণখেলাপি অর্থাৎ শতকরা ২ ভাগ ডাউনপেমেন্টে যারা ঋণ পুন:তফসিল করেছেন, তাদের বাদ দিতে হবে। এ ঋণে যেন যারা কখনো ঋণ পুনঃতফসিল করেননি তারা প্রথম অগ্রাধিকার পান, একবার মাত্র পুনঃতফসিলকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় অগ্রাধিকারে থাকবে। অন্য কাউকে এ ঋণ না দেয়াই শ্রেয় হবে।

বাজেট ২০১৯-২০

চলমান অর্থবছরের মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত নিয়ে গেলে ভালো ছিল। সদাশয় সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করছে এরই মধ্যে। রাজস্ব আয়ের বিশাল ঘাটতি আর করোনা পর্যুদস্ত অর্থনীতির পুনরুত্থানের বিবেচনাই বাজেট প্রণীত হতে হবে। বাজেট ঘাটতি যেন কোনো অবস্থায়ই জিডিপির শতকরা ৬ ভাগের বেশি না হয়। সম্প্রসারণশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেফজুল খরচাদি চিহ্নিত করে তা কমাতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনায় ব্যাপকভাবে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প লহরী বাতিল বা অন্ততপক্ষে স্থগিত করা যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্প্রতিকালে যে সাফল্য অর্জন করেছে তার আলোকে করোনার আঘাতকে কাটিয়ে উঠতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ দেনদরবার করে বাড়তি সহজ শর্তে ঋণ নেয়ার চেষ্টা করা জরুরি। সিআরআর এরই মধ্যে শূন্য দশমিক ৫ হারে কমানো হয়ে গেছে। ক্রেডিট ডিপোজিট রেশিও, সিডিআরও শূন্য দশমিক ৮৫ থেকে শূন্য দশমিক ৮৭-তে বাড়ানো হয়ে গেছে। এ দুটো সূচক অর্থনীতির সুস্বাস্থ্য ও মজবুত স্তম্ভের নিয়ামক। আর নমনীয়তা মোটেও কাম্য নয়। বরং সিআরআরে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত এবং প্রতিটি তফসিলি ব্যাংকে যে নিজস্ব রিজার্ভ রাখা হয়, প্রয়োজনবোধে সেখান থেকে তাত্ক্ষণিক তারল্য ঘাটতি মেটানো যেতে পারে। সংকট দেখা দিলে না হয় নোট ছাপানো যাবে।

অর্থবছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর মেয়াদে না হওয়ার কোনো যুক্তি আমাকে কেউ দিতে পারেননি। আবার সোম-শুক্র পাঁচদিন ৩৫ ঘণ্টার কর্ম সপ্তাহের বিরুদ্ধেও যুক্তিগ্রাহ্য আপত্তি দেখি না। দ্বিধাটা কোথায়।

অপরিশোধিত আয় ও কালো টাকা

নীতিবিবর্জিত হলেও বর্তমান ক্রান্তিকালে অপ্রদর্শিত (সরকারের নীতির কারণে সৃষ্ট) এবং কালো টাকাকে মূলধারায় আনার জন্য শুধু ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বিশেষ ছাড় দেয়া যেতে পারে। আয়করের স্তরগুলো নিম্নোক্তভাবে পুনর্বিন্যাস করা যায়:

করযোগ্য আয়                          প্রস্তাবিত করহার

১. ২,৫০,০০০                                       %

মুক্তিযোদ্ধ, নারী ও প্রবীণদের জন্য বিশেষ স্তর চলমান থাকবে।

২. তদূর্ধ্ব          ৭,৫০,০০০                   ০৫%

৩. তদূর্ধ্ব          ১০,০০,০০০                 ১০%

৪. তদূর্ধ্ব          ২০,০০,০০০                 ১৫%

৫. তদূর্ধ্ব          ২০,০০,০০০                 ২০%

৬. তদূর্ধ্ব          যেকোনো পরিমাণ        ২৫%

অনুরূপভাবে শুধু ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য করপোরেট করহারগুলোর সস্পষ্ট পুনর্বিন্যাস করা যায় (ওপরের হারে নয়)।

শুধু ২০২০-২১ সালের আয়ের জন্য উৎস জিজ্ঞাসা করা হবে না। তবে ৩০-০৬-২০২১-এর পর যদি কারো কাছে কালো টাকা পাওয়া যায়, তবে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই পুনরুত্থান ঘটবে। লক্ষণ সুস্পষ্ট, দ্য ইকোনমিস্ট মাত্রই বলেছে, করোনায় লন্ডভন্ড ৬৬টি অগ্রসরমাণ দেশের অর্থনীতির শক্তিমত্তায় বাংলাদেশ নবম স্থানে রয়েছে। পেছনে চীন, ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান।

 

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য

অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী