পাঠকদের প্রায় সবাই হয়তো এরই মধ্যে নিজ নিজ ব্যাংক থেকে করোনা সংকটের সময়ে শাখাগুলোতে ভিড় না করে অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণের পরামর্শ পেয়েছেন।

বর্তমানে দেশজুড়ে ১১ হাজারের বেশি এটিএম বুথের অস্তিত্ব লক্ষ করা গেছে। এখানে একমাত্র ডাচ্-বাংলা ব্যাংকেরই এটিএম বুথ রয়েছে পাঁচ হাজারের মতো। ‘কিউ ক্যাশ’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ এটিএম। এর বাইরে আরো দুটি এটিএম নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেগুলো হচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক নিয়ন্ত্রণাধীন ওমনিবাস এবং এবি ব্যাংকের ক্যাশ লিংক। তাছাড়া ইসলামী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও দি সিটি ব্যাংক লিমিটেড বৃহৎ এটিএম নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। দেশজুড়ে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি এগুলোর কর্মকর্তারা মনে করছেন, পয়েন্ট অব সেলস তথা পিওএসের হারও বেড়ে গেছে বহুগুণে। প্রতিদিন দেশজুড়ে ৬০ হাজারের মতো পিওএস কাজ করছে। দি সিটি ব্যাংকের রয়েছে প্রায় ১০ হাজার পিওএস। ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচে তথা এনপিএসে একটা পর্যায়ে বেশ টিথিং প্রবলেম ছিল। এরপর সব জটিলতা কাটিয়ে বর্তমানে অনলাইন ব্যাংকিং একটা সন্তোষজনক অবস্থানে উপনীত হতে পেরেছে।

দেশজুড়ে দুই কোটির মতো ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এক্ষেত্রে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা হবে সব মিলিয়ে ১ কোটি ৮০ লাখের অধিক আর এখানেও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের অবস্থান ৫০ লাখ গ্রাহক নিয়ে সবার শীর্ষে। ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যাও প্রায় ১৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে দ্য সিটি ব্যাংকের ইস্যুকৃত কার্ডের পরিমাণ ২৭ শতাংশের মতো। অন্যদিকে প্রায় ২৫ শতাংশ শেয়ারের অধিকারী হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। এর পরপর রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। তবে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ঋণের পরিমাণ খুব যে বেশি এমনটাও নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কার্ডের মালিকরা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করেন তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে। অন্যদিকে বেশির ভাগ ব্যাংকের টিকিট সাইজ বা লেনদেনের পরিমাণ ছোট করে ক্রেডিট কার্ডে বেশি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এখনো প্রতিবন্ধকতা দিয়ে রেখেছে। অনেক কার্ড একাধারে টাকা ও ডলারের ডুয়েল কারেন্সিতে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে ফরেন কারেন্সির বিষয়টি ট্রাভেল কোটা কিংবা এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটার মতো আরো নানা দিক থেকে সমন্বয় করে নেয়ার ব্যাপার রয়েছে।

বেশির ভাগ কার্ড ইস্যু করতে দেখা যায় ভিসার পক্ষ থেকে। তারপর রয়েছে মাস্টারকার্ড। এর বাইরে অনেকে আমেরিকান এক্সপ্রেসের কার্ডগুলোও ব্যবহার করেন। ইদানীং দ্য সিটি ব্যাংক অ্যামেক্স বা আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডকে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছে। বাংলাদেশজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পরিসর বাড়িয়ে দিয়েছে নানা দিক থেকে। দেশে তিন কোটির ওপর লোক মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন করছেন। তার মধ্যে ৬০ শতাংশের অধিক ‘বিকাশ’-এর গ্রাহক। বাকিরা সাধারণত ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের রকেটের মাধ্যমে লেনদেন করছেন। তাছাড়া ইদানীং ‘নগদ’ এসেছে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে।

বাংলাদেশের অনেক মানুষ চট্টগ্রাম থেকে গাইবান্ধা, ঢাকা থেকে মাদারীপুর কিংবা দেশের নানা স্থানে তাদের অর্থ প্রেরণ করছেন এভাবে মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা নিয়ে। এক্ষেত্রে তারা একদিকে যেমন দ্রুত লেনদেন করতে পারছেন, অনেক দিক থেকে ভোক্তারাও লাভবান হচ্ছেন এর মধ্য দিয়ে। আমি জেনে অনেক খুশি হয়েছি যে দুই লাখের উপরে ডাচ্-বাংলার ক্লায়েন্ট একদম নিয়মিত তাদের কার্ড ব্যবহার করছেন। তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিয়মিত নিজ নিজ অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স চেক পর্যন্ত করে নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে টার্ম ডিপোজিট তথা এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ প্রেরণ কিংবা ইউটিলিটি বিল প্রদানের সুবিধার আওতায় মানুষের কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মোবাইল ও অনলাইন ব্যাংকিং। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক কিংবা এইচএসবিসির তুলনায় এ মান কোনো অংশে কম নয়। দিনের পর দিন ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মিল রেখে বলা যেতে পারে অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

বেশির ভাগ মানুষ এখন চাইছে ইন্টারনেট সুবিধা কাজে লাগিয়ে মানি ট্রান্সফার করতে, তাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধ করতে কিংবা ব্যাংকিং খাতের সব তথ্য নিজে জেনে রাখতে। অনেক ব্যাংক এরই মধ্যে এসএমএস পদ্ধতি চালু করেছে, যেখানে প্রতিটি লেনদেন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়ার বিধান রয়েছে। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে তাদের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। হয়তো একটা সময় এসে দেখা যাবে এসব বিকল্প বা অল্টারনেটিভ ব্যাংকিং খাত এসে মেইনস্ট্রিম ব্যাংকিংয়ের জায়গা দখল করে নেবে। মানুষ প্রত্যেকেই চাইবে পার্সোনাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়ার অংশ হতে, যেখানে নিজের সম্পদ নিজেই ব্যবস্থাপনা করার চেষ্টা থাকবে সবার। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগ্রহী হয়ে প্রত্যেক অংশীজন তথা স্টেকহোল্ডারের সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে প্রক্রিয়াটি আরো বেগবান হতে পারে। অন্যদিকে উপযুক্ত প্রযুক্তির প্রয়োগের পাশাপাশি দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের এ ক্ষেত্রে নিয়োগদান সম্ভব হলে অল্টারনেটিভ ব্যাংকিং খাত নিশ্চিত আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।

সাম্প্রতিক এটিএম জালিয়াতি, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জালিয়াতি কিংবা আরো কিছু ঘটনা আমাদের হতবাক করেছে। সেজন্যই ক্রমবর্ধমান অল্টারনেটিভ ব্যাংকিং নিয়ে অনেক চিন্তা করার সুযোগ রয়েছে। আমাদের বেশির ভাগ ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তা অপারেশন রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা পরিচালনগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে তেমন গুরুত্ব দিতে চাচ্ছেন না। পাশাপাশি আইটি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও তেমন গুরুত্ব নেই। কিন্তু এভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে না। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ সমুজ্জ্বল করতে হলে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের ইনফরমেশন সিকিউরিটি এবং ক্লায়েন্ট কনফিডেন্সিয়ালিটির ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন ক্রান্তিকালে ব্যাংকিং লেনদেন চালিয়ে যেতে হলে বিকল্প ব্যাংকিংই হতে পারে একমাত্র সহায়।

 

মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক