নতুন এই করোনাভাইরাস নিয়ে যে প্রশ্নটি সবার আগে সামনে আসে তা হলো এই ভাইরাসটি কতটা মরণঘাতী। কয়েক মাস ধরে ডাটা সংগ্রহের পর বিজ্ঞানীরা এর উত্তর পাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

গবেষকরা ইনফেকশন ফ্যাটালিটি রেট (আইএফআর) ব্যবহার করে নতুন করোনাভাইরাস কতটা মারাত্মক তা হিসাব করেন। এটা হচ্ছে সংক্রমিত ব্যক্তিদের অনুপাত যারা এর ফলে মারা যাবে, সেখানে যাদের পরীক্ষা করা হয়নি অথবা লক্ষণ দেখা যায়নি তারাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের এপিডেমিওলজিস্ট রবার্ট ভেরিটি বলেন, হার্ড ইমিউনিটির সীমার মতো আইএফআরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এটি ব্যবহার করে মহামারীর সীমা এবং এর তীব্রতা মাপা যায়, যা নির্দেশ করে এই রোগটিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।

মহামারীর মাঝামাঝি সময়ে এসে সঠিকভাবে আইএফআর পরিমাপ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং বিষয়। কারণ পরীক্ষায় কতজন শনাক্ত হলো তার ওপর নয়, বরং এটি নির্ভর করে মোট কতজন মানুষ সংক্রমিত হলো তার সংখ্যার ওপর। কিন্তু কভিড-১৯-এর কারণে মৃত্যুর হার নির্ণয় করা বেশ কঠিন বলে মনে করেন লন্ডন স্কুল অব হাইজিনের ম্যাথমেটিক্যাল এপিডেমিওলজিস্ট টিমোথি রাসেল। কারণ এখানে অনেকেই আছে যারা কিনা মৃদু কিংবা একেবারেই উপসর্গবিহীন। যাদের সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা অনির্ণেয় থেকে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর মাঝে দুই মাসের পার্থক্য রয়ে যায়। অনেকগুলো দেশ ভাইরাসের কারণে মৃতের সংখ্যা নির্ধারণেও হিমশিম খাচ্ছে। মৃতের রেকর্ডই বলছে, আনুষ্ঠানিক গণনায় অনেকগুলো সংখ্যা বাদ থেকে যায়।

মহামারীর শুরুর দিকের ডাটা এই ভাইরাস কতটা মারাত্মক তা কিছুটা বাড়াবাড়িভাবে সামনে আনে এবং পরের বিশ্লেষণ এর প্রাণঘাতী রূপকে কমিয়ে মূল্যায়ন করে। এখন অসংখ্য গবেষণা হিসাব কষে দেখাচ্ছে অনেক দেশে কভিড-১৯-এর কারণে প্রতি হাজারে ৫ থেকে ১০ জন লোক মারা যাচ্ছে।

তবে কিছু গবেষক বলছেন, অধ্যয়নগুলোর মাঝে সংযোগ কেবল কাকতালীয় হতে পারে। সত্যিকার অর্থে এই ভাইরাস কতটা ভয়ংকর তা জানতে যা প্রয়োজন তা হলো কতটা সহজেই এটি বিভিন্ন গ্রুপের মানুষকে হত্যা করে। কভিড-১৯-এ মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রে বয়স, জাতিসত্তা, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের সক্ষমতা, আর্থসামাজিক অবস্থা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। গবেষকদের মতে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে আরো উচ্চমানসম্পন্ন জরিপের প্রয়োজন রয়েছে।

আইএফআর জনসংখ্যার জন্যও নির্দিষ্ট এবং ডাক্তারদের চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নত হওয়ার সঙ্গে এটি সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়, যা এর নির্ণয়ের প্রচেষ্টাকে আরো জটিল করে তোলে।

সঠিক সংখ্যা পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটা সরকারকে এবং ব্যক্তিকে সাহায্য করে প্রকৃত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য। বন্ড ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক হিল্ডা বাস্তিয়ান বলেন, আইএফআর কম গণনা করলে জনগণ কম প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে এবং প্রস্তুতিও হবে কম। আবার বেশি গণনা করলে তখন প্রতিক্রিয়া হবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি, যা কিনা লকডাউনের মতো খারাপ ফলও নিয়ে আসতে পারে।

পার্থক্য কমিয়ে আনা

ভাইরাসের ভয়াবহতার প্রথম দিকের ইঙ্গিত সংগ্রহ করা হয়েছিল চীনের নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা থেকে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা হিসাব অনুযায়ী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত প্রতি ১ হাজার জনের মাঝে ৩৮ জন মৃত্যুবরণ করে।  যা কিনা উহানে আবার প্রতি ১ হাজারে ছিল ৫৮ জন। কিন্তু এ হিসাব একটু বাড়াবাড়িই ছিল। কারণ এক্ষেত্রে সেসব লোক বাদ পড়ে যাচ্ছিল যারা কিনা পরীক্ষার আওতায় আসেনি, যা ভাইরাসের প্রকৃত বিস্তারকেও আড়াল করে ফেলে।

গবেষকরা এই ফাঁক দূর করার চেষ্টা করেছিলেন ভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ার অনুমাননির্ভর মডেল থেকে আইএফআর হিসাব করার মাধ্যমে। প্রাথমিক গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী প্রতি ১ হাজার আক্রান্তের মাঝে ৯ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করে। গবেষক ভেরিটির নিজস্ব মডেলের হিসাব অনুযায়ী চীনের সামগ্রিক আইএফআর প্রতি হাজার আক্রান্তের মাঝে ৭ জনের মৃত্যু। তবে ষাটোর্ধ্ব লোকের ক্ষেত্রে সেটি হাজারে ৩৩ জন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

রাসেলের দল ডায়মন্ড প্রিন্সেস ক্রুস শিপ থেকেও ডাটা সংগ্রহ করে আইএফআর হিসাব করেছিল ফেব্রুয়ারির শুরুতে। যেখানে প্রায় ৩ হাজার ৭১১ জন যাত্রীকে পরীক্ষা করা হয়েছিল। এখানে উপসর্গবিহীন আক্রান্তদেরও শনাক্ত করা হয়। আর এখানকার হিসাব অনুযায়ী প্রতি হাজার আক্রান্তের মাঝে ৬ জন মৃত্যুবরণ করে।

ভেরিটি বলেন, এই গবেষণার উদ্দেশ্য হচ্ছে কভিড-১৯ কতটা ভয়ংকর তার একটি হিসাব বের করা। কিন্তু গবেষকদের আরো জটিল হিসাব অনুমান করতে হয়েছিল, যা এখনো যাচাই করা প্রয়োজন। যেটা মূলত নিশ্চিত হওয়া আক্রান্তের সংখ্যা এবং প্রকৃত আক্রান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অ্যান্টিবডির জরিপ

বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর মাঝে জরিপ চালিয়ে মানুষের মাঝে ভাইরাসের অ্যান্টিবডি টেস্ট করা মূলত সেরোপ্রিভ্যালেন্স নামে পরিচিত। যা কিনা আইএফআর হিসাবের ক্ষেত্রে আরো শুদ্ধতা আনার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। বর্তমানে ১২০টি সেরোপ্রিভ্যালেন্স চলছে বিশ্বব্যাপী।

শুরুর দিকে একটি গবেষণায় ৯১৯ জন লোককে টেস্ট করা হয়েছিল জার্মানির গাংলেট শহরে, যেখানে বড় আকারে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। যেখানে এসব লোকের ১৫.৫ শতাংশের ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি ছিল, যা কিনা সে সময় মানুষের ভাবনার চেয়ে ৫ গুণ বেশি ছিল। এই চিত্রটি আইএফআরের ০.২৮ শতাংশের হিসাব বের করতে ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও গবেষকরা বলেছেন, এটি অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক মানুষের মাঝে করা হয়েছে।

রাসেল বলেন, প্রথম দিকের অ্যান্টিবডি টেস্টগুলো বিভ্রান্তিকর ছিল। পরে বোঝা যায় ভাইরাসকে যতটা ভাবা হচ্ছিল তার চেয়ে কম মরণঘাতী ছিল।

অন্যান্য প্রাথমিক সেরোপ্রিভ্যালেন্স গবেষণাগুলো সংবেদনশীলতার অভাব এবং অ্যান্টিবডি টেস্ট কিটগুলোর বিশিষ্টতাকে ঠিকমতো চিহ্নিত করেনি।

এই সমস্যাগুলো আক্রান্তের মোট সংখ্যাকে স্ফীত করে দিয়েছে। ফলে ভাইরাসকে কম মরণঘাতী মনে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৃহৎ আকারে কিছু সেরোপ্রিভ্যালেন্স গবেষণা হয়েছে, যা কিনা প্রাথমিক অবস্থার চেয়ে বেশি মৃত্যুর হার সামনে এনেছে।

অনেকে অবশ্য ডাটা সংগ্রহের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কীভাবে এসব সংগ্রহ করা হয়েছে তাও নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। ফলে মানুষের আক্রান্ত হওয়া এবং মারা যাওয়ার মাঝে যে আইএফআর হিসাব তাও সঠিকভাবে হিসাব করা যায় না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৃহৎ আকারে এবং আরো বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

নেচার ম্যাগাজিন