করোনা পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য যে নিয়মগুলো পালন করার কথা বলা হচ্ছে, তাতে অনেকেরই জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জীবিকার এই অনিশ্চয়তা প্রায় প্রতিটি দেশে লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন, জীবিকার চেয়ে জীবন বড়। বেঁচে থাকতে পারলে পরে জীবিকার চিন্তা করা যেতে পারে। অন্য দল মনে করছে, জীবিকা বাদ দিয়ে জীবন বাঁচানো সম্ভব নয়। জীবন ও জীবিকাকে কেন্দ্র করে এ বিতর্ক অনেকাংশে হয়ে পড়েছে আমাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মাপকাঠি। মহামারীর এই সংকটে আমাদের কার কী অর্থনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে, তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে আমরা কোনটিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। করোনায় জীবন ও জীবিকার অবস্থাকে বোঝার প্রয়াস থেকে এ লেখা। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের এনটাইটেলমেন্ট ধারণার ছকে বর্তমান এই পরিস্থিতিতে জীবিকার প্রশ্নকে এখানে বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
অমর্ত্য সেনের ‘এনটাইটেলমেন্ট’-এর ধারণা কোনো ব্যক্তির দ্রব্যসামগ্রী অর্জনের সক্ষমতাকে বোঝায়। এই সক্ষমতা অর্জন নির্ভর করে সাধারণত উৎপাদন সম্ভাবনা, শ্রম বিক্রয় বা বিনিময় করতে পারার সুযোগের ওপর। খাদ্য জোগাননির্ভর গতানুগতিক অর্থনৈতিক ধারণার বিপরীতে অমর্ত্য সেনের এনটাইটেলমেন্ট তত্ত্ব যুক্তি উপস্থাপন করে যে সক্ষমতা অর্জনে বাধা থাকলে খাদ্যনিরাপত্তা সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে। করোনা মহামারীতে তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের এনটাইটেলমেন্ট বা সক্ষমতা বিনিময় নিজের বা অন্যের চলাচলের ওপর নির্ভর করে। যেমন করোনা মহামারীতে মানুষের চলাচলনির্ভর শহুরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীদের অর্থ উপার্জনের উৎস কমে গিয়েছে অথবা তারা যে ধরনের শ্রম বা কাজের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে থাকেন, তা বিনিময় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গুগল কভিড-১৯ কমিউনিটি মবিলিটি রিপোর্টের (২৫ মে ২০২০) তথ্য অনুযায়ী, করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশের গণপরিবহনে ৫৭ শতাংশ, কাঁচাবাজারে ৪১ শতাংশ ও শপিংমলে ৬২ শতাংশ মানুষের চলাচল কমে গিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের জীবিকার এ চ্যালেঞ্জটি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখানে মারাত্মক প্রভাব রাখছে। যেমন তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমিকদের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কাসহ বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার বিঘ্নিত হতে পারে। রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন দেশে যেমন ভিয়েতনামে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবং প্রস্তাবিত বিভিন্ন ট্র্যাভেল জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় অদূর ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে।
জীবন ও জীবিকার এই সংকট বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অনেক মানুষ জীবিকার তাগিদে শহরকেন্দ্রিক হলেও গ্রামে তাদের পরিবার থাকে। আবার অনেকে জীবিকার উৎস গ্রামে হলেও লেখাপড়া কিংবা স্বাস্থ্যসেবার জন্য তারা শহরের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে শহরের ও গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে এ মানুষগুলো জীবনের সংগ্রাম। তবে অনেকে মনে করছেন, এই মহামারীর পরিস্থিতিতে শহরের দরিদ্র মানুষরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। বিআইজিডি-পিপিআরসির যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে যে ‘সাধারণ ছুটি’
চলাকালীন শহরের ৭২ শতাংশ দরিদ্র মানুষের রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে, যা কিনা গ্রামের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। এর কারণ হলো শহরের ৭৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, যাদের একটা বড় অংশ দিন আনে দিন খান। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত শহুরে দরিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে, যেখানে গ্রামে কমেছে ৬২ শতাংশ। এর ফলে শহুরে দরিদ্রদের ৪৭ শতাংশকে টিকে থাকার জন্য খাদ্য খাতে ব্যয় কমাতে হয়েছে, যা গ্রামের চাইতে ১৫ শতাংশ বেশি। গ্রামের মানুষ যেহেতু কৃষিকেন্দ্রিক কাজের সঙ্গে কমবেশি যুক্ত, সেহেতু সেখানে হয়তো খাদ্যনিরাপত্তাটা তুলনামূলকভাবে বেশি কাজ করছে। শুধু তাই নয়, কভিড-১৯ পরিস্থিতি একটা ‘নতুন দরিদ্র’
জনগোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে, যারা কিনা স্বাভাবিক সময়ে দরিদ্রসীমার ৪০ শতাংশ ওপরে অবস্থান করতেন, কিন্তু এখন তাদের ৮০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে, যদিও এই দারিদ্র্য কাঠামোগত দারিদ্র্য কিনা তা হয়তো এখনই বলার উপযুক্ত সময় নয়। এই শহুরে দরিদ্রগোষ্ঠীর ঝুঁকির একটা বড় কারণ হলো এরা সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের বাইরে আছেন। অল্প কিছু ত্রাণ দেয়া হলেও একটা বড় অংশ মানবিক ও আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। আবার একটা যথার্থ ‘এক্সিট প্ল্যান’
বাস্তবায়ন না করেই যখন সবকিছু খুলে দেয়া হলো, এটা অনুমান করা কঠিন নয় যে এই শহুরে দরিদ্র গোষ্ঠীরাই এখন বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। যারা বেঁচে থাকাটুকুকে নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন, যেমন গার্মেন্টস বা পরিবহন কর্মী, তারা অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক দূরত্বের অনুপস্থিতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষার অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতার কারণে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। পাশাপাশি শহুরে নিম্ন আয়ের মানুষের বস্তি বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বাসস্থানের যে ধরন এবং একই পরিসর প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করার যে চর্চা, সে সবকিছুও তাদের কভিড-১৯ সংক্রমণের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এছাড়া শহরের লাখ লাখ গৃহহীন মানুষ রয়েছে, যারা জীবন ও জীবিকা দুদিক থেকেই টিকে থাকার চরম সংকটে রয়েছে।
নগরের তুলনায় গ্রামের অবস্থা আপাত ভালো মনে করা হলেও গ্রাম নিয়ে আমরা নিরাপদবোধ করছি না। গ্রামীণ অর্থনীতির যে পরিবর্তন হয়েছে, তা এই করোনা পরিস্থিতিতে গ্রামের মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আশির দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর এবং কৃষিই ছিল গ্রামের লোকজনের প্রধান পেশা। বর্তমানে অকৃষি খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। গ্রামের প্রায় ৬০ শতাংশ লোক অকৃষি কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত, যেমন ছোট ব্যবসা, ইটভাটার শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক, রিকশা কিংবা ইজিবাইক চালক, প্রবাসী শ্রমিক। এসব পেশায় যারা যুক্ত, তাদের জীবিকার নিশ্চয়তা নির্ভর করে মানুষের চলাচলের ওপর। এ কারণে জীবিকার প্রশ্নে অনেককেই ঝুঁকি নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরোতে হচ্ছে। এসব মানুষের ন্যূনতম সঞ্চয় না থাকা এবং অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ কিংবা খাদ্য সাহায্য না পাওয়ার কারণে ঘরে বসে অদৃশ্য ভাইরাস মোকাবেলা করার চেয়ে বাড়ির মানুষের ক্ষুধা নিবারণ তাদের জন্য বেশি জরুরি। তাদের কাছে জীবন ও জীবিকা একে অন্যের পরিপূরক।
শহর ও গ্রামের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এ কথা স্পষ্ট যে করোনাভাইরাস সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র যেসব বড় সমস্যার মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম হলো সব নাগরিকের জন্য আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। বাংলাদেশের জন্য খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু নানা সংকটের সময় এ দেশে দরিদ্র মানুষের খাদ্য সমস্যার বিষয়টি কখনই প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না। সম্ভবত রাষ্ট্রের মেগা প্রজেক্টের আড়ালে ক্ষুধার্ত মানুষের কথা চাপা পড়ে যায়। করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের দাবি রাখে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেছে। কিন্তু তার পরও এখনো এ দেশে বিপুল জনগোষ্ঠী খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০১৯-এর এক হিসাবে দেখা যায় যে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ এখনো খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষুধায় আক্রান্ত। ধরণা করা হয়, লকডাউনের কারণে দেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা এরই মধ্যে আরো বেড়েছে আনুমানিক আড়াই কোটি। বলা যায়, রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে এ বিপুল জনগোষ্ঠী নতুন করে চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।
প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্র কি খাদ্যনিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম? বিগত তিন দশকে কৃষি খাতে রাষ্ট্রীয় চরম অবহেলা সত্ত্বেও কৃষকের অবদানের কল্যাণে খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। গত ৪৮ বছরে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। গত তিন অর্থবছরে সামান্য তারতম্যের তফাতে খাদ্য উৎপাদন প্রায় সমান রয়েছে। অথচ দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে। তার পরও বলা অযৌক্তিক হবে না যে খাদ্যের লভ্যতার বিচারে বাংলাদেশ খুব একটা ঝুঁকির মধ্যে নেই।
সমস্যা হলো, দেশে এখন বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা নেই। এই দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাবার উৎপাদন করে অথবা ক্রয় করে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। এমতাবস্থায় স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়ে দ্রুত করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক আশঙ্কাকে দূর করাকে অগ্রাধিকার দেয়া অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী আরো দৃঢ় করে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ আশু প্রয়োজন। সরকারের কেবল খাদ্য ত্রাণনির্ভর সামাজিক নিরাপত্তা অনেকের অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহের সক্ষমতা কমিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি করতে পারে। এক্ষেত্রে বিনিময় সমস্যা দূর করতে সরকার খাদ্য এবং নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করতে পারে। এসব দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি পুরো দেশের মানুষের সংকট মোকাবেলার জন্য শুধু পরিকল্পনাবিহীন কিছু প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শুধু জীবিকাকে নিশ্চিত করা যথেষ্ট নয়। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে একটা অসুস্থ, দুস্থ, সংক্রামিত শ্রমবল নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা কখনই সম্ভব নয়। এ কারণে বর্তমানে সংক্রমণের হার বিবেচনা করে পুরো দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
ড. মুজীবুল আনাম, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। রিসার্চ ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন।
ড. মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
আনমনা প্রিয়দর্শিনী, পিএইচডি গবেষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ, ইউএসএ
ড. শরীফ রাসেল, কলেজ অব বিজনেস গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ল, ফ্লিন্ডারস ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া।
ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
তৌফিকুল ইসলাম খান, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)





