কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক রাষ্ট্র পরিকল্পনা করছে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চলমান বিধিনিষেধ শিথিল করে দেয়ার বিষয়টি। কিন্তু এভাবে সবকিছু খুলে দেয়ার ঝুঁকি অনেক। এটা নিয়ে আসতে পারে কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ বা ঝড়। এ সতর্ক বার্তাটি দিয়েছেন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের পরিচালক রবার্ট রেডফিল্ড।

ড. রেডফিল্ড বিশ্বাস করেন, কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঝড় বা ধাক্কা আরো ভয়ংকর হতে পারে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সঙ্গে এক আলাপে তিনি বলেন, আগামী শীতে আমাদের ওপর ভাইরাসের আঘাত এখন যা দেখছি তার চেয়ে আরো অনেক ভয়ানক হবে। কারণ ফ্লুর মৌসুমে এটার ফের দেখা মিলবে।

১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীও দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে ফিরে এসেছিল। যা কিনা ৫০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। সেই মহামারীটি তিন দফা আঘাত হেনেছিল। তবে প্রথম পর্যায়ের চেয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের ধাক্কা ছিল বেশি মারণঘাতী। এরপরের ফ্লু মহামারীগুলোও একাধিকবার আঘাত হেনেছিল। যার মাঝে ২০০৯ সালে এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জাও আছে।

অনেক বিশেষজ্ঞই ড. রেডফিল্ডের সঙ্গে একমত যে নতুন এ করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ অনিবার্য। জনস হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ আমেশ এ আডালজা বলেন, এটি বেশ দক্ষতার সঙ্গে মানুষের মধ্যে ছড়াচ্ছে এবং এটাকে ভ্যাকসিন ছাড়া দূর করা যাবে না।

দ্বিতীয় ঢেউ এবং গৌণ চূড়ার মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। এটা পদ্ধতিগতভাবে এক নয়। ধরুন আপনি সমুদ্র পাড়ে আছেন। যেখানে একের পর এক ঢেউ আসছে। একবার ঢেউ তার শীর্ষে ওঠার পর এটি নিচে নেমে আসে এবং সৈকতে আঘাত হানে। এটা এমন জায়গা যেখানে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হতে পারে এবং এরপর এটি হ্রাস পেতে শুরু করে। বলছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ক্যারোল এ উইনার। তিনি আরো বলেন, দ্বিতীয় ঢেউ প্রথমটির পেছন পেছন আসে। এটা হয়তো অত উপরে ওঠে না। কিন্তু ভাটা হয় এবং প্রবাহিত হয়ে যায়।

তবে সেই ভাটা ও প্রবাহিত হওয়ার ব্যাপ্তি নির্ভর করছে প্রতিরক্ষামূলক ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর। স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভ্যাস ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করেই এটাকে প্রশমন করা সম্ভব। উইনার বলেন, দেশের হটস্পটগুলোকে চিহ্নিত করে, সেখানে জোর পরীক্ষা চালাতে হবে।

এসব সতর্ক ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই আমরা প্রকোপ কমিয়ে আনতে পারব। সামাজিক দূরত্বের নীতি প্রয়োগ এবং মানসম্পন্ন পরীক্ষা পারে বিধিনিষেধ সহজ করে আনতে। নয়তো আমাদের উদ্দেশ্য যতই সৎ থাকুক, আমাদের আশপাশে করোনা ঝুঁকিসম্পন্ন লোক বাড়তে থাকবে।

অন্যান্য দেশে কী ঘটছে তার পর্যালোচনা প্রমাণ করে নতুন এ ভাইরাস কতটা ভাইরাল। চীনের হুবেই প্রদেশ সফলভাবে এ ভাইরাস মোকাবেলা করতে পেরেছে, যা কিনা ভাইরাসটির এপিসেন্টার ছিল। কয়েক সপ্তাহ প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসার পর হারবিন শহরে নতুন করে কভিড-১৯ আক্রান্তের দেখা মিলছে।

সিঙ্গাপুরেও আকস্মিকভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। শুরুতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া প্রশংসিত হলেও এ রোগ দেশটিতে ফিরে এসেছে অভিবাসী শ্রমিকদের ডরমিটরি থেকে। যেখানে কিনা স্বাস্থ্যনীতি ও পুষ্টি ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এটি প্রমাণ করে যেখানে মানুষ খুব কাছাকাছি থাকে, সেখানে কীভাবে ভাইরাসটি ফিরে আসতে পারে সেটি।

কভিড-১৯-এর প্যাটার্ন পুরোপুরি বোঝার সময় এখনো আসেনি। যদিও ড. আডালজা মনে করেন দ্বিতীয় ঢেউ আসতে পারে শরতের দিকে। যা কিনা ফ্লু শুরুর মৌসুমও বটে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন এ সময়ের মাঝে ভ্যাকসিন প্রস্তুত হবে না। তিনি বলেন, ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আসবে শরতের দিকে। বিশেষ করে ফ্লুর সঙ্গে একত্র হয়ে। যা কিনা চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য সামাল দেয়া চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

উইনার বলেন, আমরা জানি না শরৎ ও শীতে ফ্লু কেন খুব সাধারণ একটি রোগ। কিন্তু আমরা এটা জানি যে এ সময় মানুষ খুব কাছাকাছি থাকে। পরিবেশও ভেজা ও শীতল থাকে। যার কোনো একটা প্রভাব থাকতে পারে। তিনি আরো বলেন, অন্য অনেক দেশে ফ্লু আবার বর্ষকালে খুব বেশি দেখা যায়। আমরা জানি যে যখন আমরা ফ্লুর মৌসুমে প্রবেশ করব, তখন এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দুটোই বেড়ে যাবে।

এদিকে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ উরভিশ প্যাটেল বলেন, সার্স ও মার্স দ্বিতীয় পর্যায়ে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু আমাদের সম্ভাব্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রতিরোধ ও সাবধানতা সবসময় সেরা প্রস্তুতি।

ড. প্যাটেলের মতে, ঘরে থাকার ফলে অর্থনৈতিক বোঝা এবং মনোদৈহিক প্রভাব বিবেচনা করলে দেশকে দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউন করে রাখা যাবে না। কিন্তু নগরবাসীকে কভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার আগ পর্যন্ত, বেশ কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায়ের নীতি মেনে চলতে হবে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মাঝে এই নীতি থেকে সরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।

তিনি বিশ্বাস করেন একই সময়ে লকডাউন ততক্ষণ পর্যন্ত তুলে দেয়া উচিত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত গণহারে পরীক্ষা করা যাবে এবং সঠিক চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাদের পজিটিভ টেস্ট আসবে তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখা যাবে না। তিনি মনে করেন ব্যবসা শুরু করা যাবে কর্মীদের নিয়মিত পরীক্ষা করার মধ্য দিয়ে। প্রতিদিন সবার উপসর্গ যাচাই করে দেখা এবং জনসমাগমের জায়গাগুলোতেও সরকারকে একই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এছাড়া পূর্ণ সুরক্ষিত অবস্থায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত হাত ধোয়ার কাজ নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে বলে মনে করেন প্যাটেল। পাশাপাশি চোখ-মুখ স্পর্শ না করা, আশপাশ পরিষ্কার রাখা, মাস্ক- গ্লাভস ব্যবহার করার যে নীতি সেসবও মেনে চলতে হবে। এছাড়া লক্ষণবিহীন রোগীদের শনাক্ত করতে হবে এবং আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কাজে যারা নিয়োজিত তাদেরও সুস্থ রাখতে হবে।

এক্সপ্লোর হেলথ