নিউইয়র্কে সন্ধ্যা ৭টায় জরুরি কর্মীদের জন্য তালি বাজানোর যে উদ্যোগ সেটা আমার কাছে ভণ্ডামি বলেই মনে হয়েছিল। আমি জানি, এটা তাদের প্রতি সংহতি ও সহানুভূতি দেখানোর জন্য এ আয়োজন করা হয়েছে। তবে এই তালি বাজানো মোটেই যথেষ্ট নয়। এ শহরে ৭৫ শতাংশ মহামারী মোকাবেলার সামনের সারির কর্মী আছেন। যেমন মুদি দোকানের কর্মী, বাস-ট্রেন অপারেটর, দারোয়ান, খাবার সরবরাহকারী কর্মী, চাইল্ড কেয়ার স্টাফ আছেন, যারা কিনা এখনো যেখানে তারা থাকতে চান সেজন্য ঋণের জন্য অনুমোদন পাননি। তারা তাদের ব্লকে পুষ্টিকর খাবারও পাননি। এমনকি মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবাতেও তাদের কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না। তারা যে পৃথিবীতে থাকেন, সেটি সেইসব মানুষের জন্য অভাবনীয়, যারা কিনা রাতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তালি বাজাচ্ছে।
মহামারী যুক্তরাষ্ট্রের সেসব অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে, যেখানে নিম্ন আয়ের অশ্বেতাঙ্গ মানুষের বাস বেশি। কভিড-১৯-এর সংক্রমণে কালো এবং লাতিন মানুষের মৃত্যুর পরিমাণ সাদাদের দ্বিগুণ। অগ্রবর্তী কর্মীরা, আমি যাদের ছবি তুলেছি, তারা সেই মানুষ যারা কাঠামোগত বর্ণবাদ এবং সহিংসতার শিকার হন। যার বিরুদ্ধে এখন যুক্তরাষ্ট্রে সপ্তাহব্যাপী আন্দোলন চলছে।
আমি বর্ণবাদ এবং পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডকুমেন্টিং শুরু করি ২০১২ সালে। যখন ১৭ বছর বয়সী ট্রায়বন মার্টিন ফ্লোরিডায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। প্রতি বছর দাঙ্গা ও লুটাপাটের আখ্যানটি মূল সমস্যাকে আড়াল করে দেয়। মূল আলোচনা বদলে গিয়ে অন্য খাতে চলে যায়।
জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুও এরিক গার্নার, সান্দ্রা ব্ল্যান্ড, আহমাউদ আরবেরি অথবা মাইক ব্রাউনের মৃত্যুর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। তাদের কারো মৃত্যু এমিট টিলের চেয়ে আলাদা নয়। বছর বদলেছে কিন্তু অন্য কিছু বদলায়নি। প্রতিবাদের সময় আমি যেসব আলোচনা শুনি তাতে ক্ষোভ ও হতাশা থাকে, কিন্তু সেখানে আসল বিষয় ও ইতিহাসের অভাব দেখা যায়। ক্রোধের ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারি এবং এর থেকে মুক্তিও দরকার। রাগ একসময় কমে যায়, আগুনও থেমে যায়। তখন আসলে কী রয়ে যায়?
আমাদের এই সমস্যা নিয়ে কথা বলা দরকার। এ মুহূর্তে আমরা পুলিশ দ্বারা রাস্তায় নিহত হওয়া একজন পিতা এবং রুটিওয়ালাকে নিয়ে চিত্কার করছি। কিন্তু অনেক বড় বিষয় আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি: খাদ্যাভাব, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অভাব, বর্ণবাদী পুলিশিং। বর্ণবাদের যে পদ্ধতিগত চরিত্র, আমাদের তার মুখোমুখি হতে হবে। নয়তো জিঙ্গা খেলার মতো হয়ে যাবে: টুকরোগুলোকে পেছনে টানব, আবার রাখব এবং আশা করব টাওয়ারটা ভেঙে পড়বে না। আমাদের একেবারে মূল থেকে সব নতুন করে শুরু করতে হবে। কীভাবে সেটা করতে পারি? আমাদের ইউনিয়ন স্কয়ার এবং আমেরিকার শহরজুড়ে টাউন মিটিং করা উচিত। মানুষের উচিত ক্ষমতাপ্রাপ্তির অনুভূতি নিয়ে যাওয়া। যেভাবে কেউ ক্ষত থেকে বিষকে চুষে ফেলে। বর্তমানে আপনি আন্দোলনে আসেন উৎসাহী হয়ে, এরপর কোনো ব্যান্ডেজ বা ড্রেসিং ছাড়াই চলে যান। ক্ষত তখন আরো গভীর হয়।
করোনাভাইরাস আমাদের শহরের যে বিভাজন তার ওপরের ঢাকনাটা সরিয়ে দিয়েছে। প্রতিবাদ কর্মসূচির আগে আমি দেখেছি যারা রাস্তা দিয়ে হেঁটে কাজে যাচ্ছে এবং যারা গণপরিবহন ব্যবহার করছে, তারা ছিল মূলত অশ্বেতাঙ্গ মানুষ। এটি এমন একটি বিষয়, যার সঙ্গে আমিও যুক্ত। জরুরি কর্মীরা আমার মতোই। আমি নিজেও বাসায় বসে থাকতে পারব না, আমাকেও বাড়ি ভাড়া দিতে হবে।
মানুষ আতঙ্কিত। আমার এক বন্ধু যে কিনা মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটির হয়ে গাড়ি চালায়, বলেছে তার ভেতর জমে থাকা ভয়ের কথা। কারণ সে তার সহকর্মীদের একে একে মরতে দেখছিল। রব গোরে নামক ব্রুকলিনের একজন ডাক্তারও একই কথা আমাকে বলেছিলেন।
এরপর আমি একজন মরদেহবাহী গাড়িচালকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাকে বলেন, আপনি যদি আসলেই কিছু দেখতে চান তবে অ্যান্ডু টি. ক্লেকলে ফিউনারেল সার্ভিসে যান। আমি দেখেছিলাম দুটি রেফ্রিজারেটেড সেমি-ট্রাক, একটি ছোট ট্রাক এবং ছয়জন ব্যক্তি যাদের ভূতের মতো দেখাচ্ছিল। যারা কিনা শেষকৃত্যের কাজ করেন তারা খুব কদাচিৎই বিশৃঙ্খল থাকেন, কিন্তু এ মানুষগুলো ছিল মাতালের মতো। তাদের একজন আমাকে সেই ভয়ঙ্কর এক দৃশ্যের কথা বলেছিল, যা কখনো তিনি আগে দেখেননি।
জরুরি কর্মীরা তাদের সর্বোচ্চটা করছেন। কেউ প্রতিশ্রুতির কারণে করেন, কেউ আবার নৈতিক কারণে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারণটা অর্থনৈতিক। যদি বাড়ি ভাড়া মওকুফ করা হয় অনেকে হয়তো বাসাতেই থাকবেন।
এই যে তালি বাজিয়ে সহমর্মিতা দেখানো তারও একটি মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ আছে। যারা তালি বাজিয়েছিলেন, তারা অন্য বর্ণের মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে তালি বাজাবেন কি? রাজনীতিবিদরাও ততক্ষণ অন্য বর্ণের মানুষের কথা শোনেন না, যতক্ষণ তাদের ভোট প্রয়োজন না হয়। যখন মহামারী থাকবে না, তখন কে তাদের হয়ে কথা বলবে। এ কারেণে নিউইয়র্কের এ আন্দোলন আমাকে অদ্ভুত, ছদ্মবেশী ও পরাবাস্তব অনুভূতি দিচ্ছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক





