কভিড-১৯-এ বিভিন্ন দেশের সাড়া দেয়ার ওপর ভিত্তি করে দেশ চালানোর সেরা উপায় কোনটি সে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। সেই সঙ্গে কোন ধরনের সরকার কভিড-১৯-এর সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে উত্তম, সেটিও আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই মহামারীর বেশ আগে স্টেফান হালপার একটি বই লিখেছিলেন, ‘দ্য বেইজিং কনসেনসাস হাউ চায়না’স অথরিটারিয়ান মডেল উইল ডমিনেট দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’। যেখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে বিশ্বে চীন সরকার কীভাবে মার্কিন সরকারের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে সেটি। হালপার বলেন, নৈতিকতার বাধ্যবাধকতা ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যুক্ত করার চীনের যে আগ্রহ তা অনেক দেশকে তাদের বাজারের কর্তৃত্ববাদী মডেল গ্রহণ করার দিকে চালিত করেছে।

মহামারী চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পার্থক্যকে এক ধরনের নিষ্কৃতি দিয়েছে। চীন শুরুতে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে কর্তৃত্ববাদী উপায়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে তারা খবর প্রচারে বাধা দিয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে খারাপ খবর না দেয়ার জন্য তারা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়। তবে যুক্ত হওয়ার পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্তমূলক এবং কার্যকরভাবে কাজ করছিল। এর ফলে ভাইরাসের কারণে ৪৬ মিলিয়ন মানুষ লকডাউনে পড়ে। ১৬টি শহরকে কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয়। এরপর শুরু হয় বিস্তৃত টেস্টিং ও কন্টাক্ট ট্রেসিং। চীনের দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া সীমান্তের অধীনে বড় ধরনের বিপর্যয় কাটানোর পথে ভূমিকা রেখেছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিতর্ক সৃষ্টি করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ভুগতে হচ্ছে কারণ চীন ভাইরাস সম্পর্কে তাদের সঠিক তথ্য দেয়নি। যদিও ভাইরাস সম্পর্কে হোয়াইট হাউজ জানুয়ারিতেই জেনেছিল। ট্রাম্পকে মহামারীর ব্যাপারে তার উপদেষ্টা পিটার নাভারো এবং ইউএস ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি সতর্ক করেছিলেন। তবুও মার্কিন প্রেসিডেন্ট এটিকে ঝুঁকি হিসেবে নেননি এবং দুই মাস ধরে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেননি। একটি গবেষণা বলছে, অন্তত এক সপ্তাহ আগে যদি যুক্তরাষ্ট্র লকডাউনে যেত, তাহলে ৩৬ হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো যেত।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কভিড-১৯-এ সাড়া দেয়ার ওপর ভিত্তি করে এ দুটি দেশ নিয়ে এক ধরনের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। এখন ওয়াশিংটন মডেল বনাম বেইজিং মডেলের  কার্যকারিতা নিয়ে যে বিতর্ক, তা তৃতীয় একটি মডেলের অস্তিত্বকে আড়াল করে। এই তৃতীয় মডেলের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে নিউজিল্যান্ড। একাধিক জাতীয় নির্বাচনের পর যে দলটি সংসদের দখল নেয়, সেটি গোটা দেশে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কম ভোট পেয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের ভোটের যে পদ্ধতি, তা সংসদীয় আসনগুলোকে অনেক বেশি আনুপাতিক উপায়ে ভাগ করে, যা ছোট দলগুলোকে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়।

এরই মধ্যে দক্ষ যোগাযোগকারী নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরর্ডান উন্মুক্ততা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং সহানুভূতিশীলতা দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে বেশ সম্মানিত হয়ে  উঠেছেন। কভিড-১৯ মোকাবেলায় আরর্ডান কঠোর লকডাউ নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন যোগাযোগের দক্ষতা, সবাই যখন মেডিকেল কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করছিল। কর্মকর্তারা যেমন নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করছিলেন, তেমনি সরকারের ওপর জনগণের আস্থাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাই তারা সব নির্দেশনা মেনে চলল। ফলে মাত্র ২১টি মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নিউজিল্যান্ড তাদের লকডাউন তুলে দিয়েছে।

আরো কিছু দেশ এ উপায় অবলম্বন করে মহামারী মোকাবেলার চেষ্টা করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ অস্ট্রেলিয়াও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির সরকারও করোনা মোকাবেলা করে জনসমর্থন অর্জন করেছে। তবে সবার ওপর এখন অবস্থান করছে নিউজিল্যান্ড, যা হয়তো এখন নিউ সম্মতি (কনসেনসাস) হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। দ্য ডিপ্লোমেট