নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল এশিয়া থেকে। এরপর লকডাউন এবং এর থেকে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতা প্রথম লাভ করে এ মহাদেশটি। এ অঞ্চলে করোনা ছড়িয়ে পড়ার বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। যদিও এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি, তবে করোনা এতদিন পর্যন্ত এশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের কী শিখিয়েছে?

দ্বিতীয় ঝড় অনিবার্য

দ্বিতীয় ঝড়ের কথা সাম্প্রতিক সময়ে জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এটি দিয়ে আসলে কী বোঝায়? চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে দ্বিতীয় ঝড় হচ্ছে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রাথমিকভাবে সংক্রমণের ধাক্কা কমে গিয়ে ফের সংক্রমণের চূড়ায় ওঠা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অতীতে মহামারীতে এ ধরনের ঝড় কয়েক মাস ধরে কাঁপিয়ে গেছে।

এশিয়ায় আমরা নতুন করে সংক্রমণের ধারা দেখতে পাচ্ছি। সেল বায়োলজিস্ট জেনিফার রন বলেন, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঝড়ের ব্যাপারে ‘যদি’ বলে কিছু নেই। বরং ‘কখন এবং কীভাবে ধ্বংসাত্মক’ হয়ে উঠবে, তা দেখা যেতে পারে।

এমনকি সেই সব দেশ, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া যারা মহামারী মোকাবেলায় টেস্টিং, ট্র্যাকিং ও লকডাউনের মাধ্যমে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছিল তারাও ক্রমেই বাড়তে থাকা সংক্রমণের সাক্ষী হয়েছে। তাই যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে ভাইরাস সম্ভবত এখানে থাকতে এসেছে, তখন দেশগুলোকেও বুঝতে হবে যে তারা আরো নতুন কেস পেতে যাচ্ছে। এখন এই পরিস্থিতিতে এটি সামলানো খুবই চ্যালেঞ্জিং।

ফিরে আসতে পারে বিধিনিষেধগুলো

খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের প্রফেসর অ্যালিস্টার ম্যাকগুইরে। তিনি বলেন, একটা সফল লকডাউন মানে এই না যে ওই এলাকা করোনাভাইরাস মুক্ত হয়ে গেছে। জাপানের হোকাইদো অঞ্চল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে গিয়ে লকডাউন জারি করে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে তাদের নতুন আক্রান্তের সংখ্যা একেবারেই কমে যায়। এপ্রিলের শেষ দিকে গিয়ে জরুরি অবস্থা তুলে দেয়া হয় এবং স্কুলগুলোও খুলে দেয়া হয়। কিন্তু এক মাসের কম সময়ের ব্যবধানে আবারো জরুরি অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হয়। এ পর্যায়ে দ্বিতীয় সংক্রমণের ধাক্কা সামলাতে শহরটিকে বেশ বিপাকে পড়তে হয়। এখন অবশ্য দ্বিতীয় ধাপের বিধিনিষেধও তুলে নেয়া হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ ঠিকই জানে যে ভ্যাকসিন না এলে আবারো হয়তো জরুরি অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হতে পারে।

চীনেও আমরা একই অবস্থা দেখতে পেয়েছি। বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হলেও এখন আবার নতুন রিপোর্টের খবর আসতে শুরু করেছে। সে ধারাবাহিকতায় সুলান অঞ্চলে চীনকে বিধিনিষেধ কড়াকড়ি করতে হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াকেও দ্বিতীয় ঝড়ের ধাক্কা সামলাতে ২০০-এর বেশি স্কুল ফের বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

বিদেশ থেকে আসাদের কোয়ারেন্টিন করতে হবে

চীনের ঝিলন প্রদেশ ও হিলংঝিয়াংয়ের আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী রাশিয়া থেকে আগতদের। একটি ঘটনায় দেখা গেছে, রাশিয়া থেকে আগত আট চীনা নাগরিক একসঙ্গে কভিড-১৯-এ পজিটিভ হয়েছেন। এরপর একই সময়ের মাঝে আগত আরো ৩০০ জনকে কোয়ারেন্টিন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এক পর্যায়ে চীনে কিছু সময়ের জন্য বাইরে থেকে আগত আক্রান্তের সংখ্যা স্থানীয় সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এরপর এমন ঘটনা বন্ধ করতে কঠোর কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা বলবৎ করা হয়। এমনকি বেইজিংভিত্তিক ফ্লাইটগুলো সেসব অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়া হয়, যেখানে তাদের পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। হংকং বাইরে থেকে আগতদের ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট পরানোর ব্যবস্থা করেছে, যাতে তাদের গতিবিধি ট্র্যাক করা যায় এবং প্রয়োজনমতো ব্যবস্থা নেয়া যায়। আপাতদৃষ্টিতে এটি অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, তবে এটি করা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

টেস্ট ও ট্রেসিংয়ের মোমেন্টাম হারানো যাবে না

ফেব্রুয়ারির শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়া এমন পদ্ধতি তৈরি করে, যাতে প্রতিদিন ১০ হাজার জনকে পরীক্ষা করা যায়। তখন অ্যাপস ও জিপিএস টেকনোলজিও ট্রেসিংয়ের কাজ করে যাচ্ছিল, যাতে নতুন প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। এটি তাদের স্থানীয়ভাবে সতর্কবার্তা দেয়ার সুযোগ করে দেয়। যে কারণে সাধারণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও যদি কোথাও বিপর্যয় ঘটে, তবে দ্রুত লকডাউনে যাওয়া যায়।

নতুন আক্রান্তের প্রথম সংখ্যা মেলে ১২ মে। এর আগের এক সপ্তাহে স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপর দ্রুত ট্রেস করে সংশ্লিষ্ট এলাকাটি চিহ্নিত করা হয়। যেখানে তারা ওই ঘটনার সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত প্রচুর মানুষকে ট্রেস করে। এটা মূলত সম্ভব হয়েছে কার্যকর ট্রেসিং ব্যবস্থার কারণে।

যে কারণে টেস্ট এবং ট্রেসিংয়ের ধারা থেকে বেরোনো একেবারেই উচিত হবে না। তাতে মোমেন্টাম হারিয়ে বিপর্যয় ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।

দ্বিতীয়বার টেস্ট করা

প্রফেসর ম্যাকগিয়ের বলেন, আমাদের কেবল কে ভাইরাসে আক্রান্ত তা জানলেই হবে না, আমাদের অ্যান্টিবডি টেস্ট করে দেখতে হবে এটি কার ছিল।

প্রফেসর অ্যাশলে সেন্ট জন বলেন, ভাইরাসের কারণে উপসর্গবিহীন অথবা মৃদু উপসর্গযুক্ত আক্রান্ত ব্যক্তির অসুস্থতা দেখা যাওয়ার আগেই এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমি নিশ্চিত না যে, ইমিউনিটি টেস্ট দেশজুড়ে সব পর্যায়ে করা হয়েছে কিনা। তবে সিঙ্গাপুরে এটা কার্যকরভাবে করা হয়েছে ক্লাস্টারগুলো দেখতে এবং সম্ভাব্য আক্রান্তদের খুঁজে বের করতে।

যদিও সিঙ্গারপুরে দেশজুড়ে নয়, বরং যেসব স্থান ঝুঁকিপূর্ণ সেখানে ইমিউনিটি টেস্ট করা হয়েছে। যেমন প্রাক-স্কুলশিক্ষকদের মাঝে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, আপনি যদি শনাক্ত করতে পারেন যে কে অসুস্থ কিন্তু এখন আর সংক্রমিত নয়, তবে আপনি তাদের কাজে ফেরত পাঠাতে পারেন।

অনুকূল জনস্বাস্থ্য সেবা

এটি দেখাও গুরুত্বপূর্ণ যে জনস্বাস্থ্য সেবাগুলো কী শিখেছে। প্রফেসর জুডিট ভাল বলেন, এই মহামারীতে স্বাস্থ্য খাত প্রমাণ করেছে এটি কীভাবে বদলে গিয়ে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। চীন উহানে মাত্র আটদিনে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল তৈরি করেছে।

তবে এটি সবচেয়ে বেশি যা দেখিয়েছে তা হলো, জনস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ আরো অনেক বাড়াতে হবে।

একক কোনো সমাধান নেই

সম্ভবত এশিয়ার দেয়া অন্যতম শিক্ষাটি হচ্ছে এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট উপায় নেই, যা পার্থক্য তৈরি করে দিতে পারে। অর্থাৎ কেবল টেস্টিং কিংবা শারীরিক দূরত্বের একটি উপায়ে মুক্তি লাভ হবে না। অনেক অঞ্চল এগুলো সব একসঙ্গেই করেছে। আর যেহেতু এখনো মানুষের মাঝে ইমিউনিটি তৈরি হয়নি, তাই ভ্যাকসিন বা কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা আসার আগে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে হবে।

বিবিসি