অ্যাঞ্জেলিক হোয়াইটের গাল বেয়ে চোখের পানি নেমে এসে তার মাস্ককে ভিজিয়ে দিচ্ছিল যখন তার নাকের ভেতর থেকে নভেল করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য নমুনা নেয়া হচ্ছিল। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এসব কথা বলছিলেন তিনি। এ পরীক্ষার সঙ্গে ছিল বাধ্যতামূলক দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনও। এই টেস্টটি একটি কঠোর প্রটোকলের অংশ ছিল, যার ফলে হোয়াইট ও তার সহকর্মীরা আবারো রিসার্চ শিপে যাওয়ার অনুমতি পাবেন এবং তাদের গবেষণার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরে বিশাল সমুদ্র স্রোতের ডাটা সংগ্রহের কাজও চালিয়ে যেতে পারবেন।
যাকে উত্তর মহাসাগরীয় বলয় বলা হয়, সমুদ্রজলের ঘূর্ণি যা কিনা সাধারণত প্রায় ২০ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার জায়গাকে কাভার করতে পারে, যেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং মহাসাগরের সবচেয়ে পুরোনো বাস্তুতন্ত্র। এটি লাখ লাখ গাছ, প্রাণী ও জীবাণুর বাস্তুতন্ত্রও বটে। বিজ্ঞানীরা এই বলয় নিয়ে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। বাস্ততন্ত্র আরো একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ, এটা মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ দেখাতে শুরু করে।
মাইক্রোবিয়াল ওশানোগ্রাফার হোয়াইট বলেন, আমরা বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন দেখতে শুরু করেছি, যার অর্থ সবচেয়ে দূরের এবং আইসোলেটেড বাস্তুতন্ত্রের ওপর আমরা প্রভাব ফেলছি। এই বলয় নিয়ে গবেষণার জন্য ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি মাসে গবেষকরা স্টেশন আলোহাতে যাত্রা করেন।
যে জাহাজটি গবেষকদের নিয়ে যায় সেটি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ২০২০ সালের শুরুর দিকে আটকে যায়। এরপর করোনাভাইরাস আঘাত হানে এবং দলটি কখন জাহাজে ফিরতে পারবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে। অবশেষে বসন্তের শেষে গবেষকরা ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক ল্যাবরেটরি সিস্টেম থেকে যাওয়ার অনুমতি পান, যারা কিনা ওশানোগ্রাফিক শিপের শিডিউলগুলো ঠিক করেন। এরপর তারা গ্রীষ্মে যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা শুরু করেন। ক্রু মেম্বারদের প্রি-ক্রুজ কোয়ারেন্টিন ও টেস্টিংয়ের ভেতর দিয়েও যেতে হয়।
হোয়াইটের এ অভিজ্ঞতা ছিল ব্যতিক্রম, কোনো নিয়ম না। অনেক গবেষক ঘরে আটকে আছেন, এরই মধ্যে তারা সংগৃহীত ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখছেন কিংবা কখন তারা আবার ফিল্ডে যেতে পারবেন, সেই পরিকল্পনা করছেন। হোয়াইট বলেন, আমি জানি আমার অনেক সহকর্মী মাঠে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছেন।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় বিলম্বিত আন্তর্জাতিক প্রকল্প ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির (ওএসইউ) নৃবিজ্ঞানী বারবারা পিপেরাটা তার ফিল্ড সাইটে ভ্রমণে যেতে পারেননি। এ বছরের শুরুতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন তিন বছরের প্রজেক্ট শুরু করার জন্য। যেটি ছিল সাংস্কৃতিক অভ্যাস এবং খাবার পানিতে সংক্রামক জীবাণুর উপস্থিতির সংস্পর্শে আসা ব্রাজিলের বেলেম শহরের শিশুদের জীবনের প্রথম দুই বছরে অন্ত্রের মাইক্রোবিয়ামকে কীভাবে আকার দেয় তা দেখার। তার দল গরিব ও ধনী ঘরের প্রতিবেশী শিশুদের ডাটা একত্র করে কীভাবে দৈনিক কাজকর্ম তাদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াল কম্পোজিশনকে প্রভাবিত করে তা দেখার পরিকল্পনা করছিল।
পিপেরাটা বলেন, অনেকের অংশগ্রহণে এটি একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্প, যা কিনা কভিড দ্বারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রকল্পটি জানুয়ারিতে শুরু হওয়ার কথা ছিল, অর্থাৎ ২০২০ সালের প্রথম দিকে। তারা লজিস্টিক জোগাড়ের কাজও শুরু করেছিল। পাশাপাশি তারা ফিল্ড টিমে কাজ করার জন্য ব্রাজিলের শিক্ষার্থীদেরও খুঁজে বের করছিল এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোয় তাদের যোগাযোগ শক্তিশালী করার কাজও করছিল। এর পরই এশিয়ার বাইরে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ল এবং ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করল। আর মার্চে এসে সবকিছু বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল।
মহামারীর কারণে ওএসইউ পিপেরাটাকে মার্চে ডাটা সংগ্রহের জন্য ব্রাজিল যেতে অনুমতি দেয়নি। তিনি বলেন, এটা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় এখনো নির্দিষ্ট করে বলেনি কখন গবেষণার জন্য আবার ভ্রমণ করা যাবে। এখন তাই তার দল প্রস্তুত হচ্ছিল গ্রীষ্মে ভ্রমণের জন্য অথবা সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতির জন্য, যেখানে এ বছর কিংবা এমনকি আগামী বছরও ভ্রমণে যেতে পারবে না। মে মাসে পিপেরাটা বুঝতে পারলেন তিনি হয়তো শিগগিরই ব্রাজিল যেতে পারবেন না। ফলে তিনি ও তার সহকর্মী এবং দুজন শিক্ষার্থী যুক্ত হয়ে ব্রাজিলিয়ান সহযোগীদের জন্য নিদের্শনাবলির ভিডিওচিত্র ধারণ করতে শুরু করেন। যেখানে ইংরেজি ও পর্তুগিজ ভাষায় কীভাবে মায়েদের সাক্ষাত্কার নিতে হবে এবং জরিপ করতে হবে তার বিবরণ ছিল। কীভাবে শিশু ও মায়ের কাছ থেকে মলের নমুনা সংগ্রহ করতে হবে, এ রকম আরো অনেক নির্দেশনা দেয়া ছিল। এর পরও অবশ্য পিপেরাটার মতে তাদের কাজ নয় মাস পিছিয়ে গেছে।
যাই হোক, এগুলো কেবল উদাহরণ মাত্র। এভাবে আরো অসংখ্য ফিল্ড রিসার্চের কাজ করোনার কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দ্য সায়েন্টিস্ট





