নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ কয়েক মাসের লকডাউন শেষে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে ইউরোপ। খুলতে শুরু করেছে মহাদেশটির সমৃদ্ধ জাদুঘরগুলোও। তবে দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম। তাতে অবশ্য অনেকটা নিভৃতে ভাস্কর্য ও শিল্পকর্মের সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগও মিলছে কারো কারো। নতুন এই স্বাভাবিকতায় অনন্য শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন তারা।
জুনের এক সকালে ঠিক ৯টার সময় নেপলসের বিখ্যাত জাতীয় পুরাতত্ত্ব জাদুঘরের সামনে দাঁড়ান পিটার ক্যাম্পবেল। ইতালিতে লকডাউন তুলে নেয়ার পর জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয়েছে তাও কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল। কিন্তু এখনো সকালের এই সময়টায় স্যামন রঙা জাদুঘরের গেটই খোলা হয়নি, যে জাদুঘরটি স্বাভাবিক সময়ে দিনে হাজারো পর্যটককে স্বাগত জানায়। এক যুগল এসে হাজির। এরও ১৫ মিনিট পর দরজা খুলে তিনজন অতিথিকে অপেক্ষারত দেখে প্রহরী যেন বিছুটা বিস্মিতই হলো।
ক্যাম্পবেলের জাদুঘর দর্শনের সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ ছিল। এই আমেরিকান প্রত্নতাত্ত্বিক কাজ করতেন রোমের ব্রিটিশ স্কুলে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাকে ইতালি ছেড়ে যুক্তরাজ্যে নতুন কাজে যোগ দিতে হয়। তাই লকডাউন শেষে নেপলসবাসী যখন সমুদ্রসৈকতে ছুটলেন কিংবা অন্য কোথাও সতেজ বাতাস খেতে বের হলেন, ক্যাম্পবেল তখন গেলেন নেপলসের ঐতিহাসিক জাদুঘরে, যাতে নিভৃতে এর সৌন্দর্য অবলোকন করার সুযোগটা নিতে পারেন।
জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটি হলো ‘ফারনেস কালেকশন’। বিশ্বে গ্রেকো-রোমান ভাস্কর্যের সেরা সংগ্রহগুলো এখানেই রাখা আছে। জাদুঘরে ঢুকে ক্যাম্পবেল সোজা ফারনেস কালেকশন দেখতেই ছুটলেন। অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘রুমে ভাস্কর্যগুলোর সঙ্গে একা থাকার সুযোগ পাওয়া ও সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারাটা ছিল খুবই অনন্য অভিজ্ঞতা।’
ইউরোপের জাদুঘরগুলো পুনরায় খুলছে, যদিও সবকিছুতে খুব ধীরগতি: সামাজিক দূরত্ব মেনে গ্যালারি দর্শন, ঢোকার আগে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা আর নির্দিষ্টসংখ্যক পর্যটকের প্রবেশাধিকার। কিছু জাদুঘর কর্তৃপক্ষগুলো জানাচ্ছে, স্বাভাবিক সময়ের চার ভাগের এক ভাগ অতিথি আসছে এখন।
অতিথির অভিজ্ঞতা এখন এমনই—পুরো গ্যালারির সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারেন একাকী, অন্ততপক্ষে সেখানে আপনার আশপাশে কোনো সেলফিবাজও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এর চেয়ে সেরা অভিজ্ঞতা আর কী হতে পারে।
অবশ্য জাদুঘরের প্রশাসকদের জন্য সময়টা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। এমনিতেই পর্যটকের সংখ্যা খুব কম, সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ও। তাই সামনে তাদের অনিশ্চিত সময়।
ইউরোপজুড়ে ৩০ হাজারেরও বেশি জাদুঘরের প্রতিনিধিত্বকারী অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘নেটওয়ার্ক অব ইউরোপিয়ান মিউজিয়াম অর্গানাইজেশন’-এর সেক্রেটারি জেনারেল জুলিয়া পাগেল জানালেন, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে এক পর্যটক থেকে আরেকজনকে ছয় ফুট দূরত্বে থাকতে হয়। এতে আকারভেদে জাদুঘরগুলোর পর্যটক ২০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গেছে। ব্যক্তিমালিকানাধীনে অনেক ছোট আকারের জাদুঘর তো রাজস্ব কমে যাওয়ায় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামের এক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের এক-দশমাংশ জাদুঘর স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে।
বিশ্বের পর্যটকসংখ্যা এ বছর ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পড়ে যেতে পারে। ২০১৯ সালে ৬ কোটি ৩০ লাখ পর্যটক ইতালি ভ্রমণ করেন। পর্যটকহীন এ বছর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারসমৃদ্ধ দেশটি কোটি কোটি ডলার হারাচ্ছে। পাগেল বলেন, ‘মহামারী শেষ হতে এখনো অনেকদিন। জাদুঘরগুলো বিপুল আয় হারাচ্ছে। পুনরায় সবকিছু চালুর পরও আমরা এটি হারাতে থাকব।’
পরিস্থিতি জাদুঘরগুলোকে বিকল্প ভাবতে বাধ্য করতে পারে। ভবিষ্যতে দেখা যেতে পারে, বিশ্বব্যাপী দর্শকদের সঙ্গে ডিজিটাল প্লাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে জাদুঘরগুলো। এছাড়া অনেক মানুষই আছে, যারা কখনই বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জাদুঘরের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পায় না, ডিজিটাল প্লাটফর্মে তারাও সুযোগ পাবে। পৃথিবীকে রক্ষা করতে গিয়ে কিছুদিনের জন্য সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি অর্জনের কাজও থমকে যাবে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক





