গত নয় মাসে সারা বিশ্বে নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে ৩ কোটি ৪৪ লাখ মানুষ, যা থেকে মারা গেছে ১০ লাখের ওপরে। সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও দমন করা যাচ্ছে না এ মহামারীর বিস্তারকে। মহামারীর কেন্দ্র বা এপিসেন্টারটি এখন দক্ষিণ এশিয়ায়। পড়শি দেশ ভারত করোনায় সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। গত ছয় মাসে ওখানে মারা গেছে প্রায় ৯৮ হাজার এবং প্রতিদিন নতুন সংক্রমণের দিক দিয়ে ভারত এখন বিশ্বে প্রথম। মোট আক্রান্তের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। ইউরোপে মহামারীর প্রথম ওয়েভ শেষ না হতেই হেমন্তের শুরুতেই দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। এমতাবস্থায় করোনা সংক্রমণ দমনের জন্য একটা কার্যকর ভ্যাকসিন অপরিহার্য।

আশা জাগানো গ্লোবের ভ্যাকসিন?

গতকাল ৩০ সেপ্টেম্বর গ্লোব বায়োটেক তাদের করোনা ভ্যাকসিন ব্যানকোভিডের প্রি-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে প্রি-প্রিন্ট সার্ভার মেডআরএক্সিভে (সবফজীরা)। গবেষণাপত্রটি এখনো পিয়ার রিভিউড হয়নি। কোন বৈজ্ঞানিক ফলাফল পিয়ার রিভিউয়ের আগে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত তা হলফ করে বলা যায় না। তবে আশা করা যায়, অচিরেই হয়তো এ পেপারটি কোনো বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হবে।

গ্লোবের ‘ব্যানকোভিড’ ভ্যাকসিনটি মূলত একটি এমআরএনএ ভ্যাকসিন। এ ধরনের ভ্যাকসিন তৈরি করছে মডার্না ও বায়োন্টেক/ফাইজার। তাদের ভ্যাকসিন দুটো এখন ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে এবং এখন পর্যন্ত বেশ ভালো ফলাফল দেখিয়েছে। সেই হিসাবে আশা করা যায় গ্লোবের ভ্যাকসিনটিও হয়তো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আশানুরূপ ফলাফল দেখাবে। গ্লোবের ভ্যাকসনটি একটি এমআরএনএ ভ্যাকসিন হলেও জিনের সিকোয়েন্সগত দিক দিয়ে এটা মডার্না বা ফাইজারের ভ্যাকসিন থেকে অনেকটা আলাদা।

গ্লোবের ভ্যাকসিনটির ডিজাইন করা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের করোনাভাইরাসের ডি-৬১৪-জি (উ৬১৪)ে মিউটেশনের দিক বিবেচনা করে। এ মিউটেশনের ফলে ভাইরাসটির স্পাইক প্রোটিনে একটি অ্যামাইনো অ্যাসিডের পরিবর্তন হয়, যার ফলে স্পাইক প্রোটিনেও ত্রিমাত্রিক গঠনগত কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। আর এ পরিবর্তনের ফলে ভাইরাসটির দ্রুত বিস্তারের সক্ষমতা পরিলক্ষিত হয়। এ মিউটেশনের ভাইরাসটিই এখন বাংলাদেশসহ সাড়া পৃথিবীতে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। বস্তুত বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ওয়েভের প্রায় শতভাগ সংক্রমণই ঘটছে এ নতুন মিউটেটেড ভাইরাস দিয়ে। সেদিক বিচারে গ্লোবের ভ্যাকসিনটির ডিজাইন অতুলনীয় এবং যা হতে পারে অত্যধিক কার্যকর। ডি-৬১৪-জি মিউটেশন ছাড়াও তারা তাদের ভ্যাকসিনে স্পাইক প্রোটিনের আরো দুটো মিউটেশন সিকোয়েন্স অন্তর্ভুক্ত করেছে। গ্লোবের ভাষ্যমতে মডার্না, ফাইজার বা ভ্যাকসিন দৌড়ে এগোনো অন্যান্য কোম্পানি তাদের স্পাইক প্রোটিনের সিকোয়েন্স ডিজাইনে এ ধরনের মিউটেশন অন্তর্ভুক্ত করেনি। সেদিক দিয়ে অন্তত তত্ত্বগতভাবে সেকেন্ড ওয়েভের করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গ্লোবের ব্যানকোভিড ভ্যাকসিনটি হতে পারে এক মোক্ষম হাতিয়ার!

গ্লোব বায়োটেক তাদের ভ্যাকসিনটির প্রি-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালায় ৩০টি ইঁদুরের ওপর। মোটাদাগে বলা যায় যে তাদের পরীক্ষাটি সফল এবং ভ্যাকসিনটি ইঁদুরের শরীরে ইমিউন রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ভ্যাকসিনটি প্রয়োগের ৭-১৪ দিনের ভেতরে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের বিপরীতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, যা লাবরেটরিতে উৎপাদিত সিউডো-করোনাভাইসকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। এছাড়া ভ্যাকসিনটি ইঁদুরের শরীরে টি-সেল রেসপন্সও ঘটিয়েছে, যা বেশ ভালো একটা দিক। তবে এক্ষেত্রে টি-সেল রেসপন্স দেখা গেছে শুধু সিডি-৪ হেল্পার টি-সেলে। সিডি-৮ টি-সেলে কোনো প্রকার রেসপন্স ঘটাতে পারেনি। সিডি-৮ টি-সেল ভাইরাস ইমিউনিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। এছাড়া দেখা গেছে ভ্যাকসিন উজ্জীবিত সিডি-৪ হেল্পার টি-সেল ইন্টারলিউকিন-২ ও ৬ এবং টিএনএফ-আলফাসমৃদ্ধ হলেও তা গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ইমিউন প্রোটিন ইন্টারফেরন-গামা তৈরি করতে পারে না। ইন্টারফেরন-গামা কোষের মধ্যে ভাইরাস রিপ্লিকেশনে বাধা প্রদান করে। অন্যান্য প্রায় সব ভ্যাকসিনের পরীক্ষায়ই ইন্টারফেরন-গামাসমৃদ্ধ টি-সেলের সক্রিয়তা লক্ষ করা গেছে। সেক্ষেত্রে গ্লোবের ভ্যাকসিনে টি-সেল রেসপন্স অনেকটাই আংশিক। মানবদেহে ভ্যাকসিনটি কীভাবে কাজ করে তাই এখন দেখার বিষয়।

এছাড়া গ্লোব বায়োটেক তাদের প্রি-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এটা দেখায়নি যে তাদের ভ্যাকসিন পশুর শরীরে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে কিনা। এ ধরনের পরীক্ষায় সাধারণত বানর বা অন্যান্য প্রাইমেট ব্যবহার করা হয়। সম্ভবত বাংলাদেশে বানরের ওপর ল্যাবরেটরি পরীক্ষা অতটা সহজসাধ্য নয়। এ কারণেই হয়তো তারা এটা করতে পারেনি। ইঁদুরের ওপরই হোক বা বানরের ওপর, শেষমেশ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমেই এবং একমাত্র ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরেই বলা যাবে ভ্যাকসিনটি কার্যকর কিনা।

গ্লোব দাবি করেছে যে তারা তিন মাসে তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করবে এবং এ বছরের শেষে বা জানুয়ারির শুরুতেই তারা তাদের ভ্যাকসিন সর্বসাধারণে প্রয়োগের জন্য বাজারে নিয়ে আসবে। তবে বাস্তবতায় তা কি আদৌ সম্ভব?

ভ্যাকসিন উৎপাদনে সময় লাগে কত দিন?

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই মূলত ভ্যাকসিন প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, জার্মানি, ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশের একাধিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে করোনার বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন। একটা নতুন ভ্যাকসিন উদ্ভাবন এবং তা বাজারজাতে একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা সম্পন্ন হতে সাধারণত সময় লাগে ৫-১০ বছর। তবে এ করোনা মহামারীতে দ্রুতগতিতে ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় সব ধরনের প্রশাসনিক ও এথিক্যাল পার্মিশন ফাস্ট-ট্র্যাকের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি আর্থিক সহয়তাও দেয়া হচ্ছে উদারভাবে। অগ্রগামী কোম্পানিগুলো আশা করছে যে ১২-১৮ মাসের ভেতরেই তারা কার্যকর ভ্যাকসিন বাজারে আনতে পারবে (দ্য গার্ডিয়ান)। তবে সম্প্রতি অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না, ফাইজারসহ নয়টি স্বনামধন্য ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এ মর্মে একমত হয়েছে যে যথাযথ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা বা সেফটি শতভাগ নিশ্চিত না করে তারা কেউ তাদের ভ্যাকসিন বাজারে আনবে না। আশা থাকল যে গ্লোব বায়োটেকও একই পথে হাঁটবে। [বাকী অংশ আগামীকাল]

 

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম: এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি; সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট; শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য