ফিলিপাইনের দ্বীপ লুজনে সিয়েরা মাদ্রে পর্বতমালার স্নিগ্ধ অরণ্যগুলোতে বহু শতাব্দী ধরে ডুমাগাট-রেমোনটাডোস আদিবাসীদের বসবাস। কিন্তু তাদের আদি ভূমি এখন হুমকির মাঝে রয়েছে।

এই জায়গায় ফিলিপাইনের সরকার পরিকল্পনা করছে কালিওয়া বাঁধ নির্মাণের। যদিও তাতে রয়েছে পরিবেশগত হুমকি এবং স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুত হওয়া ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কা। ২০০৯ সালে ডুমাগাট-রেমোনটাডো সেইভ সিয়েরা মাদ্রে নেটওয়ার্ক অ্যালায়েন্সের (এসএসএমএনএ) সহায়তায় সফলতার সঙ্গে বন্ধ করতে পেরেছিল লাইবান মেগা বাঁধ নির্মাণ। যা মূলত সম্ভব হয়েছিল পাবলিক ক্যাম্পেইন ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের অধীনে এ প্রকল্প ছোট করে দেয়া হয় এবং গত বছর এটি সন্দেহজনক পরিবেশগত ছাড়পত্রও লাভ করে। সে সঙ্গে সরকার চীনা এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে ২১১.২ মিলিয়ন ডলারের ঋণও পেয়েছে।

পাশাপাশি এ অঞ্চলে সামরিকীকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সম্প্রদায়ের নেতাদের চিহ্নিত করে বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য বলে মিথ্যা অভিযোগও আনা হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের নেতা এবং স্টপ কালিওয়া ড্যাম নেটওয়ার্কের (এসকেডিএন) সমন্বয়ক কনরাডো ভার্গাস বলেন, সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের আড়ালে আদিবাসীদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। যাদের কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই আটক করে ক্রসফায়ারে দেয়া হচ্ছে।

এরপর যখন মহামারী আঘাত হানল, পরিস্থিতি আরো বেশি খারাপ হয়ে গেল। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি লকডাউনে থাকা স্থানীয়দের জীবনকে আরো বেশি দুর্বিষহ করে তোলে। তাদের নিজেদের ভূমিতেই চলাফেরা করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায়। মার্চে ডুমাগাট-রেমোনটাডো সম্প্রদায়ের এক সদস্যকে তুলে নেয়া হয় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হলো। এসকেডিএন এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এখনো ফিলিপিনো সেনাবাহিনী দ্বারা সেখানে সহিংসতা, জোরজবরদস্তি, হুমকি ও লাঞ্ছনা চলমান আছে।

ডুমাগাট-রেমোনটাডো সম্প্রদায়ের ওপর এমন আচরণ বিচ্ছিন্ন কিছু না। গোটা দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের বাঁধ, কৃষিকাজ কিংবা খনি কার্যক্রমের কারণে হুমকিতে আছে আদিবাসী ও স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবন। যা কভিড-১৯-এর জরুরি অবস্থার কারণে আরো সংকটপূর্ণ হয়েছে। 

অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটস অব নেপালিজ ইন্ডিজেনাস পিপলসের (এএইচইউআরএনআইপি) আইনজীবী দুর্গা ইয়ামপিউ বলেন, নেপালে যারা লকডাউন নীতি অমান্য করেছে তাদের আটক করা হচ্ছে। কিন্তু আদিবাসীদের কাছে কভিড-১৯ নিয়ে তথ্য  অপর্যাপ্ত, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের স্থানীয় ভাষায় অনেক কিছু অনুবাদই করা হয়নি। যার ফলে আদিবাসীদের ওপর পুলিশের আটক ও নির্যাতনও বেড়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোগের ভয়ও। 

আবার লকডাউন সত্ত্বেও অনেক কোম্পানি তাদের কার্যক্রম বাড়িয়ে দিয়েছে। কম্বোডিয়ার রাতানাকিরি প্রদেশে, স্থানীয় আদিবাসীরা যখন বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল তখন ভিয়েতনামের রাবার কোম্পানি হোয়াং আনহ গিয়া লাই (এইচএজিএল) বহু হেক্টর জমি সাফ করে ফেলেছে এবং দুটি পবিত্র পাহাড়, জলাভূমি ও প্রাচীন শিকারের অঞ্চল এবং কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

গ্রামটির প্রতিনিধিত্বকারী সেভ সুয়েন বলেন, আমাদের লোকেরা বন ও পাহাড়ে বাস করে এমন আত্মাদের বিশ্বাস করে। এখন কোম্পানি পাহাড় সাফ করে ফেলেছে। আমাদের প্রার্থনার কোনো স্থান নেই। আত্মারা এমন কিছু করার সুযোগ করে দেয়ায় গ্রামবাসীদের ওপর ক্ষুব্ধ।

যে অঞ্চল সাফ করা হয়েছে তা সেই অঞ্চলগুলোর একটি যা কিনা রাতানাকিরির আদিবাসীদের ফিরিয়ে দেয়ার জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। এ নিয়ে একটি মধ্যস্থতা চুক্তি হয়েছিল ২০১৫ সালে। ২০১৯ সালে এসে এইচজিএল একতরফাভাবে মধ্যস্থতা থেকে সরে আসে। চুক্তির প্রতিশ্রুতি অল্প সময়েই টিকে ছিল।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে যেসব সম্প্রদায় এমন উন্নয়ন প্রকল্প দ্বারা প্রভাবিত অঞ্চলে বাস করে, তারা সরকারগুলোর ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে দৈনিক মজুরি উপার্জনকারীদের অস্থায়ীভাবে কর্মহীন হতে হয়েছে এবং তারা তাদের জীবিকা হারিয়েছে। সে সঙ্গে অনেক ব্যবসা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের একজন জায়বে গারগানেরা বলেন, যখন আমরা কোয়ারেন্টিন পর্যবেক্ষণ করছিলাম, সরকার খনির কার্যক্রম চালানোর অনুমতি প্রদান করেছিল। যে সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে আমরা কাজ করছি তারাও অবৈধ খনির কাজ বাড়ার কথা জানিয়েছে। যা মূলত চীনা কোম্পানিগুলো দ্বারা করা হচ্ছে। যা এখন উদ্বেগ বাড়িয়ে চলেছে, এখানে সম্প্রদায়গুলোর মাঝে যুক্ত হয়েছে আবেগগত ও মানসিক বোঝাও।

সব মিলিয়ে কভিড-১৯-এর মহামারী ভঙ্গুর ও প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনযাত্রাকে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। যেখানে তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে অসাম্য ও অন্যায্য অনেক নিয়মকানুনের। কিন্তু এটি সেসব মানুষের সহনশীল মানসিকতাকেও সামনে এনেছে, যারা মানবাধিকারের লড়াইয়ে সবসময় সোচ্চার থাকে।

ডিপ্লোম্যাট থেকে সংক্ষেপে অনূদিত