এটা গোপন কিছু নয় যে কভিড-১৯ মহামারী আমাদের জীবনযাপনের অনেক দিক বদলে দিয়েছে। যার একটি হলো স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের প্রবেশের সুযোগ।

স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব নিয়ে আমরা একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা চালিয়েছি এবং বিশ্বব্যাপী মহামারী চলাকালে এ খাত ব্যবহারে যে পরিবর্তন এসেছে সে-সংক্রান্ত তথ্যগুলো জড়ো করেছি। যেখানে দেখা গেছে, আগের বছরের তুলনায় ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের সব অংশে মানুষের সেবা নিতে যাওয়ার হার ৩৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

এ পরিসংখ্যান আমাদের দেখাচ্ছে, জীবন রক্ষার জন্য কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে অনেক মানুষকে সামনের দিনগুলোতেও কষ্ট পেতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হূদরোগের কিংবা ক্যান্সারের কথা। এই দুই শ্রেণীর রোগীদের হয়তো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হবে।

সব ক্ষেত্রেই নাটকীয় পতন

বৈশ্বিক গবেষক ও ডাক্তারদের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে আমরা ২০টি দেশের ৮১টি গবেষণাকে চিহ্নিত করেছি, যেখানে অস্ট্রেলিয়াও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে আমাদের কাজ এখন পিআর রিভিউর অধীনে আছে। যদিও আরো অনেক মহামারী-সংক্রান্ত গবেষণার মতো এটিও প্রিপ্রিন্ট হিসেবে উপলব্ধ। সেই গবেষণাগুলো বলছে, এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা খাতগুলো প্রায় সাত মিলিয়নের মতো স্ক্যান কিংবা অস্ত্রোপচার করেছে। যেখানে একই সময়সীমার মধ্যে গত বছর সেই সংখ্যাটি ছিল প্রায় ১১ লাখ।

সেবার খোঁজে যাওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে। যেমন জরুরি বিভাগে যাওয়ার পতন দেখা গেছে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে ২৮ শতাংশ। ডায়াগনস্টিক টেস্টের ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে ৩১ শতাংশ। চিকিৎসা নেয়ার (যেমন হূদরোগের চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু করা) ক্ষেত্রে সেটি হ্রাস পেয়েছে ৩০ শতাংশ।

আমাদের পর্যালোচনার অন্যতম বড় স্বতন্ত্র গবেষণাটি দেখাচ্ছে এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব জরুরি বিভাগে সেবার জন্য যাওয়া হ্রাস পেয়েছে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত। ২০১৯ সালের তুলনায় সাপ্তাহিক সেবা গ্রহণের হার ২.১ মিলিয়ন থেকে এ বছর নেমে এসেছে ১.২ মিলিয়নে। শিশুদের ক্ষেত্রে এ হ্রাসটি দেখা গেছে ৭২ শতাংশ পর্যন্ত।

অস্ট্রেলিয়ায় করা আরেকটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, এপ্রিলে ভিক্টোরিয়ার দুটি হাসপাতালে জরুরি বিভাগে সেবা গ্রহণ করতে যাওয়ার হার হ্রাস পেয়েছে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত।

এ ধরনের প্রবণতার বেশকিছু সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। যেমন একটি কারণ হতে পারে কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে হয়তো অনেকে হাসপাতাল যাওয়া থেকে বিরত থাকছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে না অনেক মানুষ। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু সার্জারি শুরু থেকেই স্থগিত করা হয়েছে।

এ হার অবশ্য অনেক জায়গায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় এখনো আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে নিচু অবস্থানে আছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, নিউ সাউথ ওয়েলসের সর্বমোট হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা এখনো নিচের সারিতে রয়েছে। আবার ছোট কিছু গবেষণায় আমরা দেখেছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাসপাতালে যাওয়ার বিষয়টি বেড়েছে, যেখানে গুরুতর স্ট্রোক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, যা ভবিষ্যতে মানুষের টেলিহেলথের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।  

গুরুতর নয় এমন অসুস্থতার ক্ষেত্রে হ্রাস বেশি

আমাদের পর্যালোচনার অনেকগুলো গবেষণায় দেখা গেছে, হ্রাস পাওয়ার ক্ষেত্রে যাদের অসুস্থতা মৃদু তাদের সংখ্যা অনেক বেশি। অন্য একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট ব্যথায় আক্রান্ত লোকদের হাসপাতালে উপস্থিতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কম গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্তদের চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটি ও কব্জিতে চিড় ধরা লোকদের হাসপাতালে উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম ছিল। যদিও প্রথম ক্যাটাগরিতে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এখানে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি (সেসব রোগী যাদের জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা প্রয়োজন)।

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, অনেক গবেষণায় দেখা গেছে হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে হূদরোগে আক্রান্তদের চেয়ে মৃদুভাবে আক্রান্তদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমেছে। মার্চের শেষের দিকে ইংল্যান্ডে বড় আকারে করা একটি গবেষণা বলছে, মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির হার কমেছে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত, যেখানে মৃদুভাবে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সেই হার ছিল ৪২ শতাংশ।

মানসিক স্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্যারিসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, লকডাউনের প্রথম চার সপ্তাহে জরুরি সেবা নেয়ার হার কমেছে ৫৫ শতাংশ। কিন্তু উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা নিয়ে সেবা নিতে যাওয়ার হার কমেছে ব্যাপকভাবে। এমনকি মানসিক অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার হারও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। মহামারীর উচ্চ অবস্থায় উত্তর ইতালির শিশুদের জরুরি বিভাগে যাওয়ার হার ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে দেখা গেছে।

অপ্রয়োজনীয় সেবা নেয়ার সুযোগ কমেছে

স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের গবেষণায় কাজ করা গবেষকরা বলেছেন, জনগণকে আশ্বস্ত করা জরুরি যে হাসপাতালে সেবা নিতে যাওয়া নিরাপদ। নয়তো গুরুতর অবস্থায়ও অ্যাম্বুলেন্স ডাকার ব্যাপারে অনিচ্ছা দেখাবে, যার ফলাফল হতে পারে অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু ও পক্ষাঘাতগ্রস্ততা।

কিন্তু বিশ্বব্যাপী অনেক বিশেষজ্ঞ এ সংকটকে অপ্রয়োজনীয় সেবা বন্ধ করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। যেখানে সংস্থানগুলো তাদের জন্য বরাদ্দ থাকবে যাদের সবেচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

ইতালিয়ান ডাক্তাররা শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় যাওয়ার হার কমার পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাব দিয়ে বলেছেন, এটি স্বাস্থ্যসেবার সরঞ্জামগুলোকে গুরুতর রোগীদের জন্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দেবে।

এরই মধ্যে এমন অনেক প্রমাণ আছে, যা মেডিকেল পরিষেবার অতিব্যবহারকে সামনে নিয়ে এসেছে। যেমন অ্যান্টিবায়োটিক ও অপিওডসের ভুল ব্যবহার, মূত্রথলির ক্যান্সারের জন্য অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিশুদের জন্য সিটি স্ক্যানের অতিরিক্ত ব্যবহার।

মহামারীর বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রতিক্রিয়া জানানোর সঙ্গে এসব দিককে নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে। মহামারীর ট্র্যাজেডি যে বিষয়টিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তা হলো, প্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর সেবাকে হ্রাস করতে হবে। পাশাপাশি এ সমস্যাকে আরো ভালোভাবে চিহ্নিত করার সুযোগও এটি আমাদের দিয়েছে।

মেডিকেল এক্সপ্রেস