নভেল করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপত্তার জন্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। পাশাপাশি তারা দীর্ঘ সময় হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ কাজের চাপ, পরিবার থেকে দূরে থাকা, নিজেদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণের অভাব, সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং চোখের সামনে রোগীদের মারা যেতে দেখার মতো পরিস্থিতিগুলো স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘস্থায়ী ট্রমার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চিকিৎসকদের সুস্থতা নিয়ে কাজ করা কলিন ওয়েস্ট বলেন, সাধারণ পরিস্থিতিতেই চিকিৎসা একটি চাপযুক্ত পেশা। শারীরিক-মনস্তাত্ত্বিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ চিকিৎসককে বার্নআউটের দিকে ঠেলে দেয়। ২০১৮ সালে কিউরিয়াস মেডিকেল জার্নালের পর্যালোচনায় এটাকে ‘ক্লান্তি, হতাশা ও অকার্যকর অনুভূতির মিশ্রণ’
হিসেবে বর্ণনা করেছে। ভুক্তভোগী স্বাস্থ্যকর্মীদের চাকরি ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। এটা তাদের রোগীদের ওপরও খারাপ প্রভাব ফেলে। ওয়েস্ট বলেন, বার্নআউট স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতির একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া। এটি একটি অভূতপূর্ব তীব্র সংকট।
নিউইয়র্ক সিটির জরুরি চিকিৎসক ম্যাথু বাই ভিডিওকলের মাধ্যমে তার স্ত্রী ও এক মাস বয়সী মেয়েকে না দেখা পর্যন্ত শান্ত হতে পারেন না। তিনি বলেন, আমার অনুভূতি সত্যিই আমার জানা নেই। আমি কাজে যাই এবং দিনশেষে ঘুমাতে যাই। এগুলোর বাইরে বিবেচনা করার মতো আমার কোনো সময় নেই।
করোনাভাইরাস মহামারী আঘাত হানার পর স্বাস্থ্যকর্মীদের দুরবস্থার বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেয়া সম্মুখসারির এ যোদ্ধারা পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী এবং গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার মতো উপকরণ পাচ্ছেন না। বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং ভেন্টিলেটরের ব্যাপক চাহিদা এ সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
ওয়েস্ট বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের অবিশ্বাস্যরূপে হাজার হাজার লোকের অসুস্থতা ও মৃত্যু দেখতে হচ্ছে, যা সত্যিই তাদের ভয়ানক চাপ সৃষ্টি করছে। এর পরও তাদের সেই কাজের দিকেই ঝুঁকতে হচ্ছে। চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দিকে ঝোঁকা তাদের মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্য যেকোনো গোষ্ঠীর চেয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা কভিড-১৯ আক্রান্তের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশ্বজুড়ে শত শত চিকিৎসক মারা গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ৯ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন এবং এর মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীদের সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করায় কিছু হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ তাদের সতর্ক করে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে নিজেদের সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি প্রকাশ করায় চাকরিচ্যুতির মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো স্বাস্থ্যকর্মীদের ট্রমার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। কিছু বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ভাইরাস সংক্রমণ থেমে গেলেও এ ট্রমার প্রভাবগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে। ট্রমা সাধারণত গাড়ি দুর্ঘটনা, গুলি করতে দেখা বা প্রবল মানসিক ধাক্কার মতো কিছু বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে ডাচ দার্শনিক কায়ানো আইদিন ট্রমাকে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যখন কারো জীবন ও জগৎ সম্পর্কে পরিচিত প্রত্যাশাগুলো লঙ্ঘন করে চরম বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার মতো পরিস্থিতিতে প্রেরণ করা হয়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সিয়ানো আইডিন বলেন, এ মহামারীতে চিকিৎসা পেশাদাররা দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও নৈতিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যখন তাদের কাছে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা করার মতো পর্যাপ্ত উপকরণ না থাকে।
চীনের কভিড-১৯ মহামারী সর্বোচ্চ থাকাকালীন ১ হাজার ২৫৭ জন চিকিৎসক ও নার্সের ওপর করা একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা হতাশার লক্ষণ, ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতা উদ্বেগের লক্ষণ এবং ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা অনিদ্রার লক্ষণের কথা বলেছেন।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান





