গ্রীষ্মে তুলনামূলক স্বাধীন চলাফেরার পর, শরৎ ইউরোপের জন্য কভিড-১৯-এর ক্রমবর্ধমান ও গুরুতর সংক্রমণ নিয়ে হাজির হয়েছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাইছে নিজেদের এখতিয়ারের ভেতর দিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ উপায়ের সন্ধান করতে, সেখানে জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রচেষ্টা হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষতিকে এড়িয়ে ভাইরাসের বিস্তৃতি থামানোর সমাধান খুঁজে বের করা।

এ যন্ত্রণা ইউরোপ একাই ভোগ করছে এমন নয়। শরৎ থেকে দীর্ঘ শীতের দিকে বাঁকবদলের সঙ্গে উত্তর গোলার্ধের অনেক দেশ উচ্চসংক্রমণের হারের মুখোমুখি হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এক মাসের লকডাউন ঘোষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় ধাপের কভিড ঝড় চলছে এখন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন স্বীকার করেছেন যে ভাইরাস ইউরোপের মধ্য দিয়ে ছড়িয়েছে। তিনি বলেন, এটা এমন গতিতে ছড়িয়েছে যা সবচেয়ে হতাশাজনক ভবিষ্যদ্বাণীতেও অপ্রত্যাশিত। তিনি ভাইরাসকে আটকানোর জন্য নতুন লকডাউন প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু ভিক্টোরিয়ার গৃহীত বিধিগুলোর তুলনায় এটি অর্ধেক। এটি তাই ভাইরাসকে নির্মূল বা দমন করার জন্য খুব সামান্য বলেই মনে হচ্ছে। স্কুল, দোকান ও অনেক ব্যবসা এখনো খোলা আছে। কাজে যাওয়াও অব্যাহত থাকবে এবং ঘর থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে ব্যায়াম করার অনুমতিও থাকছে।

ফ্রান্সের সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজের ভঙ্গুর অবস্থা হয়তো ম্যাক্রনকে এতদূর পর্যন্তই যাওয়ার অনুমতি দেয়। এসব বিধিনিষেধ মানা না মানা নিয়ে ফরাসি জনগণ এরই মধ্যে গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এখন মানুষের সদিচ্ছার অনুপস্থিতিতে পুলিশের কি দায়িত্ব নেয়া উচিত? এরই মধ্যে প্রতিবাদও অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে, যেমনটা চেক প্রজাতন্ত্রে দেখা গেছে। যেখানে মাস্কবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে উগ্র ডানপন্থীদের সংঘর্ষও হয়েছে।

প্রতিবেশীদের তুলনায় ভালো অবস্থায় থাকা জার্মানিও একই পথ অনুসরণ করছে। চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলও এরই মধ্যে বলেছেন, সংক্রমণের ক্রমবর্ধমান রূপ সরকারকে বাধ্য করছে শীতল বিধিনিষেধ আরোপের দিকে যেতে। তবে এ পরিপ্রেক্ষিতে সুবিধাবাদী উপায় নিয়ে মেরকেলের বিধিনিষেধ আরোপকে সমালোচনায় জর্জরিত করেছেন বিরোধী দলীয় নেতারা।

সামাজিক সংহতি, সাধারণ বিবেচনাবোধ এবং একজন অন্যজনের প্রতি সদয় হওয়ার মাধ্যমে ভাইরাসকে হারানোর কথা বলেছিলেন মেরকেল। কিন্তু তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিরোধী দল। বিশ্বব্যাপী অন্যান্য পপুলিস্ট ডানপন্থী দলগুলোর মতো তারাও বলেছে যে মেরকেল একটি ‘করোনা একনায়কতন্ত্র’ সম্পন্ন রাষ্ট্র তৈরি করেছেন।

তবে বাকিদের তুলনায় স্পেন অবশ্য বেশ দ্রুতগতিতে আঞ্চলিক পর্যায়ের ভ্রমণ থামিয়ে দিয়েছে। এটি তারা করেছে জরুরি সতর্কতা হিসেবে। অবশ্য এখানেও এ জাতীয় পদক্ষেপগুলোকে প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে চলাফেরার স্বাধনীতায় সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসী দেশ হিসেবে জার্মানি এ ধরনের বিধিনিষেধের ব্যাপারে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছে। মেরকেল বলেন, ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা দেশ হিসেবে জার্মানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সীমান্ত খোলা রাখা। আমাদের সবাইকে একসঙ্গেই মহামারী মোকাবেলা করতে হবে।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভ্যাকসিনের অনুপস্থিতিতে ভাইরাস এবং সরকারের বিধিনিষেধের প্রতি সমাজ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে সেটি। অন্য জায়গাগুলোর মতো ইউরোপের সংহতির শক্তিকে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে মহামারী। যদি এখানে এমন কোনো সামাজিক প্রত্যয় থাকে যা দেখাবে সবার স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখার মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখা যাবে। তবে সরকারকে কদাচিৎই বিধিনিষেধ আরোপ করে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটতে হবে। পাশাপাশি একতাবদ্ধভাবে বিরোধী পক্ষের আন্দোলনকেও এখানে মোকাবেলা করতে হবে। তবেই আসন্ন শীতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পাশাপাশি নিজেদের সামাজিক সংহতি প্রদর্শনের পরীক্ষায়ও পাস করতে পারবে ইউরোপ।

স্ক্রলডটইন