অনেক মানুষ সচেতন আছে যে একজনের শরীরের রক্তে অ্যান্টিবডি টেস্ট করার মাধ্যমে এটা জানা যায় যে সে নির্দিষ্ট কোনো রোগে আক্রান্ত কিনা, যেমন কভিড-১৯। এ অ্যান্টিবডি ব্যক্তিকে আবারো রোগাক্রান্ত হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়।

কিন্তু নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র জানাচ্ছে, অনেকের মাঝে যারা কিনা কভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছে তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি স্তর হ্রাস পেয়েছে, যেখানে প্রতি ৩৬ দিনে এটি কমছে অর্ধেক করে। এর অর্থ কি এই যে যারা কভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছে তারা তাদের ইমিউনিটি হারিয়ে ফেলছে?

আমি সহজাত ইমিউন প্রতিক্রিয়ায় আগ্রহী একজন জিনতত্ত্ববিদ। এটি ইমিউন সিস্টেমের এমন অংশ যা আমরা জন্মগতভাবে পেয়ে থাকি এবং সহজাত ইমিউন সেল অ্যান্টিবডি উৎপাদনকারী সেলকে ‘শিক্ষিত’ করে রোগজীবাণু সম্পর্কে এবং কীভাবে তাদের চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে হবে সে সম্পর্কে। অ্যান্টিবডি ইমিউনিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটাই একমাত্র ফ্যাক্টর না।

ইমিউন সিস্টেমের দুটি অংশ

ইমিউন সিস্টেম দুটি অংশ দ্বারা তৈরি: সহজাত ইমিউনিটি ও অভিযোজিত বা অর্জিত ইমিউনিটি। সহজাত ইমিউন সিস্টেম, যেখানে শ্বেত রক্তকণিকা (যাকে ডেনড্রিটিক সেল বলে), মনোসাইটিস, নিউট্রোফিল জন্মের সময় অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং তাত্ক্ষণিকভাবে শত্রুর মোকাবেলায় প্রতিক্রিয়া দেখায়। শ্বেত রক্তকণিকার এই গ্রুপটি ধ্বংসাত্মক রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা রোগজীবাণুকে হামলা করে এবং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে।

সহজাত ইমিউন সিস্টেম তাত্ক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে। এতে সমস্যা হচ্ছে এটি একটি ভোঁতা উপকরণ, এটি সব ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়।

অভিযোজিত ইমিউন সিস্টেম যেটি কিনা বি সেল ও টি সেল দ্বারা গঠিত, যা সহজাত ইমিউন সেল থেকে রোগজীবাণু এবং তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারে। এটি কাজ শুরু করতে সময় নেয়, কিন্তু ইতিবাচক ব্যাপার হলো এটি খুবই নির্দিষ্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি সারা জীবনের জন্য স্থায়ী।

ইমিউন সিস্টেমের স্মৃতিশক্তি

রোগজীবাণুর সংস্পর্শে আসার ইতিহাস তথাকথিত মেমোরি টি সেল ও মেমোরি বি সেল বহন করে। যখন একটি সংক্রমণ পরাজিত হয়ে চলে যায়, এ সেলগুলো শরীরের পেরিফেরিয়াল টিস্যু যেমন লিম্প নোডস কিংবা প্লীহাতে থাকে এবং ভাইরাসজনিত রোগের স্মৃতি হিসেবে কাজ করে।

এই ইমিউনোলজিক্যাল মেমোরি দায়ী হচ্ছে হোস্টের প্রতিরক্ষার জন্য এবং রোগজীবাণু দ্বিতীয়বার আক্রান্ত করতে গেলে তাকে অকার্যকর করার জন্য।

রোগ থেকে সেরে ওঠার পর অ্যান্টিবডির স্তর হ্রাস পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন পেপার যে উদ্বেগ দেখাচ্ছে এ কারণে যে আমরা আমাদের ইমিউনোলজিক্যাল স্মৃতি হারাচ্ছি, যা বাস্তব স্মৃতি হারানোর মতো খারাপ ব্যাপার।

ইমিউনিটিতে ‘টি সেল’ কেমন ভূমিকা রাখতে পারে?

বি সেল ও অ্যান্টিবডি হচ্ছে কেবল ইমিউন প্রতিক্রিয়ার অংশ। টি সেল বি সেলকে সাহায্য করে অ্যান্টিবডি উৎপাদন করতে। এটি এমন প্রোটিন যা রোগজীবাণুতে আবদ্ধ হয়ে এটি ধ্বংস করে।

যে পদ্ধতিতে এটি ঘটে তা হলো টি সেলগুলো প্রথমে বি সেলকে গ্রাস করে এবং অ্যান্টিবডি উৎপাদন শুরু করে।

টি সেল ভাইরাসকে গ্রাস করতে পারে না। কিন্তু একধরনের শ্বেত রক্তকণিকা যাকে অ্যান্টিজেন প্রেজেন্টিং সেল বলা হয় তা পারে। এটি ভাইরাসের বিভিন্ন অংশ টি সেলকে দেখায়। টি সেলগুলো তখন ভাইরাস সম্পর্কে জানতে পারে, যাদের তারা খুঁজতে পারে এবং ধ্বংস করতে পারে।

টি সেল বি সেলগুলোকে আঁকড়ে ধরে এবং তাদের সক্রিয়করণের সংকেত পাঠায়, যা বি সেলকে সাহায্য করে অ্যান্টিবডি উৎপাদন করতে।

কভিড-১৯-এর ইমিউনিটির ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি হ্রাসের অর্থ কী?

এটা যা বলছে তা হলো যখন রক্তে অ্যান্টিবডি কম থাকে তখন উচ্চমাত্রায় সুযোগ থাকে যে বেশির ভাগ পৃথক ভাইরাস কণা টিকে থাকতে পারবে এবং ধ্বংস হওয়া থেকে এড়িয়ে যেতে পারবে। ফলে টিকে যাওয়া ভাইরাসগুলো রোগ বৃদ্ধি করতে পারবে এবং রোগের কারণ হতে পারবে। 

অ্যান্টিবডি স্তর কমে গেলে কি ইমিউনিটি হারিয়ে যায়?

সাধারণত এর উত্তর হবে ‘না’। যদি ভাইরাস দ্বিতীয়বার সংক্রমিত করার চেষ্টা করে তখন মেমোরি সেল বি ও টি সেল এটি শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। সে সঙ্গে শরীরকে ভাইরাস থেকে রক্ষা করবে। মেমোরি টি ও বি সেল দ্বারা সরবরাহ করা সুরক্ষা হলো সে কারণ যে জন্য ভ্যাকসিনভিত্তিক সুরক্ষা কাজ করে। যদিও ব্যতিক্রম আছে। ফ্লুর বিরুদ্ধে আজীবন ভ্যাকসিন কাজ করে না। কারণ ফ্লুর জেনেটিক কোড দ্রুত বদলে যায়।

কিন্তু সার্স-কোভ-২-এর ক্ষেত্রে যে সমস্যাটি আমি দেখছি তা হলো মনে হচ্ছে ওই মেমোরি টি সেল ও বি সেল মুছে গেছে। অ্যান্টিবডি হচ্ছে প্রোটিন এবং রক্ত সঞ্চালনে কেবল তিন থেকে চার সপ্তাহ স্থায়ী হয়। অ্যান্টিবডির স্তর উচ্চ রাখতে বি সেলগুলোকে পুনরায় নতুনভাবে সরবরাহ করতে হবে। কিন্তু কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডির হ্রাস বলছে, অ্যান্টিবডি তৈরি করা সেল পর্যাপ্ত সংখ্যায় উপস্থিত নেই, ফলে অ্যান্টিবডির স্তর হ্রাস পাচ্ছে। কতদিন পর্যন্ত ইমিউনিটি পাওয়া যাচ্ছে সে সংক্রান্ত গবেষণা হয়তো এতে আলো ফেলতে পারে। তবে এ মুহূর্তে আমরা জানি না কেন এমনটা ঘটছে।

দ্য কনভারসেশন