১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে ১৫ জন সুস্থ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রের সালিসবুরির একটি নতুন অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে আসা হয়। তৃতীয় দিনের মাথায় তাদের করোনাভাইরাস যুক্ত একটি মিশ্রণ, যা কিনা সাধারণ সর্দিজ্বরের কারণ, তা নাক দিয়ে গ্রহণ করতে বলা হলো। এরপর সেসব স্বেচ্ছাসেবীকে মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের কমন কোল্ড ইউনিটে তিন সপ্তাহের জন্য কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। যেখানে গবেষকরা তাদের মাঝে তৈরি হওয়া উপসর্গগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিছু গবেষক অংশগ্রহণকারীদের কমন কোল্ড ইউনিটে থাকাকে ছুটির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

এক বছর পর সেসব স্বেচ্ছাসেবীর ১৪ জন একই কাজ করার জন্য ফিরে এসেছিলেন। এবার গবেষকরা দেখতে চাইছিলেন অংশগ্রহণকারীরা ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার পর কোনো ইমিউন প্রতিক্রিয়া দেখায় কিনা। দেখা গেল, তাদের কোনো উপসর্গ দেখা না গেলেও তাদের ইমিউন সিস্টেম কার্যকর কোনো প্রতিরক্ষা তৈরির আগেই প্রায় প্রত্যেকেই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিল।

এটা ছিল সেই প্রশ্নের উত্তরের প্রাথমিক ইঙ্গিত  যা এখন গবেষক, ডাক্তার ও রাজনীতিবিদদের দুশ্চিন্তায় রেখেছে। মানুষের ইমিউন সিস্টেম কি সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে? এর উত্তর একটি ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারবে কিনা সেটা বোঝার জন্য জরুরি। পাশাপাশি যারা কভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছে তারা কি মহামারী-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে কিনা এবং বিশ্ব কতটা সহজে এ রোগের হুমকি হ্রাস করতে পারে, সেটা জানার জন্যও এ উত্তর জানা জরুরি।

সাধারণ সর্দিজ্বর সম্পর্কিত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল গবেষকরা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন। আবার সাম্প্রতিক মলিকিউলার টেকনিকের সঙ্গে প্রাণী ও সেল কালচার ব্যবহার করে সার্স-কোভ-২-এর বিপরীতে মানুষের ইমিউন প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য গবেষকরা কাজ করছেন। তারা দুর্দান্ত গতির সঙ্গে অ্যান্টিবডি ও ইমিউন সেল প্রতিক্রিয়ার তালিকা প্রস্তুত করেছেন। নির্ধারণ করতে চাচ্ছেন কোনটা অধিক কার্যকর এবং ভ্যাকসিন ও চিকিৎসার ডিজাইন তৈরি করছেন প্রাণী এবং মানবদেহে ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে, যা কিনা ন্যূনতম স্বল্পমেয়াদি ইমিউন প্রতিক্রিয়া উসকে দেয়। কিন্তু এখানে কোনো দ্রুত ও সরল পরীক্ষা নেই, যা কিনা দৃঢ়ভাবে ইমিউনিটি কার্যকর বা স্থায়ী হবে কিনা তা নির্ধারণ করতে পারে। এটা জানার জন্য এখনো সময়টা বেশ অল্প। ইমিউনোলজিস্ট রেইনহোল্ড ফ্রস্টার বলেন, একমাত্র ভবিষ্যৎই আমাদের এ বিষয়ে বলতে পারে।

এদিকে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার বিক্ষিপ্ত কিছু উদাহরণ সামনে এসেছে। যা আক্রান্তদের মাঝে ভয় তৈরি করেছে যে ইমিউনিটি স্বল্পস্থায়ী হতে পারে। এ ধরনের প্রতিবেদনগুলো সংবাদমাধ্যম দ্বারা সমর্থন পাচ্ছে এবং ভ্যাকসিনের সম্ভাবনা নিয়ে বিষণ্ন হওয়ার মতো ভবিষ্যদ্বাণী করছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন অনেক বেশি সতর্ক।

বিজ্ঞানীরা সার্স-কোভ-২-এর ইমিউন প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত জানার জন্য গভীর অনুসন্ধান জারি রেখেছেন, এখন পর্যন্ত যেসব ডাটা হাতে এসেছে তা একেবারে অবিশ্বাস্য কিছু নয়, এখন পর্যন্ত ফলাফল বেশ ভালো। ভাইরাল ইমিউনোলজিস্ট মেহুল সুথার বলেন, আমরা দারুণ ইমিউন প্রতিক্রিয়া ও দুর্দান্ত অ্যান্টিবডি দেখছি। আমরা কেবল জানি না এই  প্রতিক্রিয়া কতটা দীর্ঘস্থায়ী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা জানতে সময় লাগছে।

অ্যান্টিবডি ইমিউনিটির হয়ে কাজ করে ভাইরাল আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করতে এবং তাদের ফিরে আসা ঠেকাতে ইমিউন সিস্টেমের অগণিত উপায় রয়েছে। এটি বি সেলগুলোর জন্য নির্বাচন করে, যা ভাইরাসের সঙ্গে আবদ্ধ হতে সক্ষম অ্যান্টিবডিগুলো উৎপাদন করে। এটি ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মেমোরি বি সেলগুলোকে সংরক্ষণ করে, যা সেসব অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং ভাইরাস ফিরে এলে এগুলো তার কাজ শুরু করে। অন্য প্রতিরক্ষাটি টি সেলে অন্তর্ভুক্ত, যা সংক্রমিত কোষগুলো সন্ধান করে সেগুলোকে ধ্বংস এবং ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরি করার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। এই ইমিউন সেল কয়েক বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি ইমিউনিটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে এবং প্রতিক্রিয়ার মাত্রা অনুসারে পৃথক হতে পারে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারকরা এমন কিছু প্রকাশ করে যা জীবাণুনাশক ইমিউনিটি হিসেবে পরিচিত, এটি এমন প্রতিক্রিয়া যা সাধারণত অ্যান্টিবডির মধ্যস্থতায় হয়ে থাকে। এটা দ্রুত ভাইরাসের ফিরে আসা আটকে দেয়। অবশ্য সব ভ্যাকসিন অ্যান্টিবডিকে নিউট্রালাইজ করার এ কাজটি করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ এইচআইভির কথা বলা যায়, যেখানে খুব কদাচিৎই অ্যান্টিবডি নিউট্রালাইজ হতে পারে। যে কারণে এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের যে প্রচেষ্টা তা বেশ জটিল।

তবে এখন পর্যন্ত সার্স-কোভ-২ যে ইঙ্গিত দেখাচ্ছে তা উৎসাহজনক। গবেষকদের অনেকগুলো দল দ্রুত ভাইরাসে সংক্রমিত মানুষের দেহ থেকে নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি আলাদা করছেন, টেস্টে পজিটিভ আসার কয়েকদিনের মধ্যে বেশির ভাগই উচ্চ অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া দেখায়। অনেকগুলো ভ্যাকসিন প্রার্থী সার্স-কোভ-২-এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়াকে উসকে দেয়, এটি বেশ ইতিবাচক ইঙ্গিতও বটে। যেখানে ভ্যাকসিনগুলো ইমিউনিটি তৈরি করতে পারে বলে মনে হয়।

তবে অনেক ডাটা বলছে, অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া মারাত্মকভাবে সংক্রমিত রোগীদের ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ে দেখা যায়। তবে যাদের মৃদু উপসর্গ দেখা গেছে, তারা খুব অল্প পরিমাণেই নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি উৎপাদন করতে পারে।

এরপর প্রশ্ন হচ্ছে অ্যান্টিবডি কতদিন স্থায়ী হয়। গবেষকরা রোগীদের পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন শুরুতে অ্যান্টিবডি বেশ উচ্চমাত্রায় থাকে। কিন্তু এরপর তা কমতে থাকে। কোনো কোনো গবেষণায় দেখা গেছে তিন মাস পর অ্যান্টিবডি চিহ্নিত করা যায় না। পাশাপাশি কোন স্তরের অ্যান্টিবডি সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন, তাও এখনো আমরা জানি না।

অবশ্য অ্যান্টিবডি লেভেল নিচে নেমে এলেও ইমিউন সিস্টেমের বিকল্প পরিকল্পনা থাকে। মেমোরি বি সেল ভাইরাস ফিরে না আসা  পর্যন্ত অস্থিমজ্জায় স্থির থাকে, যখন তারা অ্যান্টিবডি উৎপাদনকারী প্লাজমা সেল হিসেবে নতুন পরিচয় গ্রহণ করে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা দেখাচ্ছে, মেমোরি বি সেল নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি উৎপাদন করে, যা সেরে ওঠা মৃদু উপসর্গযুক্ত রোগীদের মাঝে সার্স-কোভ-২ কে চিহ্নিত করতে পারে।

ইমিউনিটি পুরোপুরি অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভর করে না। টি সেল সংক্রামক কোষকে চিহ্নিত করতে পারে এবং তার বিস্তৃতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

নেচার থেকে সংক্ষেপে অনূদিত