যখন আমি ছোট ছিলাম, গ্রীষ্মকাল সবসময় আমার শহরে ছুটির আমেজ নিয়ে আসত। কিন্তু তার সঙ্গে আসত জ্বর ও পক্সের সতর্কবার্তাও। তামিলনাড়ুর গ্রামে তখনকার সময়ের মতো এখনো দেব-দেবীদের স্মরণ করে রোগ প্রশমনের বেশকিছু আয়োজন থাকে। এ সময়টায় কী করতে হয় স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এবং সমাজের নেতৃস্থানীয়দের তা জানা আছে। তারা সে সময়ে গ্রামগুলোকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সীমানা বন্ধ করে দেয়। অতিথি যিনি কিনা জ্বর নিয়ে এসে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে তা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে, তাকে পড়তে হয় শাস্তির মুখে।

একইভাবে শতাব্দীজুড়ে ঘটে যাওয়া মহামারীগুলো বিশ্লেষণ করে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরাও ভ্রমণ এবং মহামারী ছড়িয়ে পড়ার মাঝে গভীর এক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। বিশ্বব্যাপী মানুষ ক্রমবর্ধমান গতিশীলতা দিয়ে বিভিন্ন দেশে রোগের ছড়িয়ে পড়া এবং মহামারীর তীব্রতা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। চৌদ্দ শতকে ভেনিসে ব্ল্যাক ডেথ ছড়িয়ে পড়ার ভয় থেকে একটি জাহাজকে ৪০ দিন কোয়ারেন্টিন করে রাখা হয়েছিল। এরপর আঠারো শতকের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী, উনিশ শতকের টাইফাস এবং বিভিন্ন সময়ে ঘটতে থাকা মহামারী আমাদের শিখিয়েছিল কোয়ারেন্টিন মহামারী ঠেকাতে কার্যকর। বর্তমান সময়ের কভিড-১৯-এ বিপর্যস্ত পৃথিবীর ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়।

মেডিকেল গবেষণাগুলোও বলছে, ভ্রমণ হচ্ছে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যদিও মানুষের ভ্রমণের যে অভ্যাস, তা থামার নয়। গত কয়েক দশকে মানুষের ভ্রমণ, বিশেষ করে বিমান ভ্রমণ বেশ কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। অবসর সময়ে ভ্রমণের মাত্রাও বেশ বেড়েছে। তবে মহামারী কখনো আন্তর্জাতিক সীমাকে তোয়াক্কা করে না।

বারবার আমরা দেখেছি, সংক্রামক রোগ ভ্রমণের যে অর্থনীতি তাকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভ্রমণসংক্রান্ত অনেক খাতকে এজন্য কড়া মূল্যও দিতে হয়েছে। ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, বৈশ্বিক জিডিপির ১০ দশমিক ৪ শতাংশ আসে এ খাত এবং এখানে কাজ করেন ৩১৯ মিলিয়ন কর্মী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ১৮ মাস লাগতে পারে। এরপর হয়তো স্থানীয়ভাবে ভ্রমণ শুরু হবে এবং রিসোর্টগুলো হয়তো প্যাকেজ নিয়ে আসতে পারে। সেই সঙ্গে ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নীতিগুলোও বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হতে পারে।

এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ভ্রমণ কমেছে ৯৫ শতাংশ। অর্ধেকের বেশি বিমান এ সময়ের মাঝে মাটিতেই অবস্থান করেছে। বিশ্বব্যাপী ক্ষতি হয়েছে দিনপ্রতি ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্ব সংকুচিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে তথ্য ও জ্ঞানের পথ এখন অনেক বেশি সহজলভ্য। এজন্য প্রযুক্তিকে ধন্যবাদ দেয়া যেতে পারে। এটা আমাদের শোনাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তা, এটা ভ্রমণকারীদের দায়িত্ব যে তথ্য অনুসন্ধান করা, ঝুঁকি বুঝতে পারা এবং সেই সঙ্গে ভ্রমণকালীন প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এজন্য অবশ্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে—

সুরক্ষা সারগ্রন্থ

এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি খাতগুলোকে অবশ্যই একটি নিরাপত্তা জোন বের করা উচিত। পাশাপাশি হোটেল ও রিসোর্টগুলোয় স্বাস্থ্য সুরক্ষার গাইডলাইনগুলো বুকলেট আকারে বিলি করা উচিত। এটা ভ্রমণকারীদের আস্থা অর্জনেও ভূমিকা রাখবে।

যোগাযোগ

এক্ষেত্রেও সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিয়োজিতদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার সঙ্গে সাহায্য করা উচিত। সেই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রদানেও তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। যাচাইবিহীন খবরের দুনিয়ায় মানসম্পন্ন ও সঠিক তথ্যই হচ্ছে মূল চাবিকাঠি।

স্থানীয় ও গ্রামীণ পর্যায়ে কাজ করা

আরেকটি ক্যাম্পেইন, যা আমরা করতে পারি এবং অবশ্যই করা উচিত, তা হলো যারা শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়েছিল তাদের কাজে লাগানো। আমি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল গোষ্ঠী বোঝাতে ‘অভিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করব না। আমরা সবাই এক রকম অভিবাসী, যারা জন্মস্থান ছেড়ে শহরে কাজ করছি। অভ্যন্তরীণ অনেক রিসোর্ট ও হোটেল স্থানীয় কর্মচারীদের নিয়োগ দিতে পারে। তাদের অবশ্যই চাকরির ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে হবে। গ্রামীণ বিভাগে ভ্রমণের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে এবং যারা এখানে কাজ করছেন, তাদের উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।

বাজেট দেয়া

ভ্রমণকারীরা জানেন, তারা কোথায় এবং কখন ভ্রমণ করতে চান। আমাদের এখন মনোযোগ দেয়া উচিত আকর্ষণীয় মূল্য ও বাজেট দিয়ে ভ্রমণের ধারণা দেয়ার ব্যাপারে।

দায়িত্বশীল ভ্রমণ

কভিড-১৯ হচ্ছে সম্মিলিত স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি শিক্ষা। পর্যটন এলাকাগুলোয় সাধারণত অনেক ভিড় হয়, তাই সেখানে সুরক্ষা নীতি মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি কেমন আচরণ দেখাতে হবে, তাও শেখার প্রয়োজন রয়েছে।

আউটলুক ম্যাগাজিন