১৫ ডিসেম্বর বিকালে মাদ্রিদে ইউএন সিওপি২৫-এর কনফারেন্সটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চার বছর আগের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে দরকষাকষি শেষ হয়েছিল ব্যর্থতা দিয়ে। নির্ধারিত সময়সূচির চেয়ে বাড়তি দুদিন ব্যয় করার পরও হাজারের ওপর প্রতিনিধিরা হল ত্যাগ করেছিল প্রয়োজনীয় নিয়মগুলো বাস্তবায়নে অচলাবস্থা তৈরি করে। সে সময় চারপাশে চলছিল দায় চাপানোর মহড়া।

জাইর বোলসোনারো ক্ষমতায় আসার পর ব্রাজিল আয়োজকের পদ থেকে সরে আসে। প্রতিনিধিরা এ সময় মাদ্রিদে তাদের সময় পার করে এই তর্ক করে যে কৃষি ও খনির কাজের জন্য অ্যামাজন বনকে উন্মুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পথে আছে। যা কিনা জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তহবিল প্রদান ও সহায়তা করার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বাধার সৃষ্টি করে।

শেষ পর্যন্ত সিওপি২৫-এর প্রায় সব সিদ্ধান্ত আগামী সম্মেলন পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে। যা কিনা আগামী নভেম্বরে গ্লাসগোতে হওয়ার কথা রয়েছে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের ক্লাইমেট ও ইকোনমিকসের সহসভাপতি হেলে মাউন্টফোর্ড বলেন, সম্পন্ন করার যে একাগ্রতা নিয়ে প্যারিস চুক্তির জন্ম হয়েছিল তা এখন দূরবর্তী কোনো স্মৃতি হয়ে গেছে।

এর মাত্র দুই সপ্তাহ পরই চীনে ভয়াবহ নভেল করোনাভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। একপর্যায়ে এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে মহামারীতে পরিণত হয়। দেশে দেশে সীমান্তগুলো বন্ধ হয়ে যেতে থাকে, বিশ্ববাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে এবং বাজার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সে সঙ্গে শুরু হয় দায় চাপানোর খেলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার যে উদ্যোগ তাও হাওয়া হয়ে গেছে।

এরপর বিশ্বব্যাপী মৃতের সংখ্যা যতই বাড়তে থাকে শুরু হয় আরো কঠিন লকডাউন পর্ব, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বাতিল হয়ে যায় এবং প্রাদুর্ভাব থামানোর লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।

জাতীয়তাবাদী আখ্যান

বিশ্বব্যাপী প্রাদুর্ভাব যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে জলবায়ু সংকটের ব্যাপারে ভুলে যাওয়াই বরং সহজ। এ মুহূর্তে অবশ্য মহামারীরই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত এবং পাচ্ছেও। জীবন বাঁচানো এবং অর্থনীতিকে বাঁচানোই এখন মূল কাজ। কিন্তু সেদিক থেকে কিছু দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে সক্ষম বা আগ্রহী।

লকডাউনের কারণে স্বল্পমেয়াদের জন্য বৈশ্বিক নির্গমন হ্রাস পেয়েছে। যেমনটা অতীতে অর্থনৈতিক মন্দার সময় হয়েছিল। কিন্তু কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবেশে কয়েক শতক ধরে থেকে যেতে পারে। অর্থাৎ উৎপাদন কম করলেও ঘনত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং অর্থনীতির সঙ্গে নির্গমনও ফিরে আসবে। চীনে এখন তা আবার প্রায় আগের জায়গায় ফিরে এসেছে।

তাই জলবায়ু পরিবর্তনের যে হুমকি সেটি আবার ফিরে আসতে যাচ্ছে। সে সঙ্গে আমরা সামনে আরো অনেক দরিদ্র হয়ে যাওয়া একটি পৃথিবী দেখব। যেখানে কাজের সুযোগও অনেক কমে আসবে। পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে যে বিনিয়োগ তাও অনেক কমে আসবে। আমাদের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও ভয় বাড়তে থাকবে।

এ পরিস্থিতিগুলো আমাদের জাতীয়তাবাদী প্রবৃত্তিকে আরো বেশি জাগ্রত করবে। সে সঙ্গে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বিষয়গুলোকে আরো বেশি কঠিন করে তুলবে। এছাড়া কভিড-১৯ মোকাবেলা করতে গিয়ে দেশগুলোর মাঝে আন্তর্জাতিক যে যোগাযোগ তা ভেঙে পড়েছে। যা কিনা ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে একটি অশনিসংকেত।

সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র

ডোনাল্ড ট্রাম্প, একজন স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদী যিনি ‘বিশ্বতত্ত্ববাদের’ একজন সমালোচক। তিনি একাই প্যারিস চুক্তির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেন। একেবারেই প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে সরে আসে। এরপর ২০১৭ সালে রোজ গার্ডেন স্পিচের ভাষণে তিনি এ চুক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। যার সঙ্গে কিনা চুক্তির মূল শর্তগুলোর সামান্যই প্রাসঙ্গিকতা ছিল।

একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর নিন্দা করেন এবং সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ধারায় চীনের সঙ্গে তিক্ত, ব্যয়বহুল এবং বিভাজনমূলক বাণিজ্য শুরু করে দেন। সেদিন তিনি বলেন, প্যারিস চুক্তি বিশ্বব্যাপী ও অ্যাক্টিভিস্টদের কাছ থেকে প্রশংসা অর্জনের খাতিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। যা কিনা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের ব্যয়ে ধন সম্পদ অর্জন করতে চেয়েছিল। তারা কখনো যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে রাখে না, আমি রাখি এবং আমি সবসময় রাখব। ট্রাম্পের জন্য মহামারী এখন আরো বড় সুযোগ করে দিয়েছে বাইরের বিশ্বকে ভয় দেখানোর জন্য। তিনি বারবার বলে এসেছেন করোনাভাইরাস হচ্ছে ‘চাইনিজ ভাইরাস’। যা কিনা সামনের দিনে সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।

আস্থার বিপর্যয়

সামনের দিনগুলোতে চীন হয়তো অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে ক্লিন এনার্জি সেক্টরে অর্থ বিনিয়োগ করবে। এর পরও অবশ্য সন্দেহ করার কয়েকটি কারণ আছে। এক্ষেত্রে এটি সস্তা কয়লার ওপর নির্ভরতা ফিরিয়ে আনতে পারে অথবা অদূর ভবিষ্যতে জলবায়ুর দূষণ কমাতে যে সময়সীমা তাকে দীর্ঘায়িত করবে। এমনকি মহামারীর আগে সিওপি২৫ চলাকালেও এ ইস্যুতে চীন কম আগ্রহ দেখিয়েছিল।

সামনের দিনগুলোতে নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদী চিন্তার উত্থান ঘটতে পারে বলে আভাস মিলছে। যেখানে জলবায়ুসংক্রান্ত ফ্যাসিবাদও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এরই মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায় এশিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর কভিড-১৯ সংক্রান্ত বর্ণবাদী আচরণের দেখা মিলেছে।

এমআইটি