জানুয়ারির শেষ দিকে কভিড-১৯ যখন তার বিস্তৃতি ছড়াতে শুরু করেছিল তখন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষক চার্লস চিউ ম্যামোথ বায়োসায়েন্সে তার এক সহকর্মীর কাছে পৌঁছেছিলেন। চিউ ও ম্যামোথের দল মিলে এরই মধ্যে একসঙ্গে সিআরআইএসপিআর-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক টেস্ট আবিষ্কার করেছিলেন, যা লাইম রোগের জন্য ব্যবহার করা হয়। তারা সে সময় ভাবলেন যে এটিকে সহজেই সার্স-কোভ-২ শনাক্তের জন্য রূপান্তর করা যায়।

চিউ বলেন, সিআরআইএসপিআর সিস্টেম আপনাকে খুব নির্দিষ্টভাবে রোগজীবাণু শনাক্ত করতে দেয়। দুই থেকে তিন সপ্তাহের মাঝে আমরা ডিজাইনটি পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে এটি বাস্তবে পেতে সক্ষম হয়েছি। যা ক্লিনিক্যালি নমুনাগুলো থেকে দ্রুত সার্স-কোভ-২ শনাক্ত করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সার্স-কোভ-২-এর মতো ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য সবচেয়ে চূড়ান্ত মানদণ্ডটি হচ্ছে রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পিসিআর। যার জন্য আরএনএকে ডিএনএতে রূপান্তরের পর এটিকে একটি নমুনা থেকে বিচ্ছিন্নকরণ প্রয়োজন এবং পরবর্তী পিসিআর যেকোনো ভাইরাল নিউক্লিক এসিডকে অ্যামপ্লিফাই করতে পারে। এ প্রক্রিয়াটি বেশ সংবেদনশীল, যেখানে মুখের লালা কিংবা নাক থেকে নমুনা সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়। এরপর নমুনাকে ক্লিনিক্যাল ল্যাবে পাঠানো প্রয়োজন প্রস্তুত করার জন্য। এ বছরের শুরুর দিকে এ ধরনের টেস্টের সরবরাহ সংকটও তৈরি হয়েছিল।

চিউ ও তার সহকর্মীদের দ্বারা তৈরি হওয়া নতুন টেস্টটি সার্স-কোভ-২ ডিটিইসিটিআর নামে পরিচিত। গবেষকরা নেচার বায়োটেকনোলজিতে গত ১৬ এপ্রিল এটি কীভাবে কাজ করে তার বিস্তারিত বিষয় প্রকাশ করে। এ টেস্টটি দ্রুত হয়: আরএনএ নিষ্কাশনের পর এটি এক ঘণ্টারও কম সময় নেয় ফল দিতে এবং এটি লুপ-মেডিয়েটেড অ্যামপ্লিফিকেশন (এলএএমপি) ব্যবহার করে, যা কেবল একটি তাপমাত্রায় জায়গা নেয়, যেখানে পিসিআরের ক্ষেত্রে সাইক্লিং তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ এখানে ব্যয়বহুল থার্মোসাইক্লারের প্রয়োজন হয় না। এ টেস্ট অনেকটা বাসায় বসে গর্ভধারণের টেস্ট করার মতো।

নিজেদের গবেষণাপত্রে গবেষকরা জানান যে ডিটিইসিটিআরের সংবেদশীলতা ল্যাবে পরীক্ষা করা রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পিসিআরের সঙ্গে তুলনীয়। জুলাইয়ের ৯ তারিখ এ পরীক্ষা ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কর্তৃক জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন লাভ করে। এরপর প্রস্তুতকারকরা মনোযোগ দেন টেস্টকে অনেক বেশি প্রবেশযোগ্য এবং সহজেই যেন ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর।

মে মাসের ২০ তারিখ ম্যামোথ বায়োসায়েন্স ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন কনজিউমার হেলথকেয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয় বাসায় ব্যবহারের উপযোগী পরীক্ষা সরঞ্জাম তৈরির জন্য, যার মূল্যও বাসায় বসে গর্ভধারণ পরীক্ষা করার কিটের মতোই।

ম্যামোথ বায়োসায়েন্সের সিইও ট্রেভর মার্টিন বলেন, বাসায় বসে ডায়াগনস্টিক কার্যকর হবে যদি সত্যিকার অর্থে সবকিছু একসঙ্গে থাকে। এটি গর্ভধারণ অবস্থা পরীক্ষা করার মতোই সহজতর হতে হবে। সে সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করি যে এটিকে সেভাবে ফল জানাতে পারবে যেভাবে ল্যাবে পরীক্ষা করে ফল জানা যায়।

পিসিআর ছাড়াই অ্যামপ্লিফায়িং

মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-১৯ বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর টেস্টের ক্ষেত্রে গোটা মনোযোগ নিবদ্ধ হয় যাদের উপসর্গ আছে কেবল তাদের জন্য, এর পেছনে বড় একটি কারণ হচ্ছে টেস্ট করার যে সরঞ্জাম তার স্বল্পতা।

সমস্যা হচ্ছে, লক্ষণ দেখা যেতে শুরু করলে তখন মনে হয় ভাইরাস সবচেয়ে বেশি সংক্রামক, যার অর্থ হচ্ছে লোকজন যদি পজিটিভ ফল না পাওয়া পর্যন্ত কোয়ারেন্টিন বা অন্যান্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অপেক্ষায় থাকে তবে এরই মধ্যে তারা হয়তো অন্যদের সংক্রমিত করে ফেলেছে।

শার্লক বায়োসায়েন্সের সিইও রাহুল দান্ডা বলেন, কভিড কীভাবে রোগীদের ওপর প্রভাব ফেলছে তা বোঝার জন্য মহামারীর দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষণ দেখা যাওয়ার শুরুতে টেস্ট করার উপকারী। কিন্তু প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এবং রোগের ইতিহাস ট্রেস করার জন্য, আপনার যা করতে হবে তা হলো উপসর্গহীন রোগীদের পরীক্ষা করা।

রোগ বিস্তৃত হওয়ার আগে আরো বেশি সংক্রমণ শনাক্ত করতে অনেকগুলো বায়োটেক এবং একাডেমিক ল্যাব নতুন কৌশল তৈরি করতে থাকে এবং বিদ্যমান প্রযুক্তিকে ভিত্তি করেন টেস্টিংকে আরো বেশি সহজতর ও সহজলভ্য করার চেষ্টা করতে থাকে, যাতে করে ডাক্তার ও ক্লিনিক্যাল ল্যাব ছাড়াই পরীক্ষা করা যায়।

২৭ আগস্ট প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, গবেষকরা একটি সিআরআইএসপিআর-কভিড টেস্টের জন্য খরচ হিসাব করেছে প্রায় ৩.৫০ ডলারের মতো। কিন্তু তাদের ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে এটি সর্বনিম্ন ০.৭০ ডলারের মতো হতে পারে, যদি রিজেন্টগুলো বেশি পরিমাণে কেনা হয়।

৩১ আগস্ট প্রকাশিত একটি গবেষণায় গবেষকরা একটি পরীক্ষা বিকাশের কথা বলেছিলেন, যেখানে রোগীর নমুনায় সরাসরি এলএএমপি ব্যবহার করা হয় এবং একটি মাইক্রোফ্লুয়েডিক কার্টিজ এবং পোর্টেবল স্মার্টফোনভিত্তিক রিডারের সাহায্য সার্স-কোভ-২ শনাক্ত করে। কারণ এতে কোনো আরএনএ এক্সট্রেকশন কিংবা পিসিআর অ্যামপ্লিফিকেশনের প্রয়োজন পড়ে না।

গবেষকরা লিখেন, কোনো ধরনের ল্যাবরেটরি-গ্রেড অবকাঠামো এবং সংস্থান ছাড়াই কভিড-১৯ ডায়াগনস্টিকের পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম। বিশেষ করে সেসব জায়গায় যেখানে একসঙ্গে অনেকের টেস্ট করানোর প্রয়োজন হয়, যেমন স্কুল, বৃদ্ধাশ্রম বা প্রতিবন্ধীদের থাকার জায়গা এবং স্পোর্টিং ইভেন্ট।

ভাইরাসজনিত সংক্রমণ নির্ণয়ের জন্য এলএএমপির বিকাশ এ মহামারীতেই প্রথম হয়নি। এটা করা হয়েছিল ইবোলা ও জিকার প্রাদুর্ভাবের সময়েও। তবে এ প্রযুক্তিও নির্ভুল নয়। সান্তা বারবারার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউসিএসবি) জীববিজ্ঞানী ম্যাক্স উইলসন বলেন, আইসোথার্মাল অ্যামপ্লিফিকেশনের কিছু সমস্যা রয়েছে। উইলসন কভিড-১৯-এর একটি টেস্টের বিকাশ করেছেন যা সনাক্তকরণের জন্য সিআরআইএসপিআর এবং অ্যামপ্লিফিকেশনের জন্য পিসিআর ব্যবহার করে। তিনি বলেন, এলএমপি অন্যান্য অ্যামপ্লিফিকেশন পদ্ধতির চেয়ে কম সংবেদনশীল।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে যদি সবাই এলএমপি ব্যবহার করা শুরু করে তবে বিকারক পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এ রকম কিছু বিষয় বাদ দিলে অবশ্য এ টেস্ট থেকে বেশ আশাবাদী হওয়ার মতো অনেক কিছুই পাওয়া যায়।

আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ইউনিভার্সিটি অব আলবেনির বায়োমেডিকেল গবেষকরা সিনথেটিক ডিএনএ পদ্ধতি ব্যবহার করেন ভাইরাল আরএনএ শনাক্ত করার জন্য। এ টেস্ট নিয়ে গবেষক দলের নেতা হালভরসেন বলেন, আমরা প্রাসঙ্গিক স্তরে এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারি ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য।

দ্য সায়েন্টিস্ট থেকে সংক্ষেপে অনূদিত